ঢাকা, রবিবার, ৯ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

দুবেলা ভাতের জন্য এমন নির্যাতন!

এস বাসু দাশ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-২৬ ১২:৩৭:২৬ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-০৭ ৯:১৮:১৮ এএম

সংসারে নিদারুণ অভাব। আয় রোজগার নিতান্তই কম। যা হয়, তা দিয়ে সবার ঠিক মতো খাওয়া-পরাই চলে না। দুয়েকটি শখ পূরণ তো অনেক দূরের কথা। অসুখ-বিসুখে ঠিক মতো চিকিৎসাও হয় না। এভাবেই দিন যায় বান্দরবানের থানচির বলিবাজার ইউনিয়নের ১ নম্বর পোস্ট এলাকার ফারুক আহমেদের। 

বান্দরবানের নিউ গুলশান এলাকায় বাস সোলাইমানের। বাড়িতে একজন গৃহকর্মী দরকার। এক পরিচিতের মাধ্যমে সে খবর পান ফারুক।  

সেই পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে ফারুক আরো জানতে পারেন- সোলাইমানের বাড়িতে কাজ তেমন নেই। সোলাইমানের স্ত্রী উর্মির টুকটাক কাজ এগিয়ে দেয়া ছাড়া আর তেমন ভারি কোনো কাজ নেই। ভালো খাওয়া দাওয়া পাবে, পড়াশোনা করাবে। এমনকি বয়স হলে ভালো পাত্র দেখে বিয়েও দিয়ে দেবে।

অভাবের সংসারে এতসব মধুমাখা কথা শুনে ভালোলাগে ফারুকের। চোখের সামনে নিজের ১১ বছরের মেয়ে নাহিদার কচি মুখটি ভেসে ওঠে। বাড়ন্ত বয়স, বাড়তি খাবার দরকার ওর এখন। অভাবের সংসারে ঠিক মতো খাওয়াই হয় না, বাড়তি খাবার কোথায় পাবে?

সিদ্ধান্ত পাকা করে ফেলেন ফারুক। মেয়েকে সোলাইমানের বাড়িতে পাঠাবেন। নিজেদের যেভাবে হোক চলে যাবে। মেয়েটা যদি সেখানে গিয়ে ভালো খাবার পায়, পড়ালেখা শিখতে পারে তাহলে আর ভাবনা থাকবে না। বয়স বাড়লে ভালো পাত্রস্থও যদি হয়ে যায় তাহলে তো সোনায় সোহাগা!

সেই পরিচিতের মাধ্যমে মেয়েকে সোলাইমানের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মেয়েটির মন সেদিন কেমন করে উঠেছিল সে কথা কেউ জানে না। বাবার মতো হয়তো তার চোখেও স্বপ্ন ঝিলমিল করে উঠেছিল। হয়তো আবেগের বাস্পে চোখে চিকচিক করে উঠেছিল। মায়ের চোখও অশ্রু সজল হয়ে গিয়েছিল। মেয়েকে সাজিয়ে দিতে দিতে নানা উপদেশও হয়তো দিয়েছিলেন। মায়ের কথায় ডানে বা বামে মাথা নেড়ে হয়তো সায়ও দিয়েছিল নাহিদা।   

মেয়ে চলে গেল সোলাইমানের বাড়িতে। হয়ে গেল গৃহকর্মী। এদিকে বাবা-মায়ের কাছে পড়ে রইলো তার সদা চঞ্চল হরিণী মনটি। মেয়ের মুখটি মনের পর্দায় ভেসে উঠলে চোখ ভিজে আসতে চায়। তাই মন শক্ত করেন ফারুক। কিন্তু মায়ের মন অতশত বোঝে না। মেয়ের খোঁজ খবর পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ওদিক থেকে সবসময় ভালো কথাই শোনা যায়। তাই শান্ত থাকে মায়ের মন।

সময় কেটে যায়। পার হয়ে যায় একে একে পাঁচটি মাস। তারপর নাহিদার উপরে অমানবিক নির্যাতনের খবর জানতে পারেন বাবা-মা। আদরের মেয়েটির উপরে অমানবিকভাবে নির্যাতন চালিয়েছেন উর্মি। এ খবরে কেমন করে উঠেছিল নাহিদার মায়ের মন? বাবা ফারুকেরই বা কেমন লেগেছিল? 

ফারুক বলেন, ‘সোলাইমানের বাসায় কাজ করার জন্য মেয়েকে দিয়েছিলাম। কথা ছিল, মেয়েকে ভালো-মন্দ খাওয়াবে, পড়াবে এবং বিয়ের উপযুক্ত হলে বিয়ে দেবে। ভেবেছিলাম কাজের বিনিময়ে মেয়েটা অন্তত দুবেলা ভালো খেতে পারবে। তারা মেয়েটিকে এভাবে অত্যাচার-নির্যাতন করবে ভাবতেও পরিনি।’

মেয়েকে কাজে পাঠানোর আগে ফারুকের সরল মনে মানুষের বর্বর-পশু স্বত্ত্বার কথা উঁকি দেয়নি। স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনায় জর্জরিত ফারুক তাই নির্যাতিত মেয়েটির জন্য কেবল আক্ষেপই করছিলেন। গৃহকর্ত্রী উর্মির বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করার কথাও বলেন তিনি। 

নাহিদাকে শুরু থেকেই নির্যাতন করে আসছিলেন সোলাইমানের স্ত্রী উর্মি। নির্যাতনের ভয়ে সারাক্ষণ তটস্থ হয়ে থাকত নাহিদা। সুযোগ বুঝে তাই পালাতে গিয়েছিল সেদিন। কিন্তু চোর বলে পিছনে তেড়ে আসে লোকজন। ভয়ে হতচকিত ভীত হরিণীর মতো ছুটতে থাকে নাহিদা। জীবন বাঁচানোর তাগিদে এক সময় একটি বাড়িতে ঢুকে পড়ে সে। সেখানে আশাতীতভাবে মিলে যায় নাহিদার মুক্তির দরজা। না জেনেই নাহিদা ঢুকে পড়েছিল লক্ষী দাশের বাড়িতে। যিনি বান্দরবান নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কার্যালয়ের কর্মকর্তা।

লক্ষী দাশ বলেন, ‘‘গত শুক্রবার (২৪ জানুয়ারি) নাহিদা আক্তারকে কিছু লোক চোর চোর বলে তাড়া করছিল। তাড়া খেয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মেয়েটি আমার বাড়িতে ঢুকে পড়ে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করি। সেসময় তার উপর ঘটে যাওয়া অমানবিক নির্যাতনের ঘটনা বর্ণনা করে মেয়েটি। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় নির্যাতনের ক্ষত চিহ্ন দেখায়।

‘শহরের নিউ গুলশান এলাকার সোলাইমানের বাসায় কাজ করতো নাহিদা। সেখানে সোলাইমানের স্ত্রী উর্মি প্রতিনিয়ত তার উপর নির্যাতন চালাতেন।” 

শনিবার (২৫ জানুয়ারি) সকালে নাহিদা আক্তারকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানেই চিকিৎসা চলছে তার।

নাহিদা আক্তার বলে, ‘কথায় কথায় আমাকে ঝাড়ু দিয়ে খুব মারধর করতেন উর্মি। কয়েকদিন আগে গলা চেপে ধরেছিলেন। শ্বাস বন্ধ হয়ে মরে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তাই পালিয়ে যাচ্ছিলাম।’

এদিকে বিষয়টি জানাজানি হলে আপোসের চেষ্টা চালাচ্ছেন গৃহকর্তা সোলাইমান। তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি দুঃখজনক। মেয়েটির পরিবারের সাথে বসে সামাজিকভাবে বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা করছি।’

বান্দরবান সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শহীদুল ইসলাম চৌধুরী জানান, অভিযুক্ত গৃহকর্ত্রী উর্মিকে থানায় ডাকা হয়েছে। সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

বিষয়টি হয়তো আপোস-মীমাংসা হয়ে যাবে। কয়েকদিন পর হয়তো সবাই ভুলেও যাবে। কিছু টাকার বিনিময়ে নাহিদার বাবা-মাও ভুলে যাবেন উর্মি’র অত্যাচারের কথা। তবে নাহিদা কি ভুলতে পারবে তার উপরে নেমে আসা নির্যাতনের ভয়াবহতা? কখনো ক্ষমা করতে পারবে সে সমাজপতিদের?


বাসু দাশ/সনি/নাসিম