Breaking News
করোনাভাইরাসে দেশে আরও ৬ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ৯৪
X
ঢাকা, শুক্রবার, ২৭ চৈত্র ১৪২৬, ১০ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

করোনা মোকাবিলা: গার্মেন্টস বন্ধ হবে?

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-২০ ৪:২৩:৩২ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-২১ ৭:২৫:৫২ পিএম
ফাইল ফটো

করোনার কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের তৈরি পোশাক খাত বন্ধ হবে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা  পরস্পর বিরোধী মত দিচ্ছেন। কিছু শ্রমিক সংগঠন বলছে, আপাতত কিছুদিনের জন্য সব পোশাক কারখানা বন্ধ করা উচিত। কিছু সংগঠন বলছে, উৎপাদন অব্যাহত রাখতে কারখানা চালু রাখা দরকার।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পোশাক কারখানা বন্ধ করার মতো পরিস্থিতি এখনো সৃষ্টি হয়নি। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। প্রয়োজনে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

অন্যদিকে, খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা যে হারে বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তাতে কাঁচামাল আমদানি বন্ধ হয়ে আগামী এক মাসের ভেতর অনেক পোশাক কারকানা এমনিতেই বন্ধের উপক্রম হবে।

‘গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম’-এর সভাপতি ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘দেশে করোনা অনেকটা মহামারি আকার ধারণ করেছে। এই পরিস্থিতিতে আমি মনে করি, আপৎকালীন সময়ের জন্য হলেও অর্থাৎ অন্ততপক্ষে ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের সব গার্মেন্টস বন্ধ রাখা উচিত। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।’

মোশরেফা মিশু বলেন, ‘দেশের ৯০ শতাংশ পোশাককর্মীর জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম তাদের এই চাকরি। সেক্ষেত্রে পোশাক কারখানা বন্ধ হলে তাদের যেন সবেতনে ছুটি দেওয়া হয়। পাশাপাশি করোনা মোকাবিলার জন্য যেসব উপকরণ জরুরি, সেগুলোও যেন সরবরাহ করা হয়।’

এই শ্রমিক নেতা আরও বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি নিয়ে আমরা আজ ১২টি শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেছি। সবার মত ছিল, আপাতত পোশাক কারখানা বন্ধের পক্ষে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আগামী দুয়েকদিনের মধ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে স্মারকলিপি জমা দেব।’

মোশরেফা মিশু বলেন, ‘যদি পোশাক কারখানা বন্ধ না দেওয়া হয়, তবে পোশাক কারখানা ভেতরের এবং বাইরের পরিবেশে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সব কর্মীর স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা যেতে পারে।  পোশাক কারখানার প্রবেশের সময় একজন কর্মীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, তিনি বাসায় ফিরেও  যেন  পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে পারেন, সে বিষয়েও মালিকপক্ষ কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করতে হবে।’

এরই মধ্যে রাজধানীতে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাসা থেকে অফিস করার বিধান চালু করেছে উল্লেখ করে মোশরেফা মিশু বলেন, ‘পোশাক খাতে বিষয়টি কার্যকর করার খুব বেশি উপায় নেই। কারণ, এই খাতের  উৎপাদনমুখী কর্মীরাই হচ্ছেন ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাসায় থেকে অফিস করলেও মূল কাজ যাদের করতে হয়, তাদের তো কারখানায় যেতেই হচ্ছে। তাই আপাতত মার্চ মাস পোশাক কারখানা বন্ধ রাখা উচিত। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ বসে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।’

গ্রিন বাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি সুলতানা বেগম রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কারখানায় কোনো  করোনা আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাইনি। তার মানে এই নয় যেপোশাককর্মীদের মধ্যে এর প্রভাব পড়বে না। আমাদের সবাইকে এজন্য আগে থেকেই সতর্ক থাকতে হবে।’

সুলতানা বেগম বলেন, ‘বর্তমানে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি জরুরি তা হলো,  বিপুলসংখ্যক কর্মী এই খাতে কাজ করেন।  তাই এই খাতে  সুন্দর,  নিরাপদ ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’

সুলতানা বেগম আরো বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি সংগঠনের সাথে কথা বলেছি, ইউরোপ-আমেরিকাসহ বেশ কয়েকটি দেশের বায়ারদের সাথে ইমেইলে-অনলাইনে যোগাযোগ করেছি। দেশের করোনা সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়ে আমরা তাদের জানিয়েছি। বায়াররা সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সাথে আলাপ করে যেকোনো সিদ্ধান্তের পক্ষে আছেন বলে মত দিয়েছেন।’

এই শ্রমিক নেতা আরও  বলেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত রাখতে বায়াররা এখন পর্যন্ত কারখানা চালু রাখার পক্ষে। তারা সরকার ও মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলে করোনা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন।’   

শ্রমিক নেতা বাহরাইন সুলতান বাহার রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘আমি কোনোভাবেই পোশাক কারখানা বন্ধের পক্ষে নই। দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি পোশাক খাত। পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক জনবল এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। তাই হুট করে কোনো  সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।’ পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণে সব পক্ষকে  জরুরি বৈঠকে বসা  প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

তৈরি পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি’ (বিজিএমইএ)-এর সচিব কমডোর মো. আব্দুর রাজ্জাক (অব.) রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ করছি। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছি। এই খাতে যেন কোনোরকম সমস্যা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখছি।’

সার্বিক বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব কে এম আলী আজম বলেন, ‘এই মুহূর্তে করোনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমরা প্রতিনিয়ত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছি। কর্মীদের কারখানায় প্রবেশের আগেই হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক ব্যবহারসহ বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মালিকপক্ষকে তাদের করণীয় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত পোশাক কারখানা বন্ধ রাখার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘আগামী সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে বসতে পারি। কিংবা পরিস্থিতি অনুযায়ী, জরুরি বৈঠকে বসেও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারি।’

প্রসঙ্গত, এরই মধ্যে সারাদেশে দেশে ২০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী চিহ্নিত হয়েছেন। মারা গেছেন একজন। করোনা প্রতিরোধে দেশের সব শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সব ধরনের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সমাবেশ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাদারীপুর জেলার শিবচর লকডাউন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণেও।

 

ঢাকা/হাসান/সনি