ঢাকা, বুধবার, ৩০ আষাঢ় ১৪২৭, ১৫ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

লঞ্চডুবিতে মৃত্যু: নিরপেক্ষ তদন্তের অভাবে পার পেয়ে যান দোষীরা

মাকসুদুর রহমান ও আসাদ আল মাহমুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৬-৩০ ৭:০২:১২ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-৩০ ৯:২০:৪৫ পিএম

একের পর ঘটছে নৌ দুর্ঘটনা। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা আর হয় না। তাই নৌপথে মৃত্যুর মিছিলও থামছে না।

প্রতিটি নৌ দুর্ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত দরকার বলে মনে করেন সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরা। সরকারের দায়িত্বশীলরা বলছেন, এবার দোষীকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘এ ঘটনায় পৃথক তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। মামলাও হয়েছে। ঘটনায় যারই দোষ থাকুক না কেন তদন্ত করে তাকে চিহ্নিত করা হবে। তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। কেননা, এভাবে মানুষ মারা যাওয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।’

রাইজিংবিডির প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সোমবার যে লঞ্চটি ডুবেছে, সেখানে অনেক কিছুতে গাফিলতি হয়েছে, এতটুকুই এখন বলতে পারি।’

নৌ পুলিশের সদরঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রেজাউল করিম রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘ঘটনার প্রত‌্যক্ষদর্শীর বক্তব‌্য, লঞ্চডুবির ভিডিও ও লঞ্চ থেকে কিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, এটি দুর্ঘটনা। তবে এতে অবেহলাও আছে। এ কারণে লঞ্চের মালিকসহ সাতজনকে আসামি করে মামলা করেছি। আদালতে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। এরপরই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

নৌ পুলিশ জানায়, প্রতিদিন সারা দেশে নৌপথে বিভিন্ন রুটে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মামলা হয় না। কেননা অভিযোগ করার মানুষ পাওয়া যায় না। তবে যেসব বড় দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযোগ থাকে সেগুলোর ক্ষেত্রে কেবল মামলা হয়। গত ৫ বছরে সারা দেশে প্রায় ২ হাজার মামলা হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ মামলায় আইনি প্রক্রিয়া শুরু আগেই ক্ষতিপূরণ দিয়ে কিংবা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করা হয়। আসামিরা আগেই আদালতে জামিন নেন। এ কারণে যেমন গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না, আইনানুগ ব্যবস্থাও গ্রহণ করা যাচ্ছে না। কিছু মামলায় তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে সেগুলো বছরের পর পর বছর আদালতেই ঝুলে আছে।

নৌ পুলিশের ডিআইজি আতিকুল ইসলাম রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘সারা দেশে নৌপথের নিরাপত্তায় আমরা কাজ করছি। কোনো কোনো দুর্ঘটনায় মামলাও করছি। সেগুলোর বেশিরভাগেরই তদন্ত শেষ করা হয়েছে। পরবর্তী কাজ তো আদালতের।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছ, চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি বরিশাল-ঢাকা নৌপথে মেঘনা নদীর চাঁদপুর সংলগ্ন মাঝ কাজীর চর এলাকায় মাঝনদীতে দুই লঞ্চের সংঘর্ষে দুই যাত্রী নিহত এবং আটজন আহত হন। ২৯ জুন সকালে রাজধানীর শ্যামবাজার এলাকা সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চডুবি ঘটে। ময়ুর-২ লঞ্চের ধাক্কায় ছোট যাত্রীবাহী লঞ্চ এ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ৩৩ জনের মৃত‌্যু হয়। এর আগে ২০১৬ সালের ৫ জুলাই বরিশালের কীর্তনখোলা নদীতে ঢাকাগামী সুরভী-৭ লঞ্চের সঙ্গে বরিশালগামী সরকারি নৌযান পিএস মাহসুদের সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হন। পরের বছরের ২২ এপ্রিল বরিশাল সদর উপজেলার কীর্তনখোলা নদীর বেলতলা খেয়াঘাট এলাকায় বালুবাহী একটি কার্গোর ধাক্কায় এমভি গ্রীন লাইন-২ লঞ্চের তলা ফেটে যায়। লঞ্চটি তাৎক্ষণিকভাবে তীরে নেওয়ায় দুই শতাধিক যাত্রী প্রাণে বেঁচে যান। ২০১৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মা নদীর ওয়াপদা চেয়ারম্যান ঘাটের টার্মিনালে তীব্র স্রোতে ডুবে যায় তিনটি লঞ্চ। এ ঘটনায় লঞ্চ স্টাফ ও যাত্রীসহ ২২ জন নিহত হন। ২০১৯ সালের ২২ জুন মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌরুটে এমভি রিয়াদ নামের একটি লঞ্চের তলা ফেটে অর্ধেক পানিতে ডুবে যায়।

ফায়ার সার্ভিসের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে ঢাকা জেলাসহ সারা দেশে ৪১৮টি নৌ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে মারা যান ৪৭৯ জন যাত্রী। ২০১৬ সালে ৪২৫টি দুর্ঘটনায় ৪১০ জন মারা যান। ২০১৭ সালে ৫৩০টি দুর্ঘটনায় মারা যান ৬৪৩ জন। ২০১৮ সালে ৫০৮টি দুর্ঘটনায় ৪২৬ জন মারা যান। ২০১৯ সালে ঢাকা জেলাসহ সারা দেশে ৮২০টি নৌ দুর্ঘটনায় মারা যান ৬২৫ জন। ২০২০ সালের চলতি মাস পর্যন্ত তিনি শতাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।

সমাজবিজ্ঞানী ড. নেহাল করিম বলেন, ‘প্রতিটি দুর্ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। কিন্তু তদন্ত কমিটির নামে যা হচ্ছে, তা নিয়ে আর কী বলব! কোনোটিই আলোর মুখ দেখে না। দুর্ঘটনার কারণও অজানা থেকে যায়। তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’


ঢাকা/মাকসুদ/আসাদ/রফিক