ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৫ জুলাই ২০২২ ||  আষাঢ় ২১ ১৪২৯ ||  ০৫ জিলহজ ১৪৪৩

সরিষা ফুলে মেতেছে মৌমাছি ও মৌয়ালরা

এনাম আহমেদ, বগুড়া  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৩৩, ৯ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১৬:৩৬, ৯ জানুয়ারি ২০২২
সরিষা ফুলে মেতেছে মৌমাছি ও মৌয়ালরা

সরিষা ফুলে ছেয়ে গেছে বগুড়ার মাঠগুলো। শহরতলীর পাকা সড়ক অথবা গ্রামের মেঠোপথে গেলে যে দিকেই তাকাই চোখজুড়ে শুধু হলুদ আর হলুদ। এমন দৃশ্য বছরে একবারই আসে। এসময়টা মৌমাছি আর মৌয়ালদের মধু সংগ্রহের উৎসবে কেটে যায়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলার চাষিরা এবার ২৭ হাজার ৬১৭ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করেছেন। এই সুযোগে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মৌয়ালরা শ’শ’ মৌবাক্স নিয়ে হাজির হচ্ছেন বগুড়ায়। এখনো পর্যন্ত ২৫ জন মৌয়াল ৩৭০টি মৌবাক্স নিয়ে জেলার বগুড়া সদর, নন্দীগ্রাম, শেরপুর, ধুনট ও কাহালুর সরিষা ক্ষেতে আবাস গেড়েছেন। গত বছর জেলায় ৫৮০টি মৌবাক্স বসিয়ে মধু উৎপাদন করা হয়েছিল ৪ হাজার ৮৫০ কেজি। চলতি বছর এখনো পর্যন্ত মধু সংগ্রহ হয়েছে ১ হাজার ৪০ কেজি।

বগুড়ার কাহালু উপজেলার নিশ্চিন্তপুরে জমিতে গিয়ে দেখা মেলে ১৪০টি মৌবাক্সের। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার লাহিড়ী মোহনপুর গ্রামের আব্দুল্লাহ আল মামুন, শাহাদৎ হোসেন ও জাহাঙ্গীর ইসলাম মৌবাক্সগুলো জমিতে স্থাপন করেছেন। সেখানে কথা হয় মৌয়াল আব্দুল্লাহ আল মামুনের সাথে।

তিনি জানান, গত ৯ বছর আগে তার ভাই আল আমিনের হাত ধরে তিনি মৌ চাষ করে মধু সংগ্রহের কাজে এসেছেন। তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি এটা করছেন। সাথে রয়েছেন তার চাচাতো ভাই শাহাদৎ হোসেন ও আত্মীয় জাহাঙ্গীর ইসলাম। তারা তিনজনে বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জেলায় ঘুরে মধু সংগ্রহ করেন। এরপর স্থানীয় লোকজন ও কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেন। 

গত পাঁচ বছর আগে তিনি প্রায় ২ লাখ টাকা দিয়ে এ্যাপিস মেলিফেরা জাতের মৌমাছিসহ ৮২টি মৌবাক্স কিনেছিলেন। পাঁচ বছরে তার মৌমাছির সংখ্যা বাড়ায় বর্তমানে মৌবাক্সের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫০টি। এছাড়া তাদের তিনজনের মোট ৪০০টি মৌবাক্স রয়েছে। যার মধ্যে বগুড়ায় তারা ২৫০টি মৌবাক্স বসিয়েছেন। ১৪০টি নিশ্চিন্তপুরে এবং বীরকেদারে ১০০টি। বাকিগুলো সিরাজগঞ্জে। প্রতিটি বাক্সে একটা করে রানি মৌমাছি রয়েছে। যে মৌমাছির জন্য অন্য পুরুষ এবং শ্রমিক মৌমাছিরা মধু সংগ্রহ করে আনে। রানি মৌমাছি ভালো থাকলে সেই বাক্সে মধুর পরিমাণ এবং মৌমাছির পরিমাণ বেশি থাকে।

মৌয়াল মামুন আরও জানান, সরিষার জমিতে তারা দেড় মাস থাকবেন। এরপর কালোজিরা ও ধনিয়ার জমিতে মধু সংগ্রহ করতে যাবেন নড়াইল, গোপালগঞ্জ অথবা মাদারীপুরে। সেখান থেকে লিচুর মধু সংগ্রহে যাবেন পাবনার চাটমোহর অথবা দিনাজপুরে। সবশেষে যাবেন সুন্দরবনে। এভাবেই তারা বছর অবধি বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে মৌবাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করে থাকেন। তারা বছরে সাড়ে ৫ মাস মধু সংগ্রহ করেন। এই সময় তাদের মৌমাছি’র আলাদা কোনো খরচ করতে হয় না। যেহেতু ফুল থেকেই মধু সংগ্রহ করে তারা নিজেদের খাবার সংগ্রহ করতে পারছে। কিন্তু বাকি সাড়ে ৬ মাস মৌমাছিকে চিনি খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। 

মামুন বলেন, ১৪০ মৌবাক্সের জন্য সপ্তাহে ২ বস্তা চিনি লাগে। গত বছর সরিষা, কালোজিরা ধনিয়া লিচুর মুকুল এবং সুন্দরবন থেকে আমি ২ টন মধু সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম। মধুর প্রকার ভেদে ৭ হাজার ৫০০ টাকা, ১০ হাজার টাকা এবং ১৬০০ টাকা মণ প্রতি বিক্রি করছি। মৌচাষে তাদের সবচেয়ে বেশি অসুবিধা হলো জমিতে কীটনাশক ব্যবহারের ফলে অনেক সময় ফুলে বসার পর মৌমাছি মারা যায়।

মৌয়াল শাহাদৎ হোসেন জানান, তারা দেড় মাসে ৬ বার বাক্স থেকে মধু সংগ্রহ করবেন। নিশ্চিন্তপুরের ১৪০টি মৌবাক্স থেকে দেড়মাসে তাদের মধু সংগ্রহ হবে ২০ থেকে ২২ মণ। কোম্পানি থেকে এবার তাদের মধুর দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে মণ প্রতি ৬ থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকা। দেড় মাসে মধু বিক্রি করে তাদের উপার্জন হবে প্রায় দেড় লাখ টাকা।

স্থানীয় বাসিন্দা তুহিন মন্ডল বলেন, আগে আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন দেখতাম গাছের ডালে বা উঁচু কোনো স্থানে মৌমাছি চাক বাঁধতো। মৌয়ালদের খবর দিয়ে এলাকার লোকজন চাক কেটে মধু সংগ্রহ করতেন। কিন্তু গত ৭-৮ বছর যাবৎ দেখছি মৌমাছির বাক্স নিয়ে মৌয়ালরা সরিষা জমিতে রেখে মধু সংগ্রহ করছেন। সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই পাল্টে যাচ্ছে।

মধু কিনতে আসা শফিকুল ইসলাম বলেন, আমি দুপঁচাচিয়ায় থাকি। প্রতিবছর এরকম সরিষা জমি থেকে মধু সংগ্রহ যারা করেন, তাদের কাছ থেকে মধু কিনি। কারণ স্বচক্ষে দেখে খাঁটি মধু কিনতে পারছি। কিন্তু বাজারে যেগুলো কেনা হয়, সেগুলো আদৌ খাঁটি কিনা তাতে সন্দেহ থেকে যায়।

বগুড়ার বনানী খামারবাড়ীর অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) এনামুল হক বলেন, মৌয়ালদের প্রযুক্তিগত সহায়তা আমরা করে থাকি। মৌবাক্স স্থাপনের স্থানটা তাদের আমরা নির্ধারণ করে দেই। পাশাপাশি আমাদের একটি প্রকল্প চলমান আছে কৃষক পর্যায়ে উন্নয়তমানে ডাল, তেল, মসলার বীজ উৎপাদন সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমাদের কিছু কৃষক আছেন, তাদের আমরা এসএমই ভুক্ত কৃষক বলে থাকি। তাদের আমরা কিছু উন্নতমানের মৌবাক্স দেই, যেগুলো অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা। আমরা এপর্যন্ত ৫৮টি মৌবাক্স বিভিন্ন উপজেলায় বিতরণ করেছি। সেখান থেকেও মধু উৎপাদন হচ্ছে। গত বছর আমরা ৪ হাজার ৮৫০ কেজি মধু সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম। এবছর প্রথম থেকেই যারা মধু চাষি, তাদের আগ্রহ অনেক বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। আমরা আশা করছি, গত বছরের চেয়ে এবার আরও বেশি মধু উৎপাদন হবে।

বগুড়ায় যারা মৌয়াল মধু সংগ্রহ করছেন, তাদের কাছ থেকে ডাবর, এপিসহ বিভিন্ন কোম্পানি মধু কিনে নেয়। কোম্পানিগুলো সারাদেশেই মধু সরবরাহ করে। এছাড়া স্থানীয় উদ্যোক্তারাও মধু কিনে প্যাকেটজাত করে অনলাইনে বিক্রি করে আসছেন। এছাড়াও, বাজারে এই মধুগুলো ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি করেন তারা।

/মাহি/

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়