ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২১ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

৫৬ টাকার চাল ১৭ টাকায়!

এম এ রহমান মাসুম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-১৬ ১০:৫০:২৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-১৬ ৭:৩০:৩৫ পিএম

সরকারিভাবে বরাদ্দ চাল কেজি প্রতি ৫৬ টাকা। এ টাকায় বাংলাদেশের যে কোনো স্থানে পাওয়া সম্ভব মানসন্মত চাল। যেখানে ভালো মানের মিনিকেট চালের বাজার মূল্য ৫৫ থেকে ৫৮ টাকা।

তারপরও পুলিশ সদস্যসহ রেশন সুবিধাভোগীরা ৫৬ টাকার বরাদ্দকৃত সেই চাল মাত্র ১৭ টাকা কেজিতে বিক্রি করে দেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, কেন?

রেশনগ্রহিতা অধিকাংশের বক্তব্য, বাধ্য হয়ে রেশনে পাওয়া চাল বিক্রি করতে হয়। তাদের অভিযোগ রাজারবাগ পুলিশ লাইনে রেশনের আওতায় অত্যন্ত নিম্ন মানের পোকা খাওয়া ও পচা চাল বিতরণ করা হয়। যা খাওয়ার অনুপোযোগী।

অথচ চাল সরবরাহকারী সংস্থা খাদ্য অধিদপ্তর বলছে, ওয়ারেন্টি প্রথা (পুরাতন চাল আগে সরবরাহের বাধ্যবাধকতা) ভেঙে বিশেষ আদেশে রাজারবাগ পুলিশ সদর দপ্তরে চাল দেওয়া হয়। সে হিসেবে প্রতি মাসে গোডাউনের সবচেয়ে ভালো চাল তাদের (রেশন বিভাগ) কমিটি শনাক্ত করে নিয়ে যায়। চালের মান খারাপ হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

এমনকি পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (রেশনিং বিভাগ) সারোয়ার হোসেনও বাছাই করে চাল আনার কথা জানিয়েছেন। রাইজিংবিডিকে তিনি বলেন, ‘পুলিশ সদর দপ্তর রাজারবাগে এ সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি রয়েছে। আমরা নিজেরাই খাদ্য অধিদপ্তরের গোডাউন থেকে যাচাই-বাছাই করে সবচেয়ে ভালো চাল নিয়ে আসি। চাল একটু মোটা হতে পারে। তবে খাওয়ার অনুপযোগী নয়।’

তারপরও কেন সরকারি রেশনে গন্ধযুক্ত ও নিম্ন মানের চাল পাচ্ছেন পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) অন্যান্য সুবিধাভোগীরা। তাদের অধিকাংশেরই অভিযোগ ঠিকাদারসহ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারসাজিতে মানসম্মত চাল হয়ে যাচ্ছে নিম্ন মানের চাল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভুক্তভোগী রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘রাজারবাগ পুলিশ সদর দপ্তরের ভেতরে একটি দোকান আছে, যেখানে মাত্র ১৭ টাকা কেজি হিসাবে চাল ক্রয় করে। অধিকাংশরা নিম্ন মানের জন্য চাল সেখানে বিক্রি করে দেয়। পরের মাসে ঘুরে-ফিরে একই চাল আবার বিতরণ হতে পারে। অন্যদিকে খাদ্য অধিদপ্তর থেকে আসা চালের ট্রাকেও কোনো কারসাজি থাকতে পারে বলে সন্দেহ রয়েছে। কেননা সবাই বলছে চাল বাছাই করে আনা হয়। কিন্তু সত্যিটা হলো দিনশেষে প্রতি মাসে খারাপ চালই ভাগ্যে জোটে। অভিযোগ করেও কোনো লাভ হচ্ছে না।’

এ বিষয়ে জানতে খাদ্য অধিদপ্তরের সরবরাহ, বণ্টন ও বিপণন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা কোনো বক্তব্য দিতে অস্বীকার করেন।

অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের সারোয়ার হোসেন রাইজিংবিডিকে আরো বলেন, ‘গোডাউনের খারাপ চাল থাকলে আমাদের করণীয় কিছু নেই। গোডাউনে কিছুদিন থাকার কারণে অনেক সময় গন্ধ হয়ে যায়। তবে চাল খাওয়ার অনুপযোগী নয়। এ বিষয়ে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েছি। হয়ত খাদ্য অধিদপ্তরের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।’

ঘুরে-ফিরে একই চাল আবার বিতরণ হয় এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এমন কোনো সুযোগ নেই। কারণ আমাদের চাহিদা মতো ঠিকাদার চাল সরবরাহ করে। ওই চাল গোডাউনে যাওয়ার সুযোগ নেই। যারা কিনে তারা হয়ত অন্য কোনো জায়গায় বিক্রি করে থাকতে পারে। তবে গোডাউনে যাওয়ার সুযোগ নেই।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের অপর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘এর আগে মানুষ চাল বাইরেই বিক্রি করতো। তবে বর্তমানে সদর দপ্তরের ভেতরেই একটি দোকান রয়েছে। যেখানে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ওই চালের মূল্য নির্ধারণ করে ক্রয় করা হয়। রেশন গ্রহণ করার পরে ইচ্ছা করলে তারা বিক্রি করতে পারে। এটা তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। আর ক্রয়-বিক্রয়ে যে লাভ হয়, সেই লভ্যাংশ পুলিশের মেসের সদস্যদের জন্য ব্যয় হয়। কারণ মেসটা ভর্তুকি দিয়ে চলে। এ ছাড়া কমিশনার দপ্তর থেকে মাথাপিছু ৫০০ টাকা বরাদ্দ দিতে হয় ।’

এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) প্রায়ই আসছে বিভিন্ন অভিযোগ। সম্প্রতি বেশকিছু অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবছে সংস্থাটি। বিষয়টি অনুসন্ধানের পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে যেকোনো সময় অভিযান চালানো হতে পারে বলে জানা গেছে।

সবশেষ দুদকের হটলাইনে কনস্টেবল পদমর্যাদার এক ব্যক্তি এ অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগেও রাজারবাগ পুলিশ লাইনের রেশন স্টোরে অত্যন্ত নিম্ন মানের পোকা খাওয়া ও পচা চাল বিতরণ করার কথা জানিয়ে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে চালের সরবরাহকারী ও আড়তদারকে দায়ী করা হয়। একই সঙ্গে দুদকের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

সম্প্রতি পুলিশের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়, এর মধ্যে রেশন সুবিধাও রয়েছে। দুদকসহ বেশ কয়েকটি সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এ সু্বিধা পাচ্ছেন। রেশন পণ্যের মধ্যে রয়েছে— চাল, ডাল, আটা, চিনি ও ভোজ্য তেল। এই পাঁচ পণ্যের মধ্যে চারটি নিয়ে তেমন বড় অভিযোগ না থাকলেও চাল নিয়ে বেশ অসন্তুষ্টি রয়েছ। গন্ধযুক্ত ও নিম্ন মানের রেশনের চাল নিয়ে তারা ক্ষুব্ধ।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে পুলিশের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রেশন নীতিমালায় সংশোধন করা হয়। পুলিশে কর্মরত এবং প্রেষণে নিয়োজিত সব পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে এই নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১৩ ও ২০১৮ সালে থেকে পর্যায়ক্রমে দুদকের নিজস্ব কর্মচারী-কর্মকর্তারা রেশন সুবিধার আওতায় আসেন।

পরিবার এক সদস্যের হলে তিনি প্রতি মাসে ১১ কেজি চাল (সিদ্ধ বা আতপ), ১২ কেজি আটা, ১ কেজি ৭৫০ গ্রাম চিনি, আড়াই লিটার ভোজ্য তেল, সাড়ে তিন কেজি ডাল ও ৩৭ কেজি ৩২৪ গ্রাম জ্বালানি কাঠ পাবেন। দুই সদস্যের পরিবার হলে মাসে ২০ কেজি চাল, ২০ কেজি আটা, ৩ কেজি চিনি, সাড়ে ৪ লিটার ভোজ্য তেল ও সাড়ে ৫ কেজি ডাল পাবেন।

তিন সদস্যের পরিবার হলে মাসে ৩০ কেজি চাল, ২৫ কেজি আটা, ৪ কেজি চিনি, ৬ লিটার ভোজ্য তেল ও ৭ কেজি ডাল পাবেন। চার সদস্যের পরিবার পাবে প্রতি মাসে ৩৫ কেজি চাল, ৩০ কেজি আটা, ৫ কেজি চিনি, ৮ লিটার ভোজ্য তেল ও ৮ কেজি ডাল।

আর চার সদস্যের পরিবার পাবে প্রতি মাসে ৩৫ কেজি চাল, ৩০ কেজি আটা, ৫ কেজি চিনি, ৮ লিটার ভোজ্য তেল ও ৮ কেজি ডাল।

** পুলিশের রেশনে পোকা খাওয়া ও পচা চাল, নজর দুদকের


ঢাকা/এম এ রহমান/ইভা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন