ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৬ অক্টোবর ২০২২ ||  আশ্বিন ২১ ১৪২৯ ||  ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪১৪

খেজুরে ভাগ্য বদল নজরুলের

রফিক সরকার, কালীগঞ্জ (গাজীপুর) || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:৩২, ১৩ আগস্ট ২০২২   আপডেট: ১১:১১, ১৩ আগস্ট ২০২২
খেজুরে ভাগ্য বদল নজরুলের

বিভিন্ন প্রকারের খেজুর চাষ করে নিজেকে সাবলম্বী করে তুলেছেন নজরুল ইসলাম বাদল

নজরুল ইসলাম বাদল (৩০)। গাজীপুরের সদর উপজেলার পিরুজালী ইউনিয়নের আলিমপাড়া গ্রামের বাসিন্দা তিনি। ২০০৩ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক পাস করে বেকারত্ব ঘুচাতে এনজিওসহ কয়েকটি টেলিকমিউনিকেশন সংস্থায় পরিবেশকের চাকরি করেন। ২০১৫ সালের পর সব বাদ দিয়ে বাবার সঙ্গে কৃষি কাজে যোগ দেন। 

কৃষিকাজে নতুন সম্ভাবনার দিক খুঁজতে থাকেন নজরুল। বর্তমানে তার কৃষি জীবনে ভরে উঠেছে সাফল্য গাঁথায়। শিক্ষা জীবনে গণিতের চর্চা করে ব্যক্তি জীবনে তা প্রয়োগে সফলতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন তিনি।

দেশ বিদেশে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজদের জমিতে ‘সৌদি ডেট পাম ট্রিস ইন বাংলাদেশ’ নামে খেজুরের বাগান গড়ে তুলেছেন নজরুল। খেজুর গাছ চাষের পাশাপাশি খেজুর চারার নার্সারিও গড়ে তুলেছেন এই চাষি। এখন তিনি নিজ উপজেলায় মরুভূমির ফল খেজুর চাষ করে দেশের চাহিদা মেটানোর স্বপ্ন দেখছেন। 

শুধু নজরুল না এই খেজুর চাষে আগ্রহী জেলার  চাষী তার কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে খেজুর চাষে সফলতার স্বপ্ন দেখছেন।

নজরুল ২০১৫ সালে শুরুর দিকে সৌদি আরব প্রবাসী এক বন্ধুর সহযোগিতায় খেজুরের চাষ ও নার্সারি করার পরিকল্পনা করেন। প্রবাসী বন্ধুর সহযোগিতায় বিশ্বের ৬টি দেশ থেকে বিভিন্ন জাতের খেজুরের বীজ ও চারা সংগ্রহ করেন নজরুল। ২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর ৭০ শতক জমিতে সৌদি আরবের ১৮টি খেজুরের চারা রোপন করে মরুর খেজুরের চাষ শুরু করেন। এরজন্য প্রথমেই তার খরচ হয়েছে ৫২ লাখ টাকা।

২০১৭ সালে প্রথম নজরুলের বাগানের খেজুর গাছে ফলন আসতে শুরু করে। খেজুরের বীজ কিংবা সাকার থেকে চারা উৎপাদন করে খেজুরের নার্সারিও গড়ে তোলেন। সেই বছরেই বাগান থেকে ৬২ লাখ টাকার চারা বিক্রি করেন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরতে হয়নি। বর্তমানে তার বাগানে ও নার্সারিতে ১৬ প্রজাতির খেজুর গাছ রয়েছে।

নজরুলের খেজুর বাগান

মানুষের ব্যাপক চাহিদার যোগান দিতে নজরুল আরো ১৪ জাতের চারা বাইরে থেকে এনেছেন। বর্তমানে নার্সারিসহ তার খেজুর বাগানটি সাড়ে ৭ বিঘায় সম্প্রসারিত হয়েছে। সাকার থেকে উৎপাদিত চারায় ফলনের হার বেশি। সাকারের চারা রোপনের ১/২ বছরের মধ্যেই খেজুর ধরে। এ ধরনের প্রতিটি সাকারের দাম ২৫ হাজার টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। আর খেজুর ধরা অবস্থায়ও চারা বিক্রি করা হয়, যার দাম ৩ লাখ টাকা। বাগান পরিচর্যা ও অন্যান্য খরচ বাবদ প্রতিমাসে তার ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়।  

নজরুল ইসলাম বাদল রাইজিংবিডিকে বলেন, ২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে মরুর খেজুরে গাছের ১৮টি চারা রোপন করি। সেই গাছে এ বছরও অনেক খেজুর ধরেছে। এক একটি খেজুরের বাঁধার ওজন প্রায় ২৫ কেজি।  ৩০ হাজার চারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে খেজুরের নার্সারি গড়ে তুলেছি। আমার সংগ্রহে খেজুরের যেসব জাত রয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আজওয়া, মরিয়ম, আম্বার, খুনিজি, হেলালি, ম্যাডজেলি, বারহি, খালাস, ওমানি, সুক্কারি, সাফাওয়ি ইত্যাদি। তবে যেভাবে ফলন হচ্ছে তা ঠিক থাকলে অচিরেই দেশের খেজুরের চাহিদা মিটাতে পারবো বলে আশা করছি।

আমার নার্সারিতে টিসু, কলম (সাকার) ও সরাসরি বীজ থেকে উৎপাদিত চারা রয়েছে। টিস্যু ও কলম চারা থেকে ১ থেকে ২ বছরে ফলন পাওয়া যায়। একটি টিস্যু চারা ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা, কলম চারা ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং বীজের চারা ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। একটি পূর্ণ বয়স্ক গাছে ৮/১২টি বাধি ধরে।  প্রতি বাধিতে ২৫ থেকে ৩০ কেজি করে খেজুর হয়। তাছাড়া বীজ থেকে উৎপাদিত চারায় ফলন আসতে সময় লাগে ৩ থেকে ৪ বছর। বীজ থেকে উৎপাদিত চারার দাম তুলানামূলক কম। এখানে চারা ছাড়াও খেজুরও বিক্রি করা হয়।

দেশে বছরে প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে। যার পুরোটাই আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয়। দেশে খেজুর বাগান করতে সরকারের কৃষি বিভাগের সহযোগীতা পেলে আগামী ১০ বছরে দেশে উৎপাদিত খেজুর দিয়েই দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব বলে বলে আমি মনে করি। এ ক্ষেত্রে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ, কৃষকদের প্রযুক্তিগত সহযোগীতা ও প্রশিক্ষণ দিতে পারলে খেজুর চাষে হাজারো চাষি তৈরী হবে। একই সঙ্গে কৃষকের মধ্যে খেজুর চারা সহজলভ্য ও কম মূল্যে বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। 

ফল আসতে শুরু করেছে গাছগুলোতে

ময়মনসিংহের ভালুকার পাঁচগাঁও এলাকার মাদরাসা শিক্ষক মো. বিল্লাল হোসেন জানান, ২০১৯ সালে তিনি নজরুলের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বারহী জাতের একটি ও ৫০ হাজার টাকায় মরিয়ম জাতের সাকার কলমের একটি খেজুর চারা ক্রয় করেন। বাদল নিজে এসে চারা দুটি জমিতে রোপন করে গেছেন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে খেজুর গাছে ফুল আসে, মার্চেই তা ফলে পরিণত হয়। এরমধ্যে মরিয়মের জাতটি বারোমাসি  হয়েছে।

তিনি আরো জানান, নজরুলের কাছ থেকে আবারো ৭৫ হাজার টাকায় একটি হেলালী, একটি আম্বার ও একটি খুদরি জাতের সাকারের কলম চারা ক্রয় করেছেন। ৩১ জুলাই চারাগুলো রোপণ করা হয়েছে।

শ্রীপুর উপজেলার মাওনা এলাকার হাজী মমতাজ উদ্দিন জানান, তিনিও বাদলের কাছ থেকে চারা কিনেছেন। তাতে ভাল ফলন হচ্ছে। ২০২০ সালে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে দুইটি খেজুর চারা ক্রয় করেছিলেন। ২১ মাস পরে এসব গাছে ফুল ও ফলন আসে। এখন প্রতিটি গাছে চারটি বাঁধির খেজুরগুলো পরিপক্ক হয়েছে।

গাজীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি গাজীপুরে নতুন যোগদান করেছি। তারপরও খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি পিরুজালী গ্রামে প্রায় তিন বিঘা জমিতে সফলভাবে মরুর খেজুর চাষ করছেন বাদল নজরুল এক যুবক। বাংলাদেশে সৌদি আরবের খেজুর চাষ একটি সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য। এর জন্য কৃষি পর্যায়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করি। এই ফলটি চাষে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরণের সহযোগীতা করা হবে।’

মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়