RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     সোমবার   ১৮ জানুয়ারি ২০২১ ||  মাঘ ৪ ১৪২৭ ||  ০৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙায় সরকারের উদাসীনতাকে দুষছেন বিশিষ্টজনরা 

মেসবাহ য়াযাদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:২৫, ৫ ডিসেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৭:৪০, ৫ ডিসেম্বর ২০২০
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙায় সরকারের উদাসীনতাকে দুষছেন বিশিষ্টজনরা 

ভাঙচুরের পর কুষ্টিয়ার ৫ রাস্তার মোড়ে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য

কুষ্টিয়া শহরের পাঁচ রাস্তার মোড়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙচুরের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও অনলাইন অ‌্যাক্টিভিস্টরা। তারা বলছেন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার ঘটনায় সরকারের উদাসীনতা দায়ী। প্রতিক্রিয়াশীল সম্প্রদায় ও  মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীদের শুরু থেকে দমন না করায় তারা আজ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙেছে। এখনই তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় না করালে দেশের সংস্কৃতি-মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুক্তচিন্তার জন‌্য তারা  হুমকি হয়ে উঠবে। 

প্রসঙ্গত, ঢাকার ধোলাইপাড় চত্বরে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।  তবে, এই ভাস্কর্য তৈরির পরিকল্পনা নস‌্যাৎ করতে চলতি বছরের অক্টোবরের শুরু থেকেই ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দল বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে আসছে। আর বিষয়টি জোরালোভাবে আলোচনায় আসে ১৩ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত খেলাফত মজলিশের সম্মেলনে দলের আমির অধ‌্যক্ষ মুহাম্মদ ইসহাক ও মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদেরের বক্তব‌্যের পর। এ সময় তারা বলেন, ‘ভাস্কর্য নির্মাণ পরিকল্পনা থেকে সরকার সরে না দাঁড়ালে আরেকটি শাপলা চত্বরের ঘটনা ঘটবে। ওই ভাস্কর্য ছুড়ে ফেলবো।’ 

এরপর গত শুক্রবার (২৭ নভেম্বর) চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে একই কথার প্রতিধ্বনি করেন হেফাজতের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী। তিনিও বলেন, ‘কোনো ভাস্কর্য তৈরি হলে তা টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে ফেলা হবে।’ 

এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার দিবাগত রাতে কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।  শনিবার (৫ ডিসেম্বর) সকালে বিষয়টি নজরে এলে শহরের বঙ্গবন্ধু সুপার মার্কেট চত্বর ও থানা মোড়ে আওয়ামী লীগ, জাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিল ও মানববন্ধন করেন। 

ভাস্কর্য ভাঙার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ‌্যালয়ের  শিক্ষক ও ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন। তিনি  বলেন, ‘সরকারই অপরাধীদের প্রশ্রয় দিয়েছে। তাই তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙেছে।  প্রশ্রয় পেলে কী হয়? সেটা আমরা আগেও বলেছি।   সরকার গা করেনি।  এখন সরকার বুঝবে।’ 

জানতে চাইলে গণস্বাস্থ্যের চেয়ারম্যান ও ট্রাস্টি ডা. জাফর উল্লাহ চৌধুরী ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘শুরুতে বিমান বন্দরে লালনের ভাস্কর্য ভাঙার পর সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এরপর মৌলবাদীদের হুমকির কারণে সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে ন‌্যায়বিচারের প্রতীক দেবী থেমিসের ভাস্কর্যও সরিয়ে নিয়েছে সরকার। এই ঘটনার পর তো মৌলবাদীরা সাহস পেয়েছেই।’ 

ডা. জাফর উল্লাহ চৌধুরী আরও বলেন, ‘যারা কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙেছে, তাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে।  জাতির সামনে তাদের পরিচয় প্রকাশ করতে হবে।  এটা অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ।’ ধর্মান্ধ-উসকানিদাতাদের ঠেকাতে হবে।  সরকারকে এ ব্যাপারে কঠিন ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান তিন।   

প্রায় একই প্রতিক্রিয়া জানালেন চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘আমি কেবল বলবো, এটা ঘৃণিত কাজ।  যারা করেছে, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।’

কুষ্টিয়ার ডিসি অফিসের সামনে অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটি তৈরি করেছেন শিল্পী রিঙকু অনিমিখ। শহরের ৫ রাস্তার মোড়ের  নির্মাণাধীন‌ ভাস্কর্য ভাঙা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আলেমরা যখন কোনো বিষয়ে কথা বলেন, তখন তার প্রভাব সারা দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ওপর পড়ে।  এসব আলেমও কিন্তু কোনো না কোনো দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।  তারা কখনোই দেশের উন্নতি, অর্থনীতি এসব নিয়ে কথা বলেন না।  ধর্মীয় বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষকে উসকানি দেন।  সম্প্রতি তারা ভাস্কর্য ভাঙার যে হুমকি দিয়েছেন, তাকে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কেউ কেউ ছওয়াবের কাজ বলে মনে করেছেন। এই ধর্মান্ধ ও আলেমদের উসকানিতেই  দুর্বৃত্তরা ভাস্কর্য ভাঙার সাহস দেখিয়েছে। এই ঘৃণ‌্য অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।’

অনলাইন অ্যা‌ক্টি‌ভিস্ট আরিফ জেব‌তিক বলেন, ‘সাপ পুষবেন, ছোবল খাবেন না! তা হবে না। এখনো যদি আস্কারা দেন, তাহলে নারী নেতৃত্ব হারামের আন্দোলন শুরু করবে আগামী বছর। তাদের টার্গেট হারাম ভাস্কর্য না, হারাম নেতৃত্ব। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য জাস্ট টেস্ট কেস। তারা কোন  লাইনে হাঁটতেছে, সেটা না বুঝলে শিগগিরই বড় মূল্য চুকাতে হবে।’ 

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন অনলাইন অ্যা‌ক্টি‌ভিস্ট ও সাংবা‌দিক অমি রহমান পিয়াল। তিনি বলেন, ‘ওপেন চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছে। তার বাস্তবায়ন চলছে। মামুনুল হক ও বাবুনগরীর আস্ফালন বাস্তবায়িত করছেন তাদের সমর্থকরা।’ সরকার ভাস্কর্য আর মূর্তির তফাৎ বোঝাতে থাকবে, আর তারা ভাঙতে থাকবে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। 

মেসবাহ/এনই

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়