ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১৪ ১৪২৭ ||  ১১ সফর ১৪৪২

হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে কতক্ষণ ঘুমাবেন?

এস এম গল্প ইকবাল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০২:৪৯, ২০ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে কতক্ষণ ঘুমাবেন?

আপনি ধূমপান করেন না। আপনার হার্ট-রক্তনালী রোগের বংশগত ঝুঁকিও নেই। কিন্তু তারপরও আপনার হার্ট অ্যাটাকের বাড়তি ঝুঁকি থাকবে, যদি আপনি কম ঘুমান অথবা বেশি ঘুমান।

এমনটা দাবি করছে ইউনিভার্সিটি অব কলোরোডো বল্ডারের একটি নতুন গবেষণা। এ গবেষণাটি প্রায় অর্ধ-মিলিয়ন মানুষের ওপর চালানো হয়। জার্নাল অব দ্য আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজিতে প্রকাশিত এ গবেষণায় আরো পাওয়া গেছে, যাদের হার্ট অ্যাটাকের বংশগত ঝুঁকি রয়েছে তারা প্রতিরাতে ছয় থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমিয়ে ঝুঁকির পরিমাণ কমাতে পারেন।

ইউনিভার্সিটি অব কলোরোডো বল্ডারের ইন্টিগ্রেটিভ ফিজিওলজির সহকারী অধ্যাপক ও গবেষণার সিনিয়র লেখক সেলিন ভেটার বলেন, ‘এ গবেষণায় আমরা শক্তিশালী প্রমাণ পেয়েছি যে হার্টের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ঘুমের স্থায়িত্ব একটি প্রধান ফ্যাক্টর। একথা সবার জন্য সত্য।’

ডা. ভেটার, ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটাল ও ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারের গবেষণা লেখকরা যুক্তরাজ্যের বায়োব্যাংক থেকে ৪০ থেকে ৬৯ বছর বয়সি ৪,৬১,০০০ জন মানুষের বংশগত তথ্য, ঘুমের অভ্যাস ও মেডিক্যাল রেকর্ড খতিয়ে দেখেন। এদের পূর্বে হার্ট অ্যাটাক হয়নি। তারপর তাদেরকে সাত বছর পর্যবেক্ষণ করা হয়।

এ গবেষণা চলাকালে যারা প্রতিরাতে ছয় ঘণ্টার কম ঘুমিয়েছেন তাদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি যারা ছয় থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন তাদের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি ছিল। বিস্ময়কর হচ্ছে, যারা নয় ঘণ্টার বেশি ঘুমিয়েছেন তাদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি আরো বেশি ছিল- ৩৪ শতাংশ! গবেষকরা হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস বা বংশগত ঝুঁকি রয়েছে এমন লোকদের ঘুমের স্থায়িত্ব বিশ্লেষণে জানতে পেরেছেন, প্রতিরাতে ছয় থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমালে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ১৮ শতাংশ কমে যেতে পারে।

এ গবেষণার প্রধান লেখক আয়াস ডাগলাস বলেন, ‘এ গবেষণা আমাদেরকে আশাবাদী করে তুলেছে যে হার্ট অ্যাটাকের জিনগত ঝুঁকি যেমনই হোক না কেন, প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ ঘুমিয়ে ঝুঁকি কমানো যাবে। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর ডায়েট মেনে চললে, ধূমপান বর্জন করলে ও জীবনযাপনে অন্যান্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনলে ঝুঁকি আরো কমে যাবে।’

পূর্বের গবেষণাগুলো থেকেও এ ধারণা পাওয়া গেছে যে, হার্টের রোগ ও ঘুমের মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে, কিন্তু এসব গবেষণা শুধু পর্যবেক্ষণমূলক ছিল বলে (যেখানে বিভিন্ন গ্রুপে কার রোগ হয়েছে তা দেখা হয়েছে) এটা নিশ্চিত হওয়া কঠিন যে ঘুমের ভারসাম্যহীনতা থেকে হার্টে সমস্যা হয়েছে নাকি হৃদরোগের কারণে ঘুমের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। অনেকগুলো ফ্যাক্টর হার্টের স্বাস্থ্য ও ঘুমকে প্রভাবিত করে, যার ফলে কারণ ও প্রতিক্রিয়া নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নতুন গবেষণাটিতে গবেষকরা যুক্তরাজ্যের বায়োব্যাংকের উপাত্ত ব্যবহার করেছেন এবং প্রয়োজনীয় প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পর্যবেক্ষণমূলক ও জিনগত গবেষণাও বিশ্লেষণ করে দেখেছেন। তারা ৩০টি ফ্যাক্টরকে বিবেচনায় রাখেন, যেমন- শরীরের গাঠনিক উপাদান, শারীরিক সক্রিয়তা, আর্থসামাজিক অবস্থা ও মানসিক স্বাস্থ্য। দেখা গেল যে, ঘুমের স্থায়িত্ব এসব ফ্যাক্টরের সম্পৃক্ততা ছাড়াই হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়াতে বা কমাতে পারে। যেসব লোকের ঘুমের স্থায়িত্ব ‘ছয়-নয় ঘন্টা সীমা’ এর যত নিচে নেমেছিল অথবা ওপরে ওঠেছিল তাদের ঝুঁকি তত বেড়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, যারা প্রতিরাতে পাঁচ ঘন্টা ঘুমিয়েছেন তাদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি যারা সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন তাদের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি ছিল। অন্যদিকে যারা প্রতিরাতে ১০ ঘন্টা ঘুমিয়েছেন তাদের ঝুঁকি এর প্রায় দ্বিগুণ ছিল।

এরপর গবেষকরা যারা বংশগত কারণে কম ঘুমায় তাদের হার্ট অ্যাটাকের বাড়তি ঝুঁকি রয়েছে কিনা মূল্যায়ন করতে মেন্ডেলিয়ান রেন্ডমাইজেশন নামক মেথড ব্যবহার করে জেনেটিক প্রোফাইল পর্যবেক্ষণ করেন। কম ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সাতাশটি জেনেটিক ভেরিয়্যান্ট পাওয়া গেছে। গবেষকরা সিদ্ধান্তে আসেন যে, বংশগত কারণে কম ঘুমের প্রবণতাও হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম রিস্ক ফ্যাক্টর। এ বিষয়টা আমাদেরকে এটা বলতে আরো আত্মবিশ্বাসী করেছে যে ঘুমের স্থায়িত্ব হার্টের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে, বলেন ডা. ভেটার।

এ গবেষণায় কম ঘুম বা বেশি ঘুমের কোন মেকানিজম হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায় তা অনুসন্ধান করা হয়নি, কিন্তু পূর্বের গবেষণাগুলো থেকে আমরা কিছু ব্যাখ্যা পেয়েছি। অত্যল্প ঘুম ধমনীর ভেতরের স্তর বা এন্ডোথেলিয়াম ও অস্থিমজ্জার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়া অত্যধিক ঘুমও শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যার সঙ্গে হার্ট-রক্তনালী রোগের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

গবেষকরা আশা করছেন যে, এ গবেষণা চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য এজেন্সি ও সাধারণ মানুষকে ঘুমের হার্ট সংশ্লিষ্ট উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে। ডা. ভেটার বলেন, ‘ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর খাবারের মতো পর্যাপ্ত ঘুমও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।’



ঢাকা/ফিরোজ

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়