RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ২০ ১৪২৭ ||  ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২

মধ‌্যপ্রাচ‌্যের অস্থিরতায় সরকারের সতর্ক দৃষ্টি

হাসান মাহামুদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:০১, ৫ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
মধ‌্যপ্রাচ‌্যের অস্থিরতায় সরকারের সতর্ক দৃষ্টি

জেনারেল কাসেম সোলেমানি নিহত হওয়ার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে এর প্রেক্ষিতে এই অঞ্চলে বৈরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি এবং শ্রমবাজারে। যেকোনো পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার স্বার্থে ফেরত আনা লাগতে পারে সেসব দেশে অবস্থাররত বাংলাদেশিদের। এসব বিষয় বিবেচনায় পরিস্থিতি পর্যালোচনায়ে রেখেছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এক্ষেত্রে জরুরি কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে মধ‌্যপ্রাচ‌্যের দেশগুলোতে বিশেষ করে ইরান এবং ইরাকে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের  ফেরত আনার কিংবা সুরক্ষা নিশ্চিতের বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে বাংলাদেশ সরকার। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এখনই দেশগুলো থেকে ‘এস্কেপ প্ল‌্যান’ চূড়ান্ত করা হয়নি। সরকার এখনো পরিস্থিতি বিবেচনা এবং পর্যালোচনা করছে।

এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ রোববার রাইজিংবিডিকে বলেন, মধ‌্যপ্রাচ‌্যে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা আমরাও করছি। তবে এখনই আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না। তবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা সতর্ক রয়েছি।

তিনি বলেন, চলমান বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সোমবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেনের সাথে আমাদের বৈঠক হবে। সেখানে বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হবে। আমরা অবশ‌্যই আমাদের প্রবাসীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব।

মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের ১৫৮টির বেশি দেশে জনশক্তি রপ্তানি করে বাংলাদেশ। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী  এ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে বিদেশে। এর মধ‌্যে দেশের শ্রম রপ্তানির ৮০ ভাগই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। যদিও নানা অসঙ্গতির কারণে এ অঞ্চলে আমাদের জনশক্তি রপ্তানি কমেছে। এর সাথে নতুন সমস‌্যা তৈরি হলে তার প্রভাব খুব খারাপ হবে।

পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় চাকরির বাজার সৌদি আরব। নানা কারণে টানা সাত বছর কর্মী নিয়োগ বন্ধ রাখার পর ২০১৫ সালে বাংলাদেশের জন্য বাজার খুলে দেয় দেশটির সরকার। ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত দেশটিতে সাড়ে ১২ লাখ বাংলাদেশি কাজের সুযোগ পায়। তবে অভ্যন্তরীণ বেকারত্ব কমাতে ১২ ধরনের কাজে কোনো বিদেশি কর্মী নেবে না সৌদি সরকার। ফলে এসব কাজে যুক্ত পুরনো প্রবাসীরাও দেশে ফিরে আসছেন।

বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় বৃহত্তম চাকরির বাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, ২০০৭ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে ১৬ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক আরব আমিরাতে চাকরি নিয়ে গেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হওয়ায় আমিরাত সরকার বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয়; যা সরকার নানা দেনদরবার করেও চালু করতে পারেনি। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে আরব আমিরাতের বাজার খুলে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

তৃতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার মালয়েশিয়াও জনশক্তি এখন বন্ধ। ২০১৯ সাল পুরোটাই গেছে দেশটির সাথে আলোচনায়। এখনো দেশটির শ্রমবাজার চালু নিয়ে কোনো খবর আসেনি। ২০১৮ সালে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৯২৭ জন কর্মী যায় দেশটিতে। অথচ ২০১৯ সালের ১১ মাসে (নভেম্বর পর্যন্ত) মাত্র ৪৮৮ জন গেছেন দেশটিতে।

কর্মী নিয়োগ কমেছে লেবানন, জর্ডান, ওমান, কাতার এবং সিঙ্গাপুরেও। বিএমইটির তথ‌্য অনুযায়ী  লেবানন ২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে ১৬ হাজার বাংলাদেশি নিয়োগ দিয়েছে। অথচ ২০১৯ সালের ১১ মাসে দেশটি নিয়েছেন মাত্র ৪ হাজার ৫৮১ জন।

এই অবস্থায় পুরো মধ‌্যপ্রাচ‌্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন‌্য একটি বিরাট ধাক্কা হতে পারে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পেছনে যে কয়েকটি খাতের বিশেষ অবদান রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম অভিবাসন খাত। বলা যায়, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তৈরি পোশাক শিল্পের পরেই জনশক্তি রপ্তানি খাতের অবস্থান।

এ পরিস্থিতিতে অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মধ‌্যপ্রাচ‌্যে শ্রমবাজার সংকুচিত হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাবে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে ও চাকরির বাজারে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দা রোজানা রশীদ বলেন, সরকারবিরোধী আন্দোলন-বিক্ষোভে এতদিন উত্তাল ছিল মধ্যপ্রাচ্য। জেনারেল কাসেম সোলেমানি নিহত হওয়ার ঘটনায় উত্তেজনা সৃষ্টির আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি যাই হোক, এর প্রভাব শ্রমবাজারে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতির সৃষ্টিতে আমাদের কোনো প্রভাব নেই। কিন্তু আমাদের ওপর এর প্রভাব পড়বে অনেক। এই অবস্থায় আমাদের পরিস্থিতি নিবিড় পর্যালোচনা করতে হবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ব‌্যবস্থা নিতে হবে।

তিনি বলেন, তবে মনে রাখতে হবে এই খাতটি আমাদের অর্থনীতির জন‌্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ওই রিজনটাও আমাদের জন‌্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে, মধ‌্যপ্রাচ‌্যের বর্তমান অস্থিরতায় আশঙ্কা করা হচ্ছে তেলের দাম বৃদ্ধিরও। যার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশসহ পুরো উপমহাদেশে। এছাড়া আজ রোববার থেকে বাংলাদেশে থেকে বর্ধিত মূল্যে ৬০ হাজার টাকা ভরি দরে স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির সাথে মধ্যপ্রাচ্যে সম্প্রতি সৃষ্ট অশান্ত পরিস্থিতির সংযোগ রয়েছে।


ঢাকা/হাসান/সাইফ

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়