ঢাকা, শনিবার, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৬ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

পুলিশকর্তাসহ ক্যাসিনো জালে ২০০ ব‌্যক্তি

এম এ রহমান মাসুম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-২৩ ৯:৩৮:৩৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-২৪ ৯:০০:৫১ এএম
ফাইল ফটো

ক্যাসিনোসহ বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত এমন রাজনীতিবিদ, আমলা কিংবা ব্যবসায়ীদের তালিকা ক্রমশই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।

প্রতিদিনই পুরাতন তালিকার সঙ্গে যোগ হচ্ছে নতুন নাম। সর্বশেষ ডিএমপি’র গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার এস এম শিবলী নোমানসহ মোট ১৬ জনের একটি তালিকা নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এ নিয়ে শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে দুদকের তালিকা দু‌ইশত ছাড়িয়ে গেল- যাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ আনা হয়েছে। নতুন তালিকায় পুলিশের ওই কর্মকর্তা ছাড়াও গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলম, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম, মো. শামীম আখতার, মো. শামছুদ্দোহা ও মো. নজিবুর রহমানসহ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্তা ব্যক্তিরা আছেন বলে দুদকের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এ বিষয়ে দুদকের কমিশনার (অনুসন্ধান) মো. মোজাম্মেল হক খান রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘ক্যাসিনো সংক্রান্ত অপকর্পে যারা জড়িত এবং যাদের অবৈধ সম্পদ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দুদক প্রায় দুইমাস আগে অনুসন্ধান শুরু করেছে। তখন আমি বলেছিলাম এ সংখ্যা প্রায় দুই শতাধিক হতে পারে। এই পর্যায়ে বলা যায় প্রায় দুইশত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আমাদের অনুসন্ধান চলছে।’

সর্বশেষ সংযোজিত ব্যক্তিদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা নির্দিষ্ট করে ছোট-বড় ক্যাটাগরি হিসেবে আলাদা তালিকা করি না। তবে আপনি যদি সুনির্দিষ্ট তথ্য জানতে চান, তাহলে বলতে পারি সম্প্রতি এই তালিকায় পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার, গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর মতো ব‌্যক্তিরা অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। কাজেই কেবল ছোট ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করি এ বক্তব্য সঠিক নয়। কর্মকর্তা হিসেবে এ সকল কর্মকর্তা যথেষ্ট প্রভাবশালী বলতে পারেন।’

সম্প্রতি কিছু অভিযোগের প্রেক্ষিতে নতুন করে ১৬ ব্যক্তির বিরুদ্ধ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। যার অনুসন্ধানভার দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত আট সদস্যের টিমকে দেওয়া হয়েছে। আদেশের ওই কপি রাইজিংবিডির কাছে রয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, “ডিএমপি’র গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার এস এম শিবলী নোমানসহ মোট ১৬ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম- দুর্নীতি, ক্যাসিনো ব্যবসাসহ শত শত কোটি টাকা পাচার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে প্রতিবেদন দাখিল ও তাদের বিদেশগমন রহিত করনের জন্য অনুরোধ করা গেল।”

দুর্নীতি বিরোধী শুদ্ধি অভিযানের প্রথম পর্যায়ে ৪৩ জনের অবৈধ সম্পদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এরপরই নতুন নতুন অভিযোগসহ অভিযুক্তদের নাম যোগ হচ্ছে। এরই মধ্যে সংস্থাটি ২৩ জনের বিরুদ্ধে ২০টি মামলা দায়ের করেছে। যাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অভিযোগ আনা হয়েছে। কারো কারো বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে মামলার এজাহারে।

যাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে তারা হলেন- ঠিকাদার জি কে শামীম ও তার মা আয়েশা আক্তার, বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও তার ভাই রুপন ভূইয়া, অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিম প্রধান, বিসিবি পরিচালক লোকমান হোসেন ভূইয়া, কলাবাগান ক্লাবে সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ।

কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান, তারেকুজ্জামান রাজীব, ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, এনামুল হক আরমান, যুবলীগ নেতা জাকির হোসেন ও তার স্ত্রী আয়েশা আক্তার সুমা, কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ, যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক আনিসুর রহমান ও তার স্ত্রী সুমি রহমান, ব্যবসায়ী মো. সাহেদুল হক, এনআর গ্লোবালের সাবেক এমডি প্রশান্ত কুমার হালদার, গণপূর্তের সিনিয়র সহকারী প্রধান মো. মুমিতুর রহমান ও তার স্ত্রী মোছা. জেসমীন পারভীন।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শুদ্ধি অভিযানে ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ক্যাসিনোর মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনকারীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ক্যাসিনো ব্যবসার সাথে জড়িতরা অবৈধ অর্থ লুকিয়ে রাখতে নামে-বেনামে ব্যাংক হিসাব খোলেন। বাড়ির কেয়ারটেকার, নিরাপত্তারক্ষী থেকে শুরু করে দূর সম্পর্কের একাধিক আত্মীয়ের নামেও একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সন্ধান মিলছে। যত দিন যাচ্ছে, সম্পদের তথ্য-প্রমাণ আসছে বিভিন্ন সংস্থার হাতে।

তালিকায় সংসদ সদস্যসহ প্রায় সকল পর্যায়ের ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে সাংসদ সামশুল হক চৌধুরী, সুনামগঞ্জ–১ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, ঢাকার বর্তমান তিন কাউন্সিলার, শীর্ষ সন্ত্রাসী নাদিম ও জার্মানীতে থাকা জিসান।

ঢাকা (উত্তর) ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এস এম রবিউল ইসলাম সোহেল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হল ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, নয়াটোলার সেন্টু, বাড্ডার নাসির, বনানী গোল্ড ক্লাবের ব্যবসায়ী আবদুল আওয়াল প্রমুখ।

কমিশনের পরিচালক সৈয়দ ইকবালের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি টিম অনুসন্ধানের দায়িত্ব পালন করছেন। অপর সদস্যরা হলেন- উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. সালাহউদ্দিন, গুলশান আনোয়ার প্রধান, সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী, সাইফুল ইসলাম, আতাউর রহমান ও মোহাম্মদ নেয়ামুল আহসান গাজী।


ঢাকা/এম এ রহমান/সনি