ঢাকা     শনিবার   ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১১ ১৪২৭ ||  ০৮ সফর ১৪৪২

উচ্চ রক্ত শর্করার ৬ ঝুঁকি

এস এম গল্প ইকবাল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৪:২৯, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
উচ্চ রক্ত শর্করার ৬ ঝুঁকি

আপনি হয়তো ইতোমধ্যে এটা জানেন যে, ডায়াবেটিস ও প্রিডায়াবেটিস ধরা পড়লে রক্ত শর্করা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কিন্তু শুধু তাই নয়, বিভিন্ন গবেষণা আরো সাজেস্ট করছে যে ভবিষ্যতে কিছু মারাত্মক রোগ এড়াতেও রক্ত শর্করা নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব রয়েছে। কেন রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ? এ প্রশ্নের খুব সাদাসিধে উত্তর হচ্ছে, রক্ত শরীরের সবখানে পৌঁছে সবকিছুকে প্রভাবিত করে। এখানে রক্ত শর্করা নিয়ন্ত্রণে না রাখার ছয় পরিণতি আলোচনা করা হলো।

হার্ট ও রক্তনালীর রোগ: বুকব্যথা নিয়ে দুজন লোক জরুরি বিভাগে গেছেন। একজনের পূর্বে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, অন্যজনের ডায়াবেটিস রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কার বেশি? এ প্রসঙ্গে ওবেসিটি মেডিসিন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. ক্রেগ প্রিম্যাক বলেন, ‘উভয় লোকের মধ্যে যার ডায়াবেটিস রয়েছে তার হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেশি। মেডিক্যাল স্কুলের একটি ডেমনস্ট্রেশন হচ্ছে, ডায়াবেটিস হৃদপিণ্ডে রক্ত-সঞ্চালক ধমনী রোগ বা করোনারি আর্টারি ডিজিজ সৃষ্টি করতে পারে। আপনার ডায়াবেটিস থাকলে ইতোমধ্যে করোনারি আর্টারি ডিজিজ রয়েছে, হয়তো তা এখনো পর্যন্ত শনাক্ত হয়নি।’ তিনি আরো জানান, ‘বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে ধমনীতে প্রতিবন্ধতা সৃষ্টিকারী প্লেকের প্রধান কারণ হচ্ছে খাবারের কোলেস্টেরল, কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ধারণা দিচ্ছে যে রক্তের অতিরিক্ত শর্করাও বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।’ ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফাউন্ডেশনের তথ্যানুসারে, ডায়াবেটিস ছিল এমন লোকদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো হৃদরোগ।

যৌনমিলনে অক্ষমতা: রক্ত শর্করার মাত্রা বেড়ে উচ্চ হলে যেসব ফ্যাক্টর হার্টে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে ফেলে তা যৌনাঙ্গেও রক্তপ্রবাহ সীমিত করে ফেলে, বলেন ডা. প্রিম্যাক। বোস্টনে অবস্থিত হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের অন্তর্গত জসলিন ডায়াবেটিস সেন্টারের মতে, যেসব পুরুষেরা ১০ বছর ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছেন তাদের ইরেক্টাইল ডিসফাংশন হতে পারে। ইরেক্টাইল ডিসফাংশন হচ্ছে, যৌনমিলনের জন্য পেনিস যতটা দৃঢ় হওয়া দরকার তা অর্জনে ব্যর্থতা। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত যেসব পুরুষেরা রক্ত শর্করা ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন না তাদের মধ্যে এ সমস্যা এত তীব্র হতে পারে যে যৌনজীবনে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের মতে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ রক্ত শর্করা নারীদের মধ্যেও যৌন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, যদিও এ বিষয়ে সম্পাদিত গবেষণার সংখ্যা কম। নারীদের উচ্চ রক্ত শর্করার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে: ভ্যাজাইনার শুষ্কতা, যৌন তাড়নার অভাব ও যৌনসুখের চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে কাঠিন্যতা।

টাইপ ৩ ডায়াবেটিস: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিকিৎসকেরা আলঝোইমারস রোগকে মস্তিষ্কের ডায়াবেটিস হিসেবে দেখে আসছেন। অনেক চিকিৎসক এ রোগকে টাইপ ৩ ডায়াবেটিস বলে থাকেন। ডায়াবেটিস থাক কিংবা না থাক, উচ্চ রক্ত শর্করা ও মস্তিষ্কের জ্ঞানীয় কার্যক্রমে বিঘ্নতার মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকরা এখনো শর্করা ও মস্তিষ্কের মধ্যকার সম্পর্কের নিশ্চিত ব্যাখ্যা দিতে পারেননি, কিন্তু তারা ধারণা করেন যে রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে মস্তিষ্কের কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দিতে পারে, বলেন ডা. প্রিম্যাক।

হাড় ও জয়েন্টে সমস্যা: আপনি হয়তো ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির কথা শুনেছেন। এ সমস্যার ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ রক্ত শর্করা শরীরের সর্বত্র স্নায়ুকোষকে ড্যামেজ করে। এর ফলে সূচ ফোটানোর অনুভূতি হয়, এমনকি হাত-পা-বাহু-চরণ অসাড়ও হতে পারে। কিন্তু একটি কম জ্ঞাত ফ্যাক্ট হচ্ছে, স্নায়ুর এই ক্ষতি শরীরের জয়েন্টেও ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে, বলেন টাম্পাতে অবস্থিত ফ্লোরিডা অর্থোপেডিক ইনস্টিটিউটের ফ্যামিলি ও স্পোর্টস মেডিসিন ফিজিশিয়ান জেফ ই. সেলমান। এতে চারকোট জয়েন্ট বা ডায়াবেটিক আর্থ্রোপ্যাথি হতে পারে, যেখানে জয়েন্ট বিকৃত হতে পারে ও দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা হারিয়ে যেতে পারে। এছাড়া রক্তের অতিরিক্ত শর্করা জয়েন্টের সারফেসে লেগে থাকতে পারে, কোলাজেনের মাত্রা কমাতে পারে ও জয়েন্টের নড়াচড়া সীমিত করতে পারে।

কিডনি রোগ: দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ রক্ত শর্করা কিডনির রক্তনালীকে ড্যামেজ করে ও কিডনির ফাংশন কমিয়ে ফেলে রেনাল (কিডনিসংক্রান্ত) রোগে ভূমিকা রাখে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে যতই উদাসীনতা দেখানো হবে, কিডনি রোগের ঝুঁকি ততই বেড়ে যাবে। আপনার পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে টাইপ ২ ডায়াবেটিস অথবা টাইপ ১ ডায়াবেটিস থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস প্রতিবছর কিডনি ফাংশন পরীক্ষা করতে পরামর্শ দিচ্ছেন।

বিষণ্নতা: বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে প্রতিদিন ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত কার্যাবলি (যেমন- রক্ত শর্করা মনিটর করা ও ইনসুলিন শট নেয়া) টাইপ ১ ডায়াবেটিস ও টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের বিষণ্নতা বৃদ্ধি করে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে উচ্চ রক্ত শর্করা আরো বড় ডিপ্রেস্যান্ট হতে পারে। ২০১৫ সালে দ্য জার্নাল অব নিউরোসায়েন্সে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীদের উচ্চ রক্ত শর্করা মস্তিষ্কের এমন একটি নিউরোট্রান্সমিটারের মাত্রা বাড়িয়েছিল যা বিষণ্নতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এ গবেষণায় আরো পাওয়া গেছে, উচ্চ রক্ত শর্করা মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশসমূহের যোগাযোগে পরিবর্তন এনে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তথ্যসূত্র : ইউ.এস. নিউজ

 

ঢাকা/ফিরোজ

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়