ঢাকা, শুক্রবার, ১০ মাঘ ১৪২৬, ২৪ জানুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘আমি আমার জনগণের কাছে ফিরে যেতে চাই’

কেএমএ হাসনাত : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-১০ ৮:৪৬:৩৯ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-১১ ৫:১৪:৫৮ পিএম

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। পাকহানাদার বাহিনী অতর্কিতে বাঙালীদের উপর বর্বোরচিতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হয়তো আগে থেকেই তৈরি ছিলেন।

একদিকে রাজধানি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একযোগে আক্রমণ। অন্যদিকে রাতের আঁধারে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাসা থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। যুদ্ধের নয় মাস তার উপর নানাভাবে মানসিক নিপীড়ন চালানো হয়।

বঙ্গবন্ধুকে যেখানে রাখা হয়েছিল সেই সেলের পাশেই ফাঁসির মঞ্চ তৈরি ছিল। পাকিস্তানের অখণ্ডতা টিকিয়ে রাখার বিনিময়ে তাকে মুক্তি দেয়া এবং দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনে অধিষ্ঠিত করা হবে বলে প্রলোভন দেখানোর পাশপাশি ফাঁসির মঞ্চ তৈরির কথাও বলা হতো তাকে। কিন্তু কোনো কিছুতেই তাকে রাজি করানো যায়নি। বঙ্গবন্ধু ফাঁসির দড়িতে ঝুলতেও তৈরি ছিলেন। কিন্তু বাঙালী জাতির কপালে কলঙ্ক লেপন হোক এমন কিছু তিনি চাননি।

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর কাছে পরাজয় স্বীকার করে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ নামে এক নতুন সূর্য বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে নেয়। জয়ের আনন্দের পাশাপাশি পাকিস্তানী কারাগারে বন্দী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতি বিজয়টাকে অনেকটা ম্লান করে দেয়।

ইন্দিরা গান্ধী বিশ্ব বিবেকের কাছে তাকে দ্রুত মুক্তি দিয়ে বাংলাদেশে সসন্মানে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানান। ব্যক্তিগতভাবে বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পাকিস্তানী বাহিনী বাংলাদেশে যে ধ্বংস যজ্ঞ চালিয়েছে তা তুলে ধরেন।

১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে অতিগোপনীয়তার মধ্যে মাঝরাতে বিশেষ বিমানে করে লন্ডনে পাঠানো হয় বঙ্গবন্ধুকে। কারামুক্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব লন্ডন হয়ে ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তন করেন বীরবেশে। বাংলাদেশে আসার আগে বঙ্গবন্ধু লন্ডনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন।

সেদিন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সবগুলো সংবাদ মাধ্যমে ব্যানার হেডে স্বাধীন স্বদেশে ফিরে আসার সংবাদ ছাপা হয়। সবগুলো শিরোনাম প্রায় অভিন্ন ছিল। ‘পাকিস্তানের জিন্দানখানা হতে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি।’

লন্ডনে সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেন, ‘এই মুহূর্তে আপনার কি করতে ইচ্ছে করতে ইচ্ছে করছে?’ জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি এই মুহূর্তে আমার জনগণের কাছে ফিরে যেতে চাই।’

ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দুটি বৈঠক করার পর তার প্রতিশ্রুতি রাখেন এবং ৮ জানুয়ারি আগে থেকে পাকিস্তানে অবস্থানরত ড. কামাল হোসেনসহ বঙ্গবন্ধুকে পিআই-এর একটি বিশেষ বিমানে তুলে দেন। বিমানটি সর্বোচ্চ গোপনীয়তার মধ্যে রাত তিনটায় লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। গোপনে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিয়ে ইসলামাবাদ ত্যাগের এই খবর সাংবাদিকরা জানতে পারেন ১০ ঘণ্টা পর।

 

 

লন্ডনে পৌঁছে ক্ল্যারিজ হোটেলে বঙ্গবন্ধু অবস্থান গ্রহণ করেন এবং জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে একটি বিবৃতি দেন। প্রগাঢ় দেশপ্রেম ও জনসাধারণের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা ব্যক্ত হয় তার সেই বক্তব্যে।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, “বাংলার মুক্তি সংগ্রামে আজ আমি স্বাধীনতার অপরিসীম ও অনাবিল আনন্দ অনুভব করছি। এই মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। আমার জনগণ যখন আমাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেছে, তখন আমি রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে একটি নির্জন ও পরিত্যক্ত সেলে বন্দী জীবন কাটাচ্ছি।

‘বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে সমর্থন ও সহযোগিতা দানের জন্যে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড, ফ্রান্স ও ব্রিটেনকে আমি ধন্যবাদ জানাই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম সমর্থনদানকারী মার্কিন জনগণ ও অন্যান্য জনসাধারণকেও আমি ধন্যবাদ জানাই। স্বাধীনতা, সার্বভৌম বাংলাদেশ এখন একটি বাস্তব সত্য। এ দেশকে বিশ্বের স্বীকৃতি দিতে হবে। বাংলাদেশ অবিলম্বে জাতিসংঘের সদস্য পদের জন্যে অনুরোধ জানাবে।”

বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু বলেন, “পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ আমার বিরুদ্ধে বিচারের নামে এক প্রহসন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। শুনানি অর্ধেক সমাপ্ত হবার পর পাক কর্তৃপক্ষ আমার পক্ষ সমর্থনের জন্যে একজন আইনজীবী নিয়োগ করে। আমি কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে বিশ্বাসঘাতকের কলঙ্ক নিয়ে মৃত্যুদণ্ডের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর, আমার বিচারের জন্যে যে ট্রাইবব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল তার রায় কখনো প্রকাশ করা হবে না।

‘সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বিচারের নামে প্রহসন অনুষ্ঠান করে আমাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানোর ফন্দি এঁটেছিলেন। কিন্তু ভুট্টো এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে অস্বীকার করেন।

‘জনাব ভুট্টো আমাকে না বলা পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিজয় সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। জেলখানা এলাকায় বিমান আক্রমণের জন্যে নিষ্প্রদীপ জারি করার পর আমি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কথা জানতে পারি। জেলখানায় আমাকে এক নিঃসঙ্গ ও নিকৃষ্টতম কামরায় বন্দী করে রাখা হয়েছিল। যেখানে আমাকে তারা কোনো রেডিও, কোনো চিঠিপত্র দেয় নাই। এমনকি বিশ্বের কোথায় কী ঘটছে, তা জানতে দেওয়া হয় নাই।

‘স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের জনগণের মতো এতো উচ্চমূল্য, এতো ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় জীবন ও দুর্ভোগ আর কোনো দেশের মানুষকে ভোগ করতে হয় নাই। বাংলাদেশে নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্যে পাকিস্তানী সৈন্যরা দায়ী।

‘হিটলার যদি আজ বেঁচে থাকতো, বাংলাদেশের হত্যাকাণ্ডে সেও লজ্জা পেতো। প্রেসিডেন্ট ভুট্টো আমাকে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে যে কোনো একটি সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারটি বিবেচনা করতে অনুরোধ জানিয়েছেন। আমি তাকে বলেছি, আমার দেশবাসীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে আমি কোনো কিছু বলতে পারব না। আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে রাজি নই। আমি আমার জনগণের কাছে ফিরে যেতে চাই।”

সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা ও পূর্বদেশ; ৯ জানুয়ারি, ১৯৭২।

 

ঢাকা/হাসনাত/সনি