ঢাকা, রবিবার, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৭ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ছোট অপরাধ দিয়ে বড় অপরাধের হাতে খড়ি

মাকসুদুর রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-২১ ৭:৫৫:৪৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-২২ ৮:১৭:০২ এএম
প্রতিকী ছবি

ঘটনাস্থল মুগদা থানা। শনিবার (১৯ অক্টোবর) রাতে পাঁচ কিশোরকে ধরে আনে পুলিশ। পাশ্চাত‌্য ধাঁচে চুল কাটা, হাতে ব্রেসলেট। কারো আবার কান ফোঁড়ানো।

থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) প্রলয় কুমার সাহা রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘তারা ‘শুভ্র’ গ্রুপের সদস্য। কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত। তারা রাস্তা বা গলির মাথায় দাঁড়িয়ে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে। এদের অনেকেই মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। সবাই স্কুলছাত্র। সেজন‌্য অভিভাবকদের ডেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’

আটক হওয়া কিশোর রায়হানের সঙ্গে কথা হয়। সে রাইজিংবিডিকে জানায়, নিজেদের শক্তি বাড়াতে তারা গ্যাং করেছে। অন্যের হামলা থেকে নিজেদের বাঁচানোও তাদের উদ্দেশ্য। আর ‘বড় ভাই’রাতো আছেই।

পুলিশ জানায়, শুধু ‘শুভ গ্রুপ’ই নয়। ‘তারেক’, ‘আলিফ’, ‘সেভেন স্টার’সহ এই থানা এলাকায় আটটি কিশোর গ্যাং গ্রুপ রয়েছে। এসব গ্যাং সদস্যদের বয়স ১২ থেকে ১৫ বছর। আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে অস্ত্র-মাদক কেনাবেচা করে তারা। তাদের শেল্টারদাতা স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম ভাট্টি। তিনি শুধু এসব কিশোরদের দিয়ে এলাকায় রাজনৈতিক শো ডাউনই করান না, নানা ধরনের অপরাধ করতেও নেপথ্যে থেকে কাজ করেন।

তবে এসব অভিযাগে অস্বীকার করেছেন সিরাজুল ইসলাম। তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশীভূত হয়ে আমার বিরুদ্ধে এ ধরনের অপপ্রচার করা হচ্ছে। আমি কেন কিশোরদের ব্যবহার করতে যাব?’

র‌্যাবের কাছে তথ্য আছে, গত ৪ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরে চাইল্ড হ্যাভেন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র মহসিনকে হত্যা করে ‘আতঙ্ক’ গ্রুপের সদস্যরা। এক তরুণীকে নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয়।

এর আগে ২৯ জুন হাজারীবাগ এলাকায় ১৫ বছর বয়সী ইয়াছিন আরফাত ও ৭ জুলাই গেন্ডারিয়া হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র শাওন খুন হয়। এ ছাড়া ২০১৮ সালের ৬ জানুয়ারি উত্তরার ‘ডিসকো বয়েজ’ ও ‘নাইন স্টার’ গ্রুপের দ্বন্দ্বে খুন হয় নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবির।

এসব ঘটনার পর র‌্যাবের একটি সেল কিশোর গ্যাং বিরোধী কাজ শুরু করেছে। তাদের তদন্তে অভিজাত এলাকার পাশাপাশি মিরপুর, যাত্রাবাড়ি, মতিঝিল, ফার্মগেট, রায়েরবাজার, তেজগাঁও, বাড্ডা, বংশাল, তাতীবাজার, শাঁখারীবাজার, লালবাগ, হাজারীবাগ ও সূত্রাপুরসহ প্রায় প্রতিটি এলাকায় কমপক্ষে ১০টি করে কিশোর গ্যাং থাকার সত‌্যতা মিলেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের অনেকেই স্কুলের গন্ডি পার হতে পারেনি। ইউরোপীয় কালচারের আদলে তাদের চলাফেরা। নিত্য-নতুন মডেলের স্পোর্টস বাইক ব্যবহার করে তারা। মোটা সাইলেন্সলারের বিকট শব্দ আর বেপরোয়া গতিতে ছুটে বেড়ায়। ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ-এ তাদের গ্রুপ চ্যাটিং হয়। গ্রুপের নেতা বিভিন্ন নির্দেশনা চ্যাটের মাধ্যমেই জানিয়ে দেয়। তারা রাজধানীর পাড়ায়-পাড়ায় অলিগলির মোড়ে জটলা করে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের আসা-যাওয়ার রাস্তায়ও তাদের দেখা মেলে। অনেকেই রাতের বেলা ফাঁকা রাস্তায় পথচারি বা রিকশা যাত্রীদের সবকিছু লুটে নেয়। এ ছাড়া মাদক ব্যবসা করে যে আয় হয়, তা দিয়েই গ্রুপের খরচ চালায় তারা।

এ বিষয়ে সোমবার বিকেলে কথা হয় র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া পরিচালক লে. কর্নেল সরওয়ার বিন কাশেমের সঙ্গে। তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘কিশোর গ্যাং বিরোধী অভিযান অব্যাহত আছে। অন্তত ৩০০ জন কিশোরকে আটক করে সংশোধানাগারে পাঠানো হয়েছে। তারপরও তাদের কর্মকাণ্ড থামেনি। এ কারণে বিভিন্ন এলাকায় র‌্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে।’

গোয়েন্দারা জানায়, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। কিশোররা প্রকাশ্যেই জড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতি সংঘাতে। রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’ বা নেতারা নিজেদের আধিপত্য বিস্তার, এলাকায় টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি এমনকি মাদক ব্যবসায় এসব কিশোরদের ব্যবহার করছে। এসব খাত থেকে প্রতিদিন যে টাকা আসে, তার একটি অংশ নেতার হাতে তুলে দেন `বড় ভাই’রা।

পুলিশের সদর দপ্তরের এআইজি সোহেল রানা বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম রোধে কাজ করছে পুলিশ। পুলিশের সব ইউনিটকে নির্দেশ দেয়া আছে। সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগও এক্ষেত্রে জরুরি।’

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এসব কিশোর ভবিষ্যতের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তারা ছোট ছোট অপরাধ করছে। তবে এর মধ‌্য দিয়েই বড় অপরাধের হাতেখড়িও হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক জিয়া খান বলেন, ‘কিশোর বয়সী ছেলে যদি রাত ১০টা পর্যন্ত ঘরের বাইরে থাকে, তবে আমরা ধরে নিতে পারি সে গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাইরে ছিল। কিন্তু কাজটি যদি গুরুত্বপূর্ণ না হয়, সে ব‌্যাপারে ভালো করে খোঁজ নিতে হবে পরিবারকে। সেজন‌্য পরিবারের সঙ্গে কিশোরদের বন্ধনটাও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।’


ঢাকা/মাকসুদ/সনি

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন