ঢাকা, রবিবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

মিল্কী থেকে ক্যাসিনো, কোন পথে মহানগর যুবলীগ

এসকে রেজা পারভেজ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-২১ ১০:২১:৩১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-২২ ৭:৪৭:০৬ পিএম

২০১৩ সালে টেন্ডার নিয়ে বিভেদের জের ধরে খুন হন যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্কী।  ২০১৯-এ এসে ক্যাসিনো কর্মকাণ্ডে যুবলীগ দক্ষিণের আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে আবারো নেতিবাচক শিরোনামে যুবলীগ।  ক্যাসিনোর সেই রেশ আছে এখনো।  বারবার নেগেটিভ কর্মকাণ্ডে আলোচনায় উঠে আসছে যুবলীগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকা মহানগর শাখাটি। তাই নতুন সম্মেলনকে ঘিরে ‘পরিচ্ছন্ন রাজনীতি’র সূচনা চান সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা।

মহানগরের সম্মেলনের দিনক্ষণ ঠিক না হলেও কেন্দ্রীয় যুবলীগের সম্মেলনের ডামাডোলের মাঝেই সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা উৎসবে মেতেছেন। সূত্র বলছে, কেন্দ্রের পর মহানগর যুবলীগকে এবার ঢেলে সাজাবে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। যুবলীগকে স্বমহিমায় ফেরাতে উত্তর-দক্ষিণের নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় চমক আসতে যাচ্ছে।  সংগঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই দুই ইউনিটে নেতৃত্ব বাছাইয়ে ব্যাপক যাচাই-বাছাই হচ্ছে বলে দলীয় সূত্রগুলো বলছে।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি ক্যাসিনো কর্মকাণ্ডে যুবলীগের বিভিন্ন নেতার কর্মকাণ্ড বেশ বিব্রত করেছে আওয়ামী লীগকে।  অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলটির যে প্রভূত উন্নয়ন তা ম্লান করে দিচ্ছিল দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, অবৈধ ক্যাসিনো-প্রভৃতি নেতিবাচক খবরে। সেজন্য দলের মধ্যে শুদ্ধি অভিযান সময়ের দাবি মনে করছেন তারা।  এর মাধ্যমে দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে এই বার্তা দেয়া হয়েছে যে, ক্ষমতায় কাছে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার চলবে না। দলের মধ্যে শুদ্ধি অভিযানের কঠোর এই বার্তা সরকারের বিভিন্ন পর্যায়েও বেশ প্রভাব ফেলেছে।  সরকার বর্তমানে দুর্নীতি প্রতিরোধকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। এজন্য ঘর থেকেই অভিযান শুরু করেছে আওয়ামী লীগ।  যার সূচনা হয়েছে যুবলীগ দক্ষিণ থেকে।

যুবলীগের সবচেয়ে ইমেজ সংকটসহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে ঢাকা মহানগর। গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযানের শুরুতে গ্রেপ্তার হন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। এরপর একই কমিটির সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী (সম্রাট) ও সহ সভাপতি এনামুল হক (আরমান) গ্রেপ্তার হন।  অভিযানের মধ্যে উঠে আসে আরো অনেক নেতার নামও। এরপর যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।  একাধিক নেতা সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত হন।  যুবলীগের বেশ কয়েকজন নেতার দুর্নীতির অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। যুবলীগের চেয়ারম্যানকে বাদ দিয়েই সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি করা হয়েছে।

নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি নাম এসেছে যুবলীগের উত্তর-দক্ষিণ শাখার নেতাদের।  তবে অতীত ঝেড়ে ফেলে নতুন সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ক্লিন ইমেজের নেতা পাবেন বলে বিশ্বাস করছেন নেতা-কর্মীরা।  আগামী ২৩ নভেম্বর যুবলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের তারিখ নির্ধারিত থাকলেও এখনো উত্তর-দক্ষিণের সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা হয়নি। কেন্দ্রীয় সম্মেলনের সঙ্গে উত্তর-দক্ষিণের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা  হতে পারে বলে যুবলীগ নেতা-কর্মীদের মধ্যে যে গুঞ্জন রয়েছে, সেটি উড়িয়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক।

রাইজিংবিডিকে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রের পর যুবলীগের উত্তর-দক্ষিণের সম্মেলন হবে। তবে তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি।  কেন্দ্রের সম্মেলনের দিন মহানগরের শীর্ষ নেততৃ ঘোষণার কোনো সম্ভাবনা নেই।’

কংগ্রেস প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক চয়ন ইসলাম রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে এই ধরনের নির্দেশনা আসেনি। যুবলীগের মহানগরের সম্মেলন পৃথকভাবে হবে। তবে সেটির তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি।’     

তবে দিনক্ষণ ঠিক না হলেও সম্ভাব্য সম্মেলনের ডামাডোলে মহানগর যুবলীগের নতুন নেতৃত্বের পদপ্রত্যাশীরাও নিজেকে উপস্থাপন করছেন বিভিন্ন মাধ্যমে। উত্তর-দক্ষিণের যারা পদ প্রত্যাশী তারা সংগঠনটিকে আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অনেকে নিজের পরিকল্পনার কথা গণমাধ্যমে জানাচ্ছেন।  তারা বলছেন, কিছু ব্যক্তির কারণে যুবলীগের ইমেজ সংকট তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে তারা সংগঠনকে ইতিবাচক ধারায় নিয়ে আসতে চান।

দলীয় সূত্র বলছে, মহানগরের যুবলীগের নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যাপক যাচাই-বাছাই আর তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মেয়াদ, পারিবারিক রাজনীতির ঐতিহ্য, আওয়ামী পরিবার কি না, এর আগে অন্য দলের সমর্থক বা পদে ছিল কি না, ছাত্রলীগের রাজনীতিতে অবদান প্রভৃতি বিষয়গুলো বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যাবে।  একই সঙ্গে ৫৫ বছরের যে বয়সসীমা রয়েছে সেটিও অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনায় থাকছে।     

ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগে শীর্ষ নেতৃত্বে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মো. ইসমাইল হোসেন, প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তাসভীরুল হক অনু, উপ-দপ্তর সম্পাদক এ এইচ এম কামরুজ্জামান কামরুল ও সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শাহাদাত হোসেন ভূঁইয়া সেলিম।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের আলোচনায় রয়েছেন যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী সারোয়ার হোসেন বাবু, সহ সভাপতি আহম্মদ উল্লা মধু, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এইচ এম রেজাউল করিম রেজা, সাংগঠনিক মাকসুদুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি সৈয়দ আলাওল ইসলাম সৈকত, উপ দপ্তর সম্পাদক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক খন্দকার আরিফ-উজ-জামান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম আকন্দ, ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক তৌফিদুল ইসলাম বুলবুলের নাম আলোচনায় রয়েছে।

নেতৃত্বের প্রত্যাশার কথা জানাতে গিয়ে গাজী সারোয়ার হোসেন বাবু রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘দুর্দিনে যারা দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, ছাত্রলীগের ত্যাগী অবদান রয়েছে নেতৃত্ব তারা আসলে যুবলীগ হবে অনুসরণীয় এক সংগঠন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ বিরোধীদল থাকাকালীন যারা রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে সাহসী ভূমিকা রেখেছে অতীতের সেই কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নেয়া দরকার। একই সঙ্গে যারা নেতৃত্বে আসবেন তারা যেন অবশ্যই আওয়ামী পরিবারের সন্তান হন। জননেত্রী শেখ হাসিনা যে নেতৃত্ব উপহার দেবেন, সেভাবে সংগঠনের জন্য শতভাগ উজাড় করে কাজ করে যেতে চাই। ’

সাইফুল ইসলাম আকন্দ ব‌লেন, যুবলীগের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সেই গৌরবে কিছুটা হলেও ধাক্কা লেগেছে। আগামীতে যুবলীগের নেতৃত্বে যারা আসবে তাদের প্রধান কাজ হবে যুবলীগের পরিচ্ছন্ন রাজনীতিন পথ প্রশস্ত করা। সেজন্য পরীক্ষিত, ত্যাগী এবং সৎ  নেতাদের যুবলীগের নেতৃত্বে নিয়ে আসতে হবে।

খন্দকার আরিফ-উজ-জামান বলেন, ‘রাজপথে দুর্দিনে কর্মী, যারা শেখ হাসিনার সব আন্দোলন সংগ্রামে ত্যাগী এবং নিবেদিত প্রাণ ছিলেন তারা যেন যুবলীগের আসে সেই প্রত্যাশা করি। পরিচ্ছন্ন রাজনীতির সূচনা করতে চাই যুবলীগের নেতৃত্ব পেলে।  যুবলীগের ঐতিহ্য ফেরাতে সৎ নেতৃত্বের বিকল্প নেই।’

সৈয়দ আলাওল ইসলাম সৈকত বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে দেশরত্ন শেখ হাসিনার ভিশন বাস্তবায়নে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগকে অতীতের মতই ভ্যানগার্ড এর ভূমিকা পালন করতে হবে।  সে কারণে যুবলীগের যে ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে, তা রক্ষার্থে এবং আরো সুসংগঠিত করতে সৎ, শিক্ষিত, ত্যাগী ও ছাত্রলীগ করে আসা সাবেক নেতাদের নতুন নেতৃত্বে নিয়ে আসা সময়ের দাবি। দেশরত্ন শেখ হাসিনা যেভাবে নতুন নেতৃত্ব সাজাবেন এবং যেই সিদ্ধান্তই দিবেন তা বাস্তবায়ন করতে আমরা অতীতের মতই কাজ করে যাব।’

তাসভীরুল হক অনু বলেন, ‘রাজপথের পরিশ্রমী ছাত্রনেতা, লড়াকু ও ক্লিন ইমেজ রয়েছে সংগঠনের ভাবমূর্তি ফেরাতে সেই ধরনের নেতৃত্ব প্রয়োজন। তবে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা যাকেই মহানগর উত্তরের নেতৃত্ব দেবেন, তার নেতৃত্বেই সংগঠনকে শক্তিশালী করতে কাজ করে যাব।’

এ এইচ এম কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘আমরা চাই যারা যুবলীগ করেছে ছাত্রলীগ ব্যাকগ্রাউন্ড আছে এমন নেতা দিয়ে যুবলীগের কমিটি হোক। কারণ ঢাকা মহানগর যুবলীগ শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট। এই ইউনিট যদি দুর্বল হয় আওয়ামী লীগের যেকোনো কর্মসূচি পালনে বেগ পেতে হবে। এই দিকটি খেয়াল রেখে নতুন নেতৃত্ব আসতে হবে, যে নেতা তার কর্মীদের মাঝে জনপ্রিয় এবং কর্মীদের কাছে সুপরিচিত।’

যুবলীগ দক্ষিণের সম্মেলন হয়েছিল ২০১২ সালের ৫ জুলাই।  আর উত্তরের সম্মেলন হয়েছিল ৮ জুলাই। ওই সম্মেলনে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হন ইসমাঈল চৌধুরী সম্রাট এবং সাধারণ সম্পাদক হন ওয়াহিদুল ইসলাম আরিফ।  আর উত্তরের সভাপতি হন মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান ইসমাইল হোসেন।  ২০১৩ সালে মিল্কী হত্যার পর পলাতক থাকেন ওয়াহিদুল ইসলাম আরিফ।  এ সময় ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান এইচ এম রেজাউল করিম রেজা।


ঢাকা/পারভেজ/সাইফ/নাসিম

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন