ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৬ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

সমন্বয়হীনতা বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে

কেএমএ হাসনাত : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-০৬ ৭:১৬:৪১ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-০৬ ৩:৫৫:২৮ পিএম

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সরকার ছুটি বাড়িয়েছে। তবে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের কেউ কেউ নির্দিষ্ট সময়ে কাজে যোগ না দিলে চাকরি চলে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে শ্রমিকদের কর্মস্থলে যোগ দিতে বাধ্য করেছেন।  যা করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।

অবশ্য বিজিএমইএর সভাপতি বিলম্বে হলেও ১১ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখতে মালিকদের অনুরোধ জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার একদিকে জনগণকে ঘরে থাকতে বলছে, অন্যদিকে পোশাক শ্রমিকদের কর্মস্থলে যোগদানে বাধ্য করছেন শিল্প মালিকরা।  যে কারণে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।  তারা এমন পরিস্থিতির জন্য সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করেছেন। 

গার্মেন্টস খোলা, বন্ধ, শ্রমিকদের হয়রানি—এসব বিষয় নিয়ে দেশের কয়েকজন অর্থনীতিবিদ ও বিশিষ্টজন রাইজিংবিডিকে জানান, পুরো বিষয়টি সমন্বয়হীনতার কারণে এমনটি ঘটেছে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এম শামসুল আলম রাইজিংবিডিকে বলেন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে না পারলে করোনাভাইরাস দ্রুত সমযের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।  সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে সরকার সাধারণ  ছুটি ঘোষণা করেছে।  কিন্তু দেখা গেলো, জনগণ ঢাকা ছাড়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়লো। এদিকে গণপরিবহন বন্ধ। এ অবস্থায় তৈরি পোশাক শিল্প মালিকরা শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই তাদের কাজে যোগদানের জন্য ডেকে আনলেন।  এটি একেবারেই ঠিক হয়নি।  বিষয়টি নিয়ে তারা সরকারের পরামর্শ নিতে পারতো।  কোথায় যেন সমন্বয়হীনতা রয়েছে বলে আমার মনে হয়।

তিনি বলেন, আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে।  সরকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে।  আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীকেও কাজে লাগিয়েছে। তারা সচেতনতা সৃষ্টির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।  তবে প্রত্যেকের পেছনে পুলিশ লাগিয়ে রাখা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়।  নিজেদের সচেতন হতে হবে।

অর্থনীতিবিদ খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, সরকার করোনাভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতার জন্য প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নিয়েছে।  সচেতনতা নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি করতে হবে।  কিছু মানুষের কারণে এর ব্যত্যয় হলে এটি ভালোভাবে দেখা উচিত।

তিনি বলেন, পোশাক শিল্প শ্রমিকরা যে আবার ঢাকা ঢুকছে সেটা খুব একটা ভালো কাজ হয়নি।  শ্রমিকদের এভাবে ডেকে সম্ভাব্য বিপদের মুখে ফেলা ঠিক হলো না।  যারা ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছেন তাদের ওপর তদারকি রাখতে হবে।  যাতে তাদের কেউ সংক্রামকের বাহক হয়ে ভাইরাস ছড়াতে না পারেন।

চাকরি চলে যাওয়ার হুমকি দিয়ে শ্রমিকদের কাজে যোগদানে বাধ্য করা প্রসঙ্গে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির ড. দেবপ্রিয় ভট্রাচার্য বলেন, এটা অমানবিক কাজ হয়েছে। দেশের সমস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন।  কারখানা বন্ধ করে শ্রমিকদের বাড়ি যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া হলো।  অবস্থার উন্নতি না হওয়া সত্ত্বেও তাদের যোগদানের কথা বলা হলো। এটা কীভাবে হয়?  কোথায় যেন সমন্বয়হীনতা।  শ্রমিকদের কাজে যোগদানের নির্দেশ দেওয়ার আগে তারা সরকারের সঙ্গে কথা বলে নিতে পারতো।  হয় তারা তা করেনি অথবা তারা সরকারের নির্দেশনা উপেক্ষা করেছে।  এমনিতেই বিপুলসংখ্যক মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তার ওপর পোশাক শ্রমিকদের গ্রাম ছেড়ে কর্মস্থলে যোগদান নতুন সমস্যার সৃষ্টি করবে।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সরকার একদিকে বলছে ঘরে থাকুন, অন্যদিকে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকরা তাদের শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য করছেন।  এমন দ্বৈত ব্যবস্থায় সংকট আরো ব্যাপক হতে পারে।  এটা সমন্বয়হীনতার অভাবে হয়েছে। 

তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি সরকারের একার পক্ষে মোকাবিলা সম্ভব নয়।  এ বিপর্যয় ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতে হবে। দুর্যোগ চলাকালে যারা কাজে যেতে পারছেন না অর্থাৎ নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা দেওয়া সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।

মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, বিশ্ব যখন করোনাভাইরাস নিয়ে সংকটকাল অতিক্রম করছে তখন পোশাক শিল্প মালিকরা নিজেদের ব্যবসার কথা ভাবছে।  যারা শ্রমিকদের চাকরি কেড়ে নেওয়ার হুমকি দিয়ে রাজধানী এবং আশপাশ এলাকায় ফিরিয়ে এনে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল তাদের বিচার হওয়া উচিত।  সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে।  সাধারণ মানুষ আগের চেয়ে যখন অনেক বেশি সচেতন হয়ে উঠছিল, তখন এমন কর্মকাণ্ড ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার গত ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করে।  এ সময় সবাইকে ঘরে অবস্থানের নির্দেশনা দেওয়া হয়।  ছুটি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ঢাকা ছেড়ে নিজ নিজ এলাকায় চলে যায়।  গত মাসের শেষের দিকে বলা হচ্ছিল এপ্রিলের ১৫ তারিখ পর্যন্ত সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।  এ সময়ের মধ্যেই করোনাভাইরাসের সামাজিক সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে।  ফলে হোম কোয়ারেন্টাইন কড়াকড়িভাবে মানতে হবে।  এ অবস্থার বিবেচনায় সরকার ছুটি ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দেয়।  ৪ এপ্রিল হঠাৎ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পোশাক শ্রমিকরা ঢাকায় রওনা দেন।  তারা গণমাধ্যমকে জানান, ৫ এপ্রিল থেকে কারখানায় কাজ শুরু হবে।  যারা এ সময়ের মধ্যে কাজে যোগ দেবেন না তারা চাকরি হারাবেন বলে মুঠোফোন বার্তায় মালিকদের পক্ষ থেকে তাদের জানানো হয়।  একদিকে চাকরি হারানোর হুমকি অন্যদিকে করোনাভাইরাসের কারণে গণপরিবহন বন্ধ।  বাধ্য হয়েই শ্রমিকরা দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে ঢাকা অভিমুখে রওনা হন।  

গণমাধ্যমেও খবর প্রকাশ হতে থাকে।  বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।  এ পরিস্থিতির জন্য পোশাক শিল্প মালিকদের নিয়ে নানা সমালোচনা হয়।  বলা হয়,  ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার পরিবর্তে ঋণ দেওয়ার ঘোষণায় পোশাক শিল্প মালিকরা বিক্ষুব্ধ হয়েছেন। এ কারণে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে তারা শ্রমিকদের চাকরি যাওয়ার হুমকি দিয়ে ঢাকায় ফিরিয়ে এনেছেন।  এ অবস্থায় ৪ এপ্রিল মধ্যরাতে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি রুবানা হক ঘোষণা দেন ১১ এপ্রিল পর্যন্ত পোশাক কারখানা বন্ধ থাকবে।

পোশাক কারখানা মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইতোমধ্যে বিপুল অংকের অর্ডার বাতিল হয়েছে। আরও বেশকিছু ক্রেতা তাদের অর্ডার বাতিল করতে পারে বলে জানানো হয়। সার্বিক অবস্থার স্বার্থে তৈরি পেশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রাখা প্রয়োজন। এছাড়া বিভিন্ন দেশ থেকে পিপিই, মাস্ক তৈরির অনেকগুলো অর্ডার রয়েছে সেগুলোও মানবিক কারণে দ্রুত সরবরাহ করতে হবে।  এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুনশি জরুরি রপ্তানির স্বার্থে ছুটি শেষে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলো খোলার কথা বলেছিলেন।

এর আগে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত সচিব) শিবনাথ রায়ের ১ এপ্রিল স্বাক্ষরিত শিল্প কারখানা চালু করার প্রসঙ্গে এক নির্দেশনায় বলা হয়, বিভিন্ন কলকারখানা বন্ধ করার বিষয়ে কিছু প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় বিভিন্ন বক্তব্য ও তথ্য পরিবেশিত হচ্ছে।  এতে কারখানা মালিক শিল্প কলকারখানা চালু রাখার বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।  যেসব রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ বহাল রয়েছে এবং করোনাভাইরাস প্রতিরোধে জরুরি অপরিহার্য পণ্য যেমন-পার্সোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট, মাস্ক, হ্যান্ড ওয়াস/স্যানটাইজার, ওষুধপত্র ইত্যাদি কার্যক্রম চলমান রয়েছে, সেসব কলকারখানা বন্ধ করার বিষয়ে সরকার কোনও নির্দেশনা দেয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং আইইডিসিআর কর্তৃক জারিকৃত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নির্দেশিকা কঠোরভাবে প্রতিপালন সাপেক্ষে মালিকরা প্রয়োজন বোধে কলকারকানা সচল রাখতে পারবেন।  তবে কারখানায় প্রবেশের পূর্বে থার্মাল স্ক্যানার ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমিকদের দেহের তাপামাত্রা বাধ্যতামূলকভাবে পরীক্ষা করতে হবে। কোনও শ্রমিকের দেহে করোনাভাইরাস উপসর্গ দেখা দিলে তাকে সঙ্গনিরোধের ব্যবস্থার পাশাপাশি চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা মালিকদের নিতে হবে।

 

হাসনাত/সাইফ