ঢাকা, শুক্রবার, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

সম্মেলন শনিবার: শ্রমিকবান্ধব নেতৃত্ব চায় শ্রমিক লীগ

এসকে রেজা পারভেজ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-০৮ ৯:৩৪:৩৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-০৯ ১১:০২:৩১ এএম

একটা সময় শ্রমিক সংগঠনগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা শ্রমিক স্বার্থ নিয়ে কথা বললেও এখন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মূল কাজের বাইরে গিয়ে তারা দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, নিয়োগ-পদোন্নতি বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ছেন। গত এক দশকে শ্রমিক লীগের বিরুদ্ধেও এই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। যে লক্ষ্যে শ্রমিক লীগ গঠন করা হয়েছিল, সেই নীতি আর আদর্শ থেকে অনেকটাই বিচ‌্যুত এই সংগঠনটি। দলটির নেতা-কর্মীদের প্রত্যাশা, নতুন সম্মেলনের মাধ্যমে শ্রমিকবান্ধব নেতৃত্ব আসবে। যারা নীতি আর আদর্শের জায়গা ঠিক রেখে শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করবেন।

শ্রমিক লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে শনিবার।  বেলা ১১টায় রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সাদা পায়রা এবং বেলুন উড়িয়ে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে সম্মেলন উদ্বোধন করবেন।  এ সময় একযোগে শ্রমিক লীগের ৭৪টি সাংগঠনিক জেলার দলীয় পতাকাও উত্তোলন করা হবে। থাকছে ফকির আলমগীর ও মমতাজ বেগমের পরিবেশনায় গণসংগীত।

সম্মেলনের প্রথম পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী।  দুপুরের বিরতির পর সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনষ্টিটিউশনে।  এখানেই ঘোষণা হবে শ্রমিক লীগের নতুন নেতৃত্ব।  তবে বৈরি আবহাওয়া সম্মেলনে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করেন সংগঠনের সভাপতি শুকুর মাহমুদ।

১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শ্রমিক লীগ প্রতিষ্ঠা করেন।  ২০০৮ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুসারে শ্রমিক লীগকে ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের মর্যাদা দেয় আওয়ামী লীগ।  শ্রমিক লীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল ২০১২ সালে।  ওই সম্মেলনে সভাপতি হন শুকুর আহমেদ, সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান সিরাজুল ইসলাম।

শ্রমিক লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা বলছেন, বঙ্গবন্ধু যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে শ্রমিক লীগ গঠন করেছিলেন তা থেকে যোজন-যোজন দূরে এখন তার হাতে গড়া এই সংগঠন।  শ্রমিক লীগের অনেক নেতাই আছেন যারা ঠিকমতো নিজের অফিসও করেন না। অনেকে অবসরে গেছেন অথচ এখনও শ্রমিক নেতার পদ আকড়ে বসে আছেন।  নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি চাঁদাবাজি, দখলসহ নানা রকম কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে।  শ্রমিক নেতা হয়ে কারো কারো বিলাসী জীবনযাপন।  চলেন দামি গাড়িতে, থাকেন কোটি টাকার বাড়িতে। সংগঠনটির দায়িত্বশীল নেতারা নিজেদের আখের গোছাতে গিয়ে সংগঠনটির সাংগঠনিক ভিত করেছেন দুর্বল।  এর কারণ হিসেবে প্রায় আট বছর পর সম্মেলন না হওয়া এবং আদর্শ বিচ্যুত হওয়াকে দুষছেন নেতা-কর্মীরা।

এদিকে শ্রমিক লীগের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির স্থায়ী নিয়োগ না থাকায় ইউনিয়নগুলো সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে শ্রমিক লীগের।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলাম রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘গত ২৫ বছর ধরে ব্যাংক খাতে কোনো কর্মচারী নিয়োগ নেই।  যেহেতু এই সেক্টরে কোন কর্মচারী নিয়োগ নেই স্বভাবতই এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে কিছু দিন পর ইউনিয়ন করার মত কোন লোক পাওয়া যাবে না।  এখন আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোকবল নিয়োগ করা হয়, এই কর্মচারীরা আজকে এই প্রতিষ্ঠানে কালকে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করে।  তাদের ইউনিয়ন করার মত কোনো সুযোগ নেই।  যার কারণে শ্রমিক লীগের কর্মকাণ্ড এই ক্ষেত্রে কমে যাচ্ছে।’

জানা গেছে, জাতীয় শ্রমিক লীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি ৩৫ সদস্যের। এর মধ্যে ২৭ জনই বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের সিবিএ (কালেকটিভ বার্গেইনিং এজেন্ট) নেতা।  সংগঠনের সিনিয়র সহ-সভাপতি সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান।  তিনি একাধারে সরকারের মন্ত্রী ছিলেন, আবার ছিলেন শ্রমিক নেতাও। সম্প্রতি সময়ে তিনি সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বেশ সমালোচিতও ছিলেন।  তার সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের বিরুদ্ধে সারা দেশের পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ আছে।  শ্রমিক লীগের বেশিরভাগ শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে রয়েছে এমন অভিযোগ। তবে নেতা-কর্মীদের প্রত্যাশা, শ্রমিক লীগের এই সম্মেলনের দলের জন্য ত্যাগী ও শ্রমিকবান্ধব নেতৃত্বই উঠে আসবে।  দলের মধ্যে চলা সম্প্রতি সময়ের শুদ্ধি অভিযানকে আলোর বার্তা হিসেবে দেখছেন তারা।

শ্রমিক লীগের এবারের সম্মেলনে সভাপতি পদে আলোচনায় আছেন সংগঠনটির বর্তমান কমিটির কার্যকরি সভাপতি ফজলুল হক মন্টু, সরদার মোতাহের উদ্দিন, নূর কুতুব আলম মান্নান, হাবিবুর রহমান আকন্দ, আমিনুল হক ফারুক, মোল্লা আবুল কালাম আজাদ, এজাজ আহমেদ, সাবেক শ্রমিক নেতা ইসরাফিল আলম।  এছাড়া বর্তমান সভাপতি শুক্কুর মাহমুদ এবং সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলামও সভাপতি পদপ্রার্থী। সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন সংগঠনটির বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির, খান সিরাজুল ইসলাম, প্রচার সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব কে এম আযম খসরু,  দপ্তর সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, অর্থ বিষয়ক সম্পাদক সুলতান আহমেদ, শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পদক কাউসার আহমেদ পলাশ, তথ্য ও গবেষণা  সম্পাদক মোতালেব হাওলাদার।

সম্মেলন নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা জানাতে গিয়ে আমিনুল হক ফারুক রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘আমি ব্যাংক কর্মচারী ফেডারেশন বাংলাদেশের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এর আগে শ্রমিক লীগের সম্পাদক, দুইবার সাংগঠনিক সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি।  ১৯৮৭ সাল থেকে শ্রমিক লীগের রাজনীতিতে আছি।  মুন্সীগঞ্জ জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং বিক্রমপুর কলেজের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। ভবিষ্যতে শ্রমিক লীগকে সাংগঠনিকভাবে আরো শক্তিশালী করতে পারবে এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন।  এক্ষেত্রে সাংগঠনিকভাবে দক্ষ এমন নেতা শ্রমিক লীগের নেতৃত্বে আসুক।  তবে জননেত্রী (শেখ হাসিনা) যাদের দায়িত্ব দেবেন সেটিই শেষ কথা। ১/১১-তে নেত্রীর জন্য শ্রমিকদের নিয়ে আন্দোলন করেছি।  নিশ্চয়ই এর প্রতিদান দল দেবে।’ 

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন আহমেদ রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি আছে এমন নেতারা নেতৃত্বে আসলে শ্রমিক লীগ তার ঐতিহ্য ফিরে পাবে।  আমরা চাই কোনো দুর্নীতিবাজ ও অনুপ্রবেশকারী যাতে শ্রমিক লীগের নেতৃত্বে যাতে না আসে।’

সঠিক সময়ে সম্মেলন হওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সাংগঠনিক সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ রাইজিংবিডিকে বলেন, সময় মতো সম্মেলন না হওয়ার কারণে শ্রমিক লীগের নেতা-কর্মীদের মাঝে হতাশা বেড়েছে।  এতে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসার পথ রুদ্ধ হচ্ছে।

আলহাজ্ব কে এম আজম খসরু রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির চাকা চালু রেখেছে শ্রমিকরা।  আর শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে কথা বলেন শ্রমিক লীগ।  সে হিসেবে শ্রমিক লীগের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক।  আমি ‘৭৫ পরবর্তী সময়ে আমার জেলা ফরিদপুরে জীবনের তোয়াক্কা না করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে টিকিয়ে রেখেছি, সুসংগঠিত করেছি। এক-এগারোতে নির্যাতিত হয়েছি।  দীর্ঘদিন সোনালী ব্যাংকের সিবিএ সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি।  দল যদি মনে করে আমি যোগ্য তাহলে যে দায়িত্ব দেবে সেটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো।’

অর্থ সম্পাদক মো. সুলতান আহমেদ রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘২০১৯ সাল থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড সিবিএ ৩ বার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি। শ্রমিক লীগের দুই কমিটির অর্থ সম্পাদক।  শিবচর থানা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হিসেবে আছি।  দলের দুঃসময়ে অবদান রেখেছি।  প্রত্যাশা করি, দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, দুদকের মামলা যাদের বিরুদ্ধে আছে, অন্য দল থেকে যারা এসে গত কাউন্সিলে পদ পেয়েছে; তারা যেন এবার না আসে। ত্যাগী আদর্শিক সৎ নেতৃত্ব প্রত্যাশা করি।’

শ্রমিক লীগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে শ্রমিক লীগের নিবন্ধিত সদস্য সংখ্যা ছিল ৫ লাখ।  বর্তমানে দেশে শ্রমিক লীগের পদধারী নেতা আছেন ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫০ জন। এর মধ্যে নারী আছেন ৫৬ হাজার ৪৬৬ জন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমিক লীগের আরো অন্তত ২০টি কমিটি রয়েছে।  সংগঠনের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ১০ স্তরের কমিটি রয়েছে।  আছে সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সিবিএ, জাতীয় ও বিভিন্ন বেসিক ইউনিয়ন।  এর মধ‌্যে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির ১টি, ইন্ডাস্ট্রি/ক্রাফট কমিটির ১৬টি, জাতীয় ইউনিয়ন  ৭৮টি, ব্যাসিক ইউনিয়ন ৩৩৩টি, সিটি কমিটি ১২টি, মহিলা কমিটি ১টি, যুব কমিটি ১টি, জেলা কমিটি ৭৪টি, আঞ্চলিক কমিটি ৩০টি, থানা কমিটির ৪৯১টি এবং ৩২৭টি পৌর কমিটির রয়েছে।   গঠনতন্ত্রে দুই বছর পরপর সম্মেলন করার নিয়ম থাকলেও গত কাউন্সিল থেকে সেটি পরিবর্তন করে এক বছর বাড়ানো হয়েছে।

শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলাম রাইজিংবিডিকে জানান, সম্মেলনে সাড়ে আট হাজার কাউন্সিলর, সাড়ে আট হাজার ডেলিগেটর আসবে।  থাকবেন বিদেশি অতিথিও। এর মধ্যে রয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন বাংলাদেশ কাউন্সিল-আইটিইউসি জেনারেল সেক্রেটারি জাপানি নাগরিক ওসিদা, সার্ক শ্রমিক সংগঠনের জেনারেল সেক্রেটারি শ্রীলঙ্কান নাগরিক লাক্সমান বাক্সনেট, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-আইএলও এর কান্ট্রি ডিরেক্টর মি টোমো।  সম্মেলনে তারাও বক্তব্য রাখবেন।

বৈরি আবহাওয়ায় সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে জানতে চাইলে শ্রমিক লীগের সভাপতি শুকুর মাহমুদ রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে।  আবহাওয়া একটু বৈরি আছে, তবে খুব বেশি সমস্যা হবে না।  বড় প্যান্ডেল আছে।  আমাদের সার্বিক প্রস্তুতিও রয়েছে।’


ঢাকা/পারভেজ/সাইফ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন