ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ আষাঢ় ১৪২৭, ০৩ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

শেষ হলো অর্থবছর: ফিরে দেখা বাজেট

কেএমএ হাসনাত : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৬-৩০ ১০:১১:০৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-৩০ ১১:০০:৪৬ পিএম

কেমন গেল গত অর্থবছর? প্রশ্নটা যে কাউকে করলেই সরল উত্তর—সবচেয়ে খারাপ, জীবনে এমন অস্থির সময় আর আসেনি। অন্য সময় সমস্যা এসেছে, তা কেটেও গেছে। তবে এবার মহামারি পুরো বিশ্বকে গ্রাস করেছে। এর ধাক্কা বাংলাদেশকেও সামলাতে হচ্ছে।

সরকারের অনেক উন্নয়ন কর্মসূচি স্থগিত রেখে সেসব খাতের অর্থ জরুরি ভিত্তিতে করোনা মোকাবিলায় বরাদ্দ করা হয়েছে। দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় লক্ষাধিক কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে লকডাউনকালে ঘরবন্দি মানুষদের মুখে আহার তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। এই টালমাটাল অবস্থায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে নতুন বাজেট দিতে হয়েছে। আজ জাতীয় সংসদে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করা হয়েছে।

এবারের বাজেট নিয়ে দেশের বরেণ‌্য অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোক মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। প্রায় সবাই এই দুর্যোগময় সময়ে বাজেট প্রণয়নকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখলেও কিছু খাতকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন। কেউ কেউ এ বাজেটকে গতানুগতিক বলে অভিহিত করেছেন। তবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি এবং সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনি খাতে আরো নজর দেওয়া উচিত ছিল বলে মত দিয়েছেন।

দেশের অন্যতম বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য পুরাতন ও নতুন অর্থবছরের বাজেট বিষয়ে রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘এবারের বাজেট প্রণয়ন চ্যালেঞ্জিং ছিল। পুরো বিশ্ব করোনা প্রকোপে আক্রান্ত। এই মহামারিকে কেন্দ্র করে যে ধরনের বাজেট দেওয়া উচিত ছিল এবারের বাজেট তা হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে আগের চেয়ে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা কেউ জানি না, এই মহামারি কত দিনে যাবে। এজন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, দিকনির্দেশনা এবং সে অনুযায়ী বরাদ্দ থাকা উচিত ছিল। এবারের বাজেটে সে ধরনের কিছু নেই। এটি গতানুগতিক বাজেট।‘

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক ড. মু. আবু ইউসুফ বলেন, ‘আশা করেছিলাম, করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র বিশ্বজুড়ে যে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে তাকে সামনে রেখে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাসমৃদ্ধ বাজেট পাওয়া যাবে। কিন্তু তা হয়নি। অনেকটা গতানুগতিক বাজেট বলে অত‌্যুক্তি হবে না। তবে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে আগের তুলনায় অনেকটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে আরো গোছানো কিছু আশা করেছিলাম।’

এই গবেষক বলেন, ‘শিক্ষা খাতের ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। যদিও এবার শিক্ষা খাতেও বরাদ্দ বেড়েছে। তবে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার জন্য শিক্ষার্থীদের যা যা প্রয়োজন সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পথনির্দেশনা নেই এবারের বাজেটে। বিশেষ করে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে শিক্ষার্থীদের হাতে ল্যাপটপ, ইন্টারনেট সুবিধা, মোবাইলসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন উপাদান সহজলভ্য করা উচিত ছিল। শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি কৃষি খাতে আরো গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন ছিল।’

বাজেট হচ্ছে একটি অর্থবছরের সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব। সরকার কোন কোন খাত থেকে কত টাকা আয় করবে আর তা কোন কোন খাতে ব্যয় করবে তা জনগণের সামনে তুলে ধরাই বাজেট। সরকার সব সময় চায় গণমুখী বাজেট প্রণয়ন করতে। তা নির্ভর করে সম্পদ আহরণের ওপর। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে প্রতিবছর বাজেটের আকার বড় হয়। জনকল্যাণের বিবেচনায় খাতভিত্তিক মন্ত্রণালয়গুলোকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। দুটি খাত থেকে সরকার সম্পদ আহরণ করে—অভ্যন্তরীণ খাত এবং বৈদেশিক ঋণ বা অনুদান। সাধারণত অভ্যন্তরীণ খাতের ওপরই বেশি জোর দেওয়া হয়। এজন্য বিভিন্ন সেবার ওপর বিভিন্ন ধরনের কর, শুল্ক, চার্জ আরোপ করা হয়। তবে আমাদের পাশের দেশগুলোর চেয়ে আমাদের কর আদায়ের হার খুবই নগন্য, মাত্র ১০ শতাংশ। অথচ এ হার থাকা উচিত কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। কর আদায় ব্যবস্থায় নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কোনোভাবেই এটা ১০ শতাংশের ওপরে ওঠাতে পারছে না। তার ওপর আমাদের বাজেট বাস্তবায়নের দুরাবস্থা তো আছেই। কয়েক বছর আগে রাজস্ব আদায়ের সবচেয়ে বড় খাত ভ্যাট আদায় ক্ষেত্রে অটোমেশন কার্যকর করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। বার বার চাপ দেওয়া সত্বেও সেটা আজও পরোপুরি কার্যকর হয়নি। এখনো প্রয়োজনীয় সংখ্যক ইলেক্ট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) মেশিন সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বসাতে পারেনি। ফলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে অতিমাত্রায় বৈদেশিক সহায়তা এবং দেশের আর্থিক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

বাজেট প্রণয়নে যেসব বিষয়ের ওপর নজর দেওয়া হয়—রাজস্ব প্রাপ্তি, বৈদেশিক অনুদান, ব্যয় এবং অর্থ সংস্থান। গত ২০১৯-২০২০ এবং চলতি ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় সংশোধনী বাজেটে তা কমিয়ে করা হয় ৫ লাখ ১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। নতুন ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের অনুদানসহ সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ২১২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। সংশোধনী বাজেটে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৫০ হাজার ৫৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ শতাংশ। নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

রাজস্ব প্রাপ্তি ও বৈদেশিক অনুদান খাতে গত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের মূলবাজেটে প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৩ লাখ ৮১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব প্রাপ্তি, করসমূহ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রিত করসমূহ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বহির্ভূত করসমূহ এবং কর ব্যতীত প্রাপ্তি থেকে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক অনুদান থেকে ৪ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা পাওয়ার আশা করা হয়েছিল। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে তা কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫১ হাজার ৫২৩ কোটি টাকায়।

নতুন ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্বপ্রাপ্তির প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে নতুন অর্থ বছরের বাজেটে এ খাতে ৩০ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা বেশি প্রাক্কলন করা হয়েছে। রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈদেশিক অনুদান বেশি আশা করা হয়েছে। এ খাতে ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৩ কোটি টাকা।

নতুন অর্থবছরে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। আবর্তক ব্যয় ৩ লাখ ১১ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫৮ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধ, ৫ হাজার ৫৪৮ কোটি টাক বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে ব‌্যয় হবে। মূলধন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা।

উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রকল্প খাতে ব্যয় হবে ২ হাজার ৫২২ কোটি টাকা। এডিপি বহির্ভূত বিশেষ প্রকল্পে ৪ হাজার ৭২২ কোটি টাকা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ২ লাখ ৫হাজার ১৪৫ কোটি টাকা এবং কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি (এডিপি বহির্ভূত) ও স্থানান্তর খাতে ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা ব্যয় হবে।

গত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের মূল বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৪১হাজার ২১২কোটি টাকা, সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে করা হয় ১ লাখ ৫০ হাজার ৫৪ কোটি টাকা। ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেটে তা করা হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকারকে এই ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক সহায়তা নিতে হবে। তা না হলে দেশীয় আর্থিক খাত অর্থাৎ রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংক এবং সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিতে হবে।

সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ ও দাতা সংস্থগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে বাজেট সহায়তা এবং সহজ শর্তে ঋণ নিতে। ইতোমধ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং আরো কয়েকটি দাতা সংস্থার কাছ থেকে আশাব্যঞ্জক সাড়া পাওয়া গেছে।

এ মহাদুর্যোগকালে বাজেট দেওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। যদিও দেশের অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ বলছেন, এ বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয়।

কারণ হিসেবে জানা গেছে, অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় হয়ে থাকে। যখন এনবিআর রাজস্ব আদায়ে সচল হতে প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঠিক তখন করোনার প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। ফলে রাজস্ব আদায় একবারেই থমকে যায়। প্রায় দুই মাস লকডাউন থাকার পর অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে লকডাউন শিথিল করায় অর্থনেতিক কর্মকাণ্ডে অনেকটা গতি সঞ্চার হয়েছে। রপ্তানি আয়ের অন্যতম উৎস তৈরি পোশাক শিল্প ধীরে ধীরে সচল হচ্ছে। আশার কথা হচ্ছে, ইতোমধ্যে পোশাক খাতের যেসব অর্ডার প্রত্যাহার বা স্থগিত হয়েছিল সেগুলোর মধ‌্যে কিছু ফেরত আসছে। ফলে রপ্তানিতে কিছুটা গতি সঞ্চার হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।


ঢাকা/হাসনাত/রফিক