ঢাকা, রবিবার, ১১ মাঘ ১৪২৬, ২৬ জানুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

শিরিনের একটি স্বপ্ন আছে

ইকরামুল হাসান শাকিল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-০২ ৮:১৬:০৯ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-০২ ১২:১৯:৫৫ পিএম

‘সিলেটে বি-নেগেটিভ কেউ আছেন? চা শ্রমিক খুব অসহায়’, ‘ঢাকা শ্যামলীর আশেপাশে এ-পজেটিভ রক্তের কেউ আছেন, আগামীকাল সকাল ৮ টায় একজন বাবার বাইপাস হবে’, ‘প্রতি মাসে ১৮০০ টাকার ওষুধ লাগবে। কেউ সাহায্য করবেন প্লিজ’, ‘নরমাল ডেলিভারি মেয়ে বাচ্চা, ওজন ২.৯ কেজি। মা ও বাচ্চা ভালো আছে।’ 

প্রতিদিন সহযোগিতা চেয়ে এমন লেখা তার ফেইসবুক পোস্টে দেখা যায়। দেখি এবং অনুপ্রাণিত হই। শুধু আমি নই, আমার মতো হাজারো মানুষ। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে এগিয়েও আসেন অনেকে। রক্ত দিয়ে, অর্থ দিয়ে, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে মানুষ সহযোগিতা করেন তাকে। জানতে ইচ্ছে করে- কে তিনি?

মানুষটি সানজানা শিরিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে সবাই তাকে ‘সান জানা সাঞ্জু’ নামে চেনেন। পেশায় মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট।  মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানায় ৫০ শয্যাবিশিষ্ট ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন পরিচালিত হাসপাতালে কাজ করছেন সানজানা। ১৭টি চা বাগানের শুধু চা শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য কাজ করে এই হাসপাতাল।

মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলে (ম্যাটস) পড়ালেখার সময় থেকেই সানজানা নিজে রক্তদান শুরু করেন। যখনই কারো রক্তের প্রয়োজন হয় তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। অসুস্থ রোগীর পাশে দাঁড়ান। তিনি যে শুধু ফেইসবুকে পোস্ট করেই বসে থাকেন তা নয়। পরিচিত মানুষদের ফোন করেন যাদের রক্তের গ্রুপ জানা আছে। তার এই নিরলস প্রচেষ্টায় অসংখ্য মুমূর্ষু রোগী রক্ত পেয়ে সুস্থ হয়েছেন।

রক্তের আহ্বানে যেমন তিনি সাড়া পান, তেমনি কখনো কখনো নিরাশও হন। তখন তার এমন পোস্টও চোখে পড়ে: ‘বি-নেগেটিভ ব্লাড চাইছিলাম, লাগবে না। বাচ্চাটা মারা গেসে।’ অথবা ‘অসহায় পিতার জীবিত বাচ্চার মুখ দেখা হয়নি। রক্ত কেনার টাকা যোগাড় করতে পারেননি বলে।’

শিরিন বলেন, ‘মানব সেবা অন্যের দেখাদেখি হয় না। ইচ্ছেটা ভেতর থেকে আসতে হয়।’ রোগীর সেবা করাই সানজানার কাজ। তাই পেশাগত দায়িত্বের বাইরে নিজেই কাঁধে তুলে নিয়েছেন মানব সেবার এই বাড়তি দায়িত্ব। নানান সীমাবদ্ধতার কারণে শুরুর দিকে শিরিনের পথ ছিল অনেক কষ্টের। বাস্তবতার সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করে পড়াশোনা করতে হয়েছে। মাধ্যমিক শেষ করে হবিগঞ্জের বৃন্দাবন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন। এরপর ভর্তি হন ম্যাটস-এ। সেখান থেকে পাস করে বিভিন্ন ক্লিনিকে কাজ করেছেন কিছুদিন।

শিরিনের বাড়তি দায়িত্ব নেয়ার ঝোঁক ছোটবেলা থেকেই। শিরিন বলেন, ‘মা-বাবা কেউ পড়াশোনা করেননি। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না। আমরা সাত ভাইবোন। তাই দারিদ্র্যের সঙ্গে খুব ভালোভাবে পরিচিত। তারপরও আমরা চেয়েছি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে। থেমে থাকিনি।’

স্বল্প বেতনের চাকরি থেকে মাস শেষে যা আয় হয়, তা দিয়ে নিজে চলেন এবং পরিবারকে সহযোগিতা করেন। আর রক্ত নিয়ে কাজ তো আছেই। রক্ত দিতে মানুষকে উৎসাহিত করেন সবসময়। ফেইসবুক লাইভে এসে ‘রক্ত দানে ক্ষতি নেই বরং অন্যের উপকার’ বোঝাতে চেষ্টা করেন। শিরিন ৪৮৪ জন মায়ের স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের কাজে সহযোগিতা করেছেন। এত অল্প বয়সে এতগুলো নারীর স্বভাবিক প্রসব আর কেউ করাতে পেরেছেন কিনা আমার জানা নেই। শিরিন বলেন, ‘দরিদ্র রোগীরা যখন বিনামূল্যে রক্ত পেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন, বিপদে আপদে সহযোগিতা পান তখন তাদের হাসিমুখ আমার মনে প্রশান্তি এনে দেয়।’

শিরিন আন্তরিকভাবেই রোগীদের সেবা করেন। রোগী চলে যাওয়ার পরেও খোঁজ-খবর রাখেন। ‘আগুনে পোড়া এক রোগী হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তার পোড়ার ক্ষত ভয়াবহ। প্রতিদিন তাকে পরিচর্যা করছি। এখন অনেকটাই ভালোর দিকে। তার পরিবার এসময় তাকে ভালো খাবার দিতে পারছে না। আমি প্রতিদিন ডিম, কমলা নিয়ে গিয়ে খাওয়াচ্ছি।’ শিরিন বলেন, ‘এতেই আমার তৃপ্তি।’

শিরিনের স্বপ্ন একটা বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করা। তিনি বলেন, ‘আমি এক বাচ্চাকে আমার বাসায় রেখে পড়ালেখা করাচ্ছি। তার সব খরচ বহন করছি। একজন অসহায়কে ঘর বানিয়ে দিয়েছি। এখন আমার ইচ্ছে একটি বৃদ্ধাশ্রম করা। অনেক টাকা প্রয়োজন। যদি কোনো সহৃদয়বান মানুষ আমাকে সাহায্য করে তাহলেই স্বপ্নটি পূরণ হবে।’

শিরিন আমৃত্যু গরিব দুঃখী অসহায় মানুষের পাশে থাকতে চান। এ কারণেই তিনি চান তার স্বপ্ন পূরণ হোক। আমরা যারা ব্যক্তিগত স্বপ্ন পূরণে বিভোর তারা কি পারি না শিরিনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে?  

 

ঢাকা/তারা