ঢাকা, রবিবার, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৭ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

পুঁজিবাজারের ৩৯ শতাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান যে কারণে লোকসানে

নুরুজ্জামান তানিম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-০৮ ৮:৫৭:২১ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-০৯ ১০:১৭:০৬ এএম

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান লোকসানের শীর্ষে অবস্থান করছে। যখন প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়, তখন তারা মুনাফায় ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানের বোঝা বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারপ্রতি লোকসানের অংক অভিহিত মূল্যকেও ছাড়িয়ে গেছে। ফলে এক সময়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের শীর্ষ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে এখন খুবই আনাগ্রহের।

বর্তমানে পুঁজিবাজারে ডিবেঞ্চার, করপোরেট বন্ড ও ট্রেজারি বন্ড বাদে তালিকাভুক্ত ৩৫৮টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১৮টি। এর মধ্যে ৭টি বা ৩৯ শতাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনছে। বাদিবাকি ১১টি বা ৬১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান মুনাফায় রয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- শ্যামপুর সুগার মিলস, ঝিল বাংলা সুগার মিলস, উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি, ইস্টার্ন ক্যাবলস, বাংলাদেশ সার্ভিসেস (বিডি), এটলাস বাংলাদেশ ও ন্যাশনাল টিউবস।

এদিকে মুনাফায় থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি), তিতাস গ্যাস, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো), বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস কোম্পানি (বিএসসিসিএল), বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি), রূপালী ব্যাংক, যমুনা অয়েল কোম্পানি, পদ্মা অয়েল কোম্পানি, ইস্টার্ন লুব্রিক্যান্ট ও রেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি।

এসব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেশ কয়েকটি দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেয়নি। এদের মধ্যে ঝিল বাংলা সুগার মিলস ও শ্যামপুর সুগার মিলস নিয়মিতভাবে বড় লোকসান গুনছে। এ দুই প্রতিষ্ঠান লভ্যাংশ দেওয়া তো দূরের কথা, ব্যবসায় টিকে রাখতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। আর এসব বিবেচনায় এনে প্রতিষ্ঠান দু’টির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে অডিট আপত্তি জানিছেন সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষক।

তবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যাপ্ত সম্পদ রয়েছে। তাই প্রতিষ্ঠানগুলোকে মুনাফায় ফেরাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারী ও বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বছরের পর বছর পুঁজিবাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো যদি লোকসানে থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারীরা কোন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের ওপর আস্থা রাখবেন। তাই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢালাওভাবে পুঁজিবাজারে না এনে বাছাই করে আনতে হবে। এছাড়া ওই প্রতিষ্ঠানগুলোতে শেয়ারহোল্ডার পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্রে জানা গেছে, সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও পুঁজিবাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো তালিকাভুক্তি না হওয়ার পেছনে আমলারাই বড় ভূমিকা পালন করছেন। তারা চান না প্রতিষ্ঠনগুলোও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে জবাবদিহির আওতায় আসুক। কারণ প্রতিষ্ঠনগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে প্রতি তিন মাস পরপর আর্থিক হিসাব প্রকাশ করতে হয় এবং লাভ-লোকসানের বিষয়ে নিয়মিত হিসাব দিতে হয়। ফলে আমলারা এ ধরনের জবাবদিহির আওতায় আসতে চান না।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য মতে, শেয়ারপ্রতি লোকসানের দিক থেকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও রাষ্ট্রায়াত্ব প্রতিষ্ঠানগুলো মধ্যে শীর্ষে রয়েছে শ্যামপুর সুগার মিলস। কোম্পানিটির ২০১৯ সালে প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব অনুযায়ী শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১২৬.২৯ টাকা। ২০১৮ সালে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ৯৩.৮২ টাকা। আর সর্বশেষ অর্ধবার্ষিক (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৯) হিসাব অনুযায়ী কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৪৬ টাকা। বর্তমানে কোম্পানির শেয়ারের দর সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ২৫.৪০ টাকায়।

তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ঝিল বাংলা সুগার মিলস। কোম্পানিটির ২০১৯ সালে প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব অনুযায়ী শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১০৩.৯০ টাকা। ২০১৮ সালে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ৮০.৮২ টাকা। আর সর্বশেষ অর্ধবার্ষিক (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৯) হিসাব অনুযায়ী কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৩৫.৫ টাকা। বর্তমানে কোম্পানির শেয়ারের দর সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ৩৩ টাকায়।

তৃতীয় স্থানে রয়েছে উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি। কোম্পানিটির ২০১৯ সালে প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব অনুযায়ী শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৬.২১ টাকা। ২০১৮ সালে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ১.৫ টাকা। আর সর্বশেষ অর্ধবার্ষিক (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৯) হিসাব অনুযায়ী কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ২.৪ টাকা। বর্তমানে কোম্পানির শেয়ারের দর সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ৪৪.৮০ টাকায়।

চতুর্থ স্থানে রয়েছে ইস্টার্ন ক্যাবলস। কোম্পানিটির ২০১৯ সালে প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব অনুযায়ী শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৪.৭২ টাকা। ২০১৮ সালে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ০.১৫ টাকা। আর সর্বশেষ অর্ধবার্ষিক (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৯) হিসাব অনুযায়ী কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৩ টাকা। বর্তমানে কোম্পানির শেয়ারের দর সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ১৪০.১০ টাকায়।

পঞ্চম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ সার্ভিসেস (বিডি)। কোম্পানিটির ২০১৯ সালে প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব অনুযায়ী শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৩.৭৩ টাকা। ২০১৮ সালে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ৫.৬৭ টাকা। তবে সর্বশেষ অর্ধবার্ষিক (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৯) হিসাব অনুযায়ী কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ১.৬৭ টাকা। বর্তমানে কোম্পানির শেয়ারের দর সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ৫.২০ টাকায়।

ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে এটলাস বাংলাদেশ। কোম্পানিটির ২০১৯ সালে প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব অনুযায়ী শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ০.৯৯ টাকা। ২০১৮ সালে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ১.২৩ টাকা। আর সর্বশেষ অর্ধবার্ষিক (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৯) হিসাব অনুযায়ী কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ০.৭৯ টাকা। বর্তমানে কোম্পানির শেয়ারের দর সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ১১০ টাকায়।

সর্বশেষ সপ্তম স্থানে রয়েছে ন্যাশনাল টিউবস। কোম্পানিটির ২০১৯ সালে প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব অনুযায়ী শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ০.১৬ টাকা। ২০১৮ সালে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ২.০৫ টাকা। তবে সর্বশেষ অর্ধবার্ষিক (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৯) হিসাব অনুযায়ী কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ০.২৪ টাকা। বর্তমানে কোম্পানির শেয়ারের দর সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ১০৩.১০ টাকায়।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ রাইজিংবিডিকে বলেছেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সকল প্রকার বিনিয়োগকারীদের আস্থা অনেক বেশি। সেজন্যই দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকাভুক্তির কথা বলা হচ্ছে। তবে অবশ্যই মুনাফায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় লোকসানের বোঝা বহন করতে হবে বিনিয়োগকারীদের।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কাজী আব্দুর রাজ্জাক রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘বিভিন্ন অনিয়মের কারণে রাষ্ট্রয়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো আজ লোকসান গুনছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা মোটেও কমেনি। কিন্তু তারা প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন কম দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মনিটরিং জোরদার করা দরকার।’



ঢাকা/এনটি/সাজেদ