Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||  আশ্বিন ৮ ১৪২৮ ||  ১৪ সফর ১৪৪৩

‘সিস্টেমে’ রাজনৈতিক পদ নেন হেলেনারা!

এসকে রেজা পারভেজ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:১১, ৩০ জুলাই ২০২১   আপডেট: ২১:৫৬, ৩০ জুলাই ২০২১
‘সিস্টেমে’ রাজনৈতিক পদ নেন হেলেনারা!

রিজেন্টের সাহেদ কর্মকান্ডের পর আওয়ামী লীগের উপ কমিটিগুলোতে যাতে বিতর্কিত এবং সুবিধাবাদী কাউকে সুযোগ দেয়া না হয়, সেই বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা ছিলো দলীয় হাইকমান্ডের। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই কঠোর নির্দেশনা পাশ কাটিয়ে কমিটিতে ঢুকে গেছেন সুযোগসন্ধানীরা। সম্প্রতি দলের মহিলা উপ কমিটির পদে থেকে বেআইনী কর্মকান্ডে হেলেনা জাহাঙ্গীরের নাম উঠে আসায় নেতাকর্মীদের আবারো সেই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে এসেছে যে, দলে তাদের ঠাঁই দেয় কে? 

দলের বিভিন্ন সূত্র এবং উপ কমিটিগুলোর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হেলেনা জাহাঙ্গীরের মতো অনেকেই উপ কমিটিগুলোতে ‘সিস্টেমে’ ঢুকে গেছেন। কি সেই সিস্টেম? সে সম্পর্কে তারা বলেছেন, বিভিন্ন কায়দায় দলের নেতাদের ম‌্যানেজ করাই সিস্টেম। সবার কর্মকান্ড সবসময় প্রকাশ পায় না। কিন্তু দলের এই পদ ব‌্যবহার করে তারা ঠিকই নিজের আখের গোছাচ্ছে এবং অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। আর সিস্টেমে যেতে না পারায় দলের অনেক যোগ‌্য ও ত‌্যাগী নেতা পদ পান না।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস‌্য জাহাঙ্গীর কবির নানক এই অভিযোগ প্রসঙ্গে রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘ সর্বোচ্চ হাইকমান্ড থেকে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা সকলকে সতর্ক করেছেন। তার নির্দেশনা আছে ভুইফোঁড়, হাইব্রিড, এদের সম্পর্কে সচেতন থাকার জন‌্য। উপ কমিটি থেকে তৃনমুল পর্যন্ত বারবার এই নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। নেত্রীর সেই নির্দেশনা অনুযায়ী আদর্শবিমুখ এসব ব‌্যক্তিদের দল থেকে ছেঁকে বের করে দিতে হবে।’

দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, যাদের কারনে আওয়ামী লীগের ভাবমর্তি ক্ষুন্ন হবে এবং সরকার ও দল প্রশ্নবিদ্ধ হবে, সে যেই হোক তাকে দলে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।    

দলের কয়েকজন নেতা বেশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অনেক ত‌্যাগী নেতা পদ পান না, অথচ উড়ে এসে জুড়ে বসে পদ পান হেলেনাদের মতো সুবিধাবাদীরা। হেলেনা জাহাঙ্গীরের অপকর্ম প্রকাশ্যে আসার কারনে তার কর্মকান্ডের বিষয়টি সবাই জেনেছে। এসব নব‌্য আওয়ামী লীগারদের কোনো নীতি নেই, আদর্শ নেই; শুধু সুবিধা কিভাবে নেয়া যাবে সেই ধান্দায় থাকে। পদ বাগিয়ে নেয়ার পেছনে তাদের অনৈতিক উদ্দেশ‌্য থাকে। দলের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ‘সখ‌্যতা গড়ে’, ‘সুপারিশ বাগিয়ে’ উপ কমিটি গঠনে দায়িত্বশীলদের বাধ‌্য করেন। অনেক ক্ষেত্রে যিনি সুপারিশ করেন, তিনিও সুযোগ-সুবিধা নেন-এমন অভিযোগও আছে। 

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ কমিটির সদস‌্য হয়ে অনুমোদনবিহীন একটি সংগঠন গড়ে তুলে তার মাধ‌্যমে সুবিধা নেয়ার প্রচেষ্টায় হেলেনা জাহাঙ্গীরকে ওই পদ থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। এরপরই দলে ফের আলোচনা উঠেছে হেলেনা জাহাঙ্গীর কিভাবে পদ পেলেন?

উপ কমিটিতে হেলেনার পদ পাওয়ার নিয়ে জানতে চাইলে দলের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক এবং উপ কমিটির সদস‌্য সচিব মেহের আফরোজ চুমকি রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘উপ কমিটি গঠনের সময় বেশ কিছু সুপারিশ ছিলো। দলের জ্যেষ্ঠ নেতা, মন্ত্রী-এমপিদের সুপারিশ এসেছে। সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করেই আমি দলের সাধারণ সম্পাদকের কাছে কমিটি দিয়েছি। আমি তো জানতাম না তিনি (হেলেনা জাহাঙ্গীর) এমন কাজ করবেন।’

মেহের আফরোজ চুমকি বলেনÑ‘উনি তো কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সদস্য। আওয়ামী পরিবারের হিসেবেই আমি জানি। উনার জয়যাত্রা টেলিভিশন (আইপি টিভি) নামে একটা মিডিয়া আছে, যেটার সাথে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মহোদয় আছেন। এই সুবাদেই উপকমিটিতে উনাকে আমরা রেখেছিলাম।’

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে ‘সুপারিশ’ করার বিষয়টি অস্বীকার করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘তার জন‌্য কারো কাছে লিখিত বা মৌখিক কোনো আমি সুপারিশ করিনি। চুমকি একদিন আমাকে জিজ্ঞেসা করেছিলেন আমি চিনি কি না? আমি বলেছি, হ‌্যা চিনি। ওই জয়যাত্রা টেলিভিশনের মালিক। তাকে দলের পদ দিতে হবে এমন কথা তো বলিনি। তাকে (হেলেনা জাহাঙ্গীর) জানতাম, পরিচয় ছিলো। কিন্তু সে কি অন‌্যায় অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত কি না সেটি তো আমার জানার কথা না। তবে তার জন‌্য কিছু করতে আমি বলিনি। সে চাকরিজীবী লীগ না কি লীগ করবে সেটি তো আমি জানি না।’

গত বছর রিজেন্টের সাহেদ কর্মকান্ডের পর আওয়ামী লীগের বিষয়ভিত্তিক কমিটিকে একটি নিয়মের মধ্যে আনতে নির্দেশনা ছিল। উপ কমিটিতে সর্বোচ্চ ৩৫ জন সদস‌্য রাখার কথা বলা হলেও তা মানেনি কেউ।

আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের ৬ ধারায় বিভাগীয় উপ-কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সম্পাদকীয় বিভাগের কার্যক্রম অধিকতর গতিশীল ও সমন্বিত করার লক্ষ্যে একটি করে উপ-কমিটি গঠিত হবে। একজন চেয়ারম্যান, একজন সম্পাদক (সংশ্লিষ্ট বিষয়ক, গঠিত কমিটিতে সদস্য সচিব), প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিশেষজ্ঞ সদস্য, সংশ্লিষ্ট সহযোগী সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্যের সমন্বয়ে তা গঠিত হবে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরাও পদাধিকার বলে এই কমিটির সদস্য হবেন।

এই উপ-কমিটির সদস্য সংখ্যা কত হবে, তা সুনির্দিষ্ট করে বলা নেই ওই বিধানে। বলা হয়েছে, এটি সভাপতি নির্ধারণ করবেন। গত বছর আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সভায় এ উপ-কমিটির সদস্য সংখ্যা ৩৫ নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

উপ কমিটিগুলো টে ঘেঁটে দখা গেছে, দলের সাধারণ সম্পাদকের সেই নির্দেশ নির্দেশনাতেই আটকে আছে। ৩৫-এর বেশি সদস্য নিয়েও কমিটি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, উপ-কমিটির পদায়নে মানা হয়নি বয়স বা সাংগঠনিক সিনিয়র-জুনিয়র। প্রাধান্য পেয়েছে চেয়ারম্যান ও সদস্য সচিবের মর্জি। যোগ্যতায় আসেন না, কিন্তু নিজ এলাকার লোক, ব্যক্তিগত সহকারী, রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীনÑএমন লোককেও রাখা হয়েছে কমিটিতে।

আওয়ামী লীগের ১৯টি সম্পাদকীয় বিভাগের অধীনে উপ-কমিটি হয়। এর মধ্যে ধর্ম ও দপ্তর ছাড়া সব বিভাগের উপ-কমিটির অনুমোদন হয়েছে। এগুলোর মধ্যে অধিকাংশই মানেনি সদস্যের নির্ধারিতসীমা। এর মধ্যে যুব ও ক্রীড়া উপ-কমিটিতে সদস্য সংখ্যা ৮৫, তথ্য ও গবেষণা উপ-কমিটিতে ১৬০, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক উপ-কমিটিতে ১৩৫, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপ-কমিটিতে ৫৪, মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটিতে ৫০, বন ও পরিবেশ উপ-কমিটিতে ১০০, শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক উপ-কমিটিতে ৪০, শ্রম ও জনশক্তি উপ-কমিটিতে ৮৩, শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক উপ-কমিটিতে ৬০, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক উপ-কমিটিতে ৪২, সাংস্কৃতিক বিষয়ক উপ-কমিটিতে ৪৫, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক উপ-কমিটিতে ৫৫, আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-কমিটিতে ৫৬ এবং আইন বিষয়ক উপ-কমিটিতে সদস্য সংখ্যা ৬১।

দলের নাম ভাঙ্গিয়ে বেআইনী কর্মকান্ডের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, দলীয় সভানেত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী দলের মধ্যে কারো প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে এ ধরনের কাজে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলের নাম ভাঙ্গিয়ে ব্যক্তি-স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টা কারিদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে প্রশাসনিক ব্যবস্থা।

তিনি বলেন, কোন বিতর্কিত ব্যক্তির দলে অনুপ্রবেশ ঘটলে কিংবা কারো কর্মকান্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠলে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে নির্বাচনী ট্রাইবুনালে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা যেতে পারে।

ঢাকা/পারভেজ/এমএম

সর্বশেষ