ঢাকা, শনিবার, ২৭ চৈত্র ১৪২৬, ১১ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

১৬ বছরেও বিচার শেষ না হওয়ায় ক্ষুদ্ধ হুমায়ুন আজাদের ভাই

মামুন খান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-২৭ ৯:৩৯:৫২ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-২৭ ১১:৩৮:৩০ এএম

প্রথাবিরোধী লেখক, গবেষক, দার্শনিক ছিলেন ড. হুমায়ুন আজাদ। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বই মেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের হামলায় মারাত্মক আহত হন তিনি।

২২ দিন ঢাকা সিএমএইচ হাসপাতালে এবং ৪৮ দিন ব্যাংককে চিকিৎসাধীন ছিলেন হুমায়ুন আজাদ। এরপর ২০০৪ সালের ১২ আগস্ট (জার্মান সময়) জার্মানির মিউনিখে মারা যান তিনি।

হামলার পরদিন তার ভাই মঞ্জুর কবির বাদী হয়ে রমনা থানায় একটি হত্যা চেষ্টা মামলা করেন। পরবর্তীতে হুমায়ুন আজাদ মারা যাওয়ায় তা হত্যা মামলায় রূপান্তর হয়।

১৬ বছর ধরে ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক সাজার অপেক্ষায় হুমায়ুন আজাদের স্বজনরা। দীর্ঘ সময়ে মামলাটির বিচার শেষ না হওয়ায় ক্ষুদ্ধ হুমায়ুন আজাদের ভাই মঞ্জুর কবির। চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় দিন গুনছেন স্বজনেরা। তবে এ বছরই মামলার বিচার শেষ হবে আশা করছে রাষ্ট্রপক্ষ।

ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মাকছুদা পারভীনের আদালতে মামলা দুটি বিচারাধীন। সর্বশেষ গত ১৩ ফেব্রুয়ারি মামলা দুটির তারিখ ধার্য ছিল।

হত্যা মামলাটি আসামি মিজানুর রহমানের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্যের জন্য আর বিস্ফোরক আইনের মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ধার্য ছিল। ওই মিজানুর রহমানের পক্ষে সাক্ষ্য পেছানোর আবেদন করেন তার আইনজীবী। আর বিস্ফোরক আইনের মামলায় সাক্ষী হাজির হননি।

এজন্য আগামী ৮ এপ্রিল হত্যা মামলাটি সাফাই সাক্ষ্যের জন্য এবং বিস্ফোরক আইনের মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ধার্য করেছেন আদালত। ওই দিন মিজানুরের পক্ষে তার আইনজীবী চার্জ পরিবর্তনের আবেদন করেন। আদালত আবেদনটি নথিভুক্ত করেন এবং রায়ের পর্যায়ে বিবেচনার কথা জানান।

মামলা সম্পর্কে হুমায়ুন আজাদের ছোট ভাই মো. মঞ্জুর কবির বলেন, দেখতে দেখতে ঘটনার ১৬ বছর পার হয়ে গেল। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিচার পাইনি। বিচারের জন্য আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে? মামলার বাদী আমি, সাক্ষী হলো। এরপর আর কোন কিছু হলো না। প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় হলে বিচার পেতাম।

তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারি মাস আসলে অসুস্থ হয়ে পড়ি। বাংলা একাডেমিতে গেলে ভাইয়ের কথা মনে পড়ে, সেখানেও যাই না। কঠিনভাবে তার অভাব অনুভব করি। তার অভাব তো পূরণ হবে না। ভাইকে হারিয়েছি, তাকে তো আর ফিরে পাবো না। তবুও ভাই হত্যার বিচার চাই।

মঞ্জুর কবির আরো বলেন, হামলার পর আমার ভাই তো মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিল। তখন জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে হামলার জন্য দায়ী করেছিলেন তিনি । কিন্তু তাকে তো মামলায় সম্পৃক্ত করা হয়নি, আটক করা হয়নি। আর এতদিন হয়ে গেল মামলাটির বিচারও শেষ হলো না। কী আশা করতে পারি আমরা?

ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর মো. আব্দুল্লাহ আবু বলেন, দুটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে। রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে সক্ষম হয়েছে। আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা হবে বলে আশা করছি।

সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর সাইফুল ইসলাম হেলাল বলেন, আসামিপক্ষের আইনজীবীদের গাফিলতির কারণে মামলাটির বিচার শেষ হয়নি। তারা মামলাটি বিলম্ব করছেন। তবে আমরা আশা করছি হত্যা মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ হবে। আর আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা আশা করছি।

আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক  আহাম্মদ বলেন, ন্যায় বিচার পাওয়া সকলের অধিকার। মামলাগুলোতে দীর্ঘদিনেও বিচার শেষ হয়নি। হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেননি। আসামিরা খালাস পাবেন বলে আশা করছেন তিনি।

হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলায় ঘটনায় তার ভাইয়ের দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করে ২০০৭ সালের ১৪ নভেম্বর সিআইডির পুলিশ কাজী আবদুল মালেক পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি চার্জশিট দাখিল করেন।

২০১২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর হত্যা মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন আদালত। এ মামলায় মোট ৪১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানি শেষে মামলাটি বর্তমানে সাফাই সাক্ষ্যের জন্য ধার্য আছে।

অন্যদিকে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জগঠন করেন আদালত। মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। এ মামলায় ৪৯ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ১০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ১৯ নভেম্বর মামলাটিতে সাক্ষ্য গ্রহণ হয়। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ আর কোনো সাক্ষীকে আদালতে হাজির করতে পারেননি। আদালত সাক্ষীদের প্রতি অজামিনযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।

হত্যা মামলাটিতে ২০১৭ সালে তদন্ত কর্মকর্তাসহ ৪১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। পরে একজন জার্মান চিকিৎসক সাক্ষীকে আনা নিয়ে মামলার কার্যক্রম বিলম্বিত হয়। পরে তার সাক্ষ্য ছাড়াই ২০১৮ সালের ২ অক্টোবর সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম শেষ করেন ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মাকসুদা পারভীন।

মামলাটিতে ২০০৭ সালের ১৪ নভেম্বর হত্যা চেষ্টার অভিযোগে জেএমবি নেতা শায়খ আব্দুর রহমান, আতাউর রহমান সানি, নূর মোহাম্মদ সাবু ওরফে শামীম, মিনহাজ ওরফে শফিক, আনোয়ার ওরফে ভাগ্নে শহিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি।

২০০৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সিএমএম আদালত শায়খ আব্দুর রহমান ও আতাউর রহমান সানির ঝালকাঠির বিচারক হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় তাদের অব্যাহতি দিয়ে অপর আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জগঠন করেন। এরপর মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে বাদী মামলাটির বর্ধিত তদন্তের আবেদন করেন।

২০১২ সালের ৩০ এপ্রিল সিআইডি পরিদর্শক লুৎফর রহমান পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে হত্যা চেষ্টার পরিবর্তে হত্যার অভিযোগে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।

এরা হলেন- জেএমবির সূরা সদস্য আনোয়ারুল আলম ওরফে ভাগ্নে শহিদ, সালাহউদ্দিন ওরফে সালেহীন, মিজানুর রহমান ওরফে মিনহাজ ওরফে শাওন, রাকিবুল হাসান ওরফে হাফিজ মাহামুদ ও নুর মোহাম্মদ ওরফে সাবু।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রিজনভ্যান থেকে তিন আসামিকে ছিনিয়ে নেয় জঙ্গীরা। ওই তিন জনের মধ্যে সালাহউদ্দিন ওরফে সালেহীন এবং রাকিবুল হাসান ওরফে হাফিজ মাহামুদ এ মামলার আসামি। এদের মধ্যে রাকিব ওইদিন রাতে ধরা পরে এবং পরে ক্রস ফায়ারে নিহত হয়। মিজানুর রহমান এবং আনোয়ারুল আলম কারাগারে আছেন। নুর মোহাম্মদ এবং সালেহীন পলাতক রয়েছে।

 

ঢাকা/মামুন খান/জেনিস