ঢাকা     শনিবার   ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ২১ ১৪২৯

কাঠ পুড়িয়ে ইট: শ্বাসকষ্টে ভুগছে শিশুরা 

বরগুনা প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:১৪, ৭ ডিসেম্বর ২০২২  
কাঠ পুড়িয়ে ইট: শ্বাসকষ্টে ভুগছে শিশুরা 

বরগুনায় এবার সব ইটভাটায় পরিবেশ বান্ধব কয়লার বিপরীতে কাঠ পুড়িয়ে ইট তৈরি করা হচ্ছে। এতে চরম শ্বাসকষ্টে ভুগছে শিশুরা। স্থানীয়রা বলছেন, নিয়ম বহির্ভূতভাবে ইটভাটাগুলো কাঠ পুড়িয়ে ইট তৈরি করছে। স্থানীয়রা বাধা দেয়ার পরও কাঠ পোড়ানো বন্ধ করছে না ইটভাটা মালিকরা। প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েও নিরাশ হয়েছেন তারা। 

চিকিৎসকরা বলছেন, পরিবেশবান্ধব কয়লার বিপরীতে কাঠ পুড়িয়ে ইট তৈরি করা শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। সচেতন মহলের নেতারা বলছেন, এমন অবস্থা চলতে থাকলে সামাজিক বনায়ন ধ্বংস হয়ে যাবে।  

ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) ২০১৯ অনুযায়ী, বিশেষ কোনো স্থাপনা, রেলপথ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা অনুরূপ কোনো স্থান বা প্রতিষ্ঠান থেকে কমপক্ষে এক কিলোমিটার দূরে ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। তবে এই আইন লঙ্ঘন করে বরগুনায় চলছে ইট ভাটাগুলো। বরগুনা জেলায় প্রায় ২৪০টি ইটভাটা রয়েছে। 

বরগুনা আমতলী উপজেলায় সরেজমিন দেখা যায়, বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে আধা কিলোমিটার দুরত্বের মধ্যে একটি ইটভাটা রয়েছে। ভাটা এলাকা দিয়ে ইট পোড়ানোর ধোঁয়ায় শিক্ষার্থীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। এই পথ দিয়ে চলার সময় চোখ জ্বালা-পোড়া ও শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ভাটার ইট পোড়ানোর কালো ধোঁয়া আর উড়ে আসা বালি বিদ্যালয় ভবনে প্রবেশ করে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছে। এতে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ে।

আমতলী উপজেলার সদর ইউনিয়নের মানিকঝুড়ি এলাকায় আমতলী-তালতলী সড়কের ঘেঁষে সাগর ব্রিকস নামের ইটভাটা গড়ে ওঠে। এই ভাটার অভ্যন্তরে চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এরমধ্যে ভাটার দক্ষিণ দিকে আরপাঙ্গাশিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আরপাঙ্গাশিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উত্তর দিকে দক্ষিণ পশ্চিম আমতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং আরপাঙ্গাসিয়া দাখিল মাদ্রাসা। ওই ইট ভাটাটি আমতলী উপজেলার ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি নাজমুল আহসান নান্নুর। 

আরপাঙ্গাশিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামরুনাহার রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘আমার স্কুলের পাশে ইটভাটা আছে, ভাটার কারণে আমাদের শিক্ষার্থীদের খুব ক্ষতি হয়। ভাটার কারণে বিদ্যালয়ের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এই ভাটায় কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। আমাদের অনেক কিছু সহ্য করতে হচ্ছে। ইটের ভাটা লোকালয়ের বাইরে স্থাপনের নিয়ম থাকলেও এটি স্কুলের আধা কিলোমিটাররের কম দুরত্বে গড়ে তোলা হয়েছে। ভাটার কারণে অনেক সময় শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। ভাটার কালো ধোঁয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হচ্ছে।’  

তিনি আরও বলেন, ‘ইটভাটার মালিক প্রভাবশালী। তাই তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলে না। আমরা ভাটা নির্মাণের শুরু থেকেই প্রতিবাদ করে এসেছি। প্রশাসনকে জানিয়েছি কিন্তু কাজ হয়নি।’  

ইটভাটার ১০০ ফুটের মধ্যে বসবাস করা এক নারী নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, ‘ইট পোড়ানোর ধোঁয়ায় আমার শ্বাসকষ্টে ভুগছি। শিশুদের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। সবাই শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। আমাদের বাড়িতে কোনো গাছে ফল ধরে না।’  

মানিকঘঝুড়ি গ্রামের বাসিন্দা জালাল মিয়া বলেন, ‘ইট পোড়ামাটির গন্ধ নাকে এসে লাগে। চোখ জ্বালা করছে। কালো ধোঁয়ায় বেশি সমস্যা হয়। এই এলাকায় অনেকের শ্বাসকষ্টে হচ্ছে।’ 
 
আরপাঙ্গাশিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী রবিউল, লামিয়া, তানিয়াসহ একাধিক শিক্ষার্থীরা বলেন, তাঁরা কষ্ট করে পড়ালেখা করে। কালো ধোঁয়া এসে শ্রেণিকক্ষে গন্ধ ছড়ায়। তাদের শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। 

একই অবস্থা বরগুনা পৌরসভার সাবেক মেয়র শাহাদাত হোসেনের ইটভাটার। বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিড়া এলাকার ঘনবসতি এলাকায় ৭ বছর আগে ইট ভাটা নির্মাণ করেন তিনি। সরেজমিন ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, প্রথমে ছোট পরিসরে শাহাদাত হোসেন ইটভাটা নির্মাণ করলেও এখন তার পরিধি অনেক বড়। পাথরঘাটে উপজেলায় সব থেকে বড় ইটভাটা তার। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মন কাঠ পুড়িয়ে ইট তৈরি করা হয়। 

কাকচিড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন পল্টু রাইজিংবিডিকে বলেন, ভাটার মালিক শাহাদাত হোসেন কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি ক্রয় করে ইটভাটা নির্মাণ করে। এরপর সরকারি খাস জমি অবৈধ দখল করে ইটভাটা চালায়। কিন্তু এই দুই বছর ধরে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে এই ভাটায়। একাধিকবার তাকে অনুরোধ করেও কাঠ পোড়ানো বন্ধ করতে পারেনি তারা।

একই অবস্থা বরগুনা সদর, তালতলী, বামনা ও বেতাগী উপজেলার। এসব ভাটা মালিকদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, কয়লার দাম এখন দ্বিগুণ। তাই এবার বাধ্য হয়ে সবাই কাঠ পোড়াচ্ছেন। 

সাগর ব্রিকস এর মালিক নাজমুল আহসান নান্নু রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘আমার ভাটার মতো বাংলাদেশে হাজারো ভাটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে গড়ে তোলা হয়েছে। আমার সকল কাগজ (অনুমতি পত্র) রয়েছে। ইট পোাড়ানোর কাজে কয়লা ব্যবহার করছি। আমতলীতে শুধু আমারটা না, বরগুনা জেলায় সবাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে ইটভাটা গড়ে তুলেছে।’

বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সোহরাব হোসেন রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘ইটভাটায় কাঠ পুরনো হলে সেটা শিশুদের মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ায়। এতে একদিকে যেমন শ্বাসকষ্টে সমস্যা হয়, অন্যদিকে ফুসফুসেরও সমস্যা হয়।’  

বরগুনা শহর উন্নয়ন কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ রফিক রাইজিংবিডিকে বলেন, একদিকে সংরক্ষিত বনের গাছ চুরি করছে বনদস্যুরা। আবার অন্য দিকে সামাজিক বনায়নের গাছ নির্বিচারে কেটে বিক্রি করা হচ্ছে ইটভাটায়। অথচ আইনে রয়েছে সামাজিক বনের গাছ কাটতে হলেও প্রশাসনের অনুমতি লাগবে। সবার চোখের সামনে সামাজিক বনের গাছ ইটভাটায় যাচ্ছে, কেউ বাধা দিচ্ছে না, ব্যবস্থাও নিচ্ছে না। 

আমতলী উপজেলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা তালতলী উপজেলার নির্বাহী অফিসার এস এম সাদিক তানবীর রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এত কাছে ইটভাটা গড়ে তোলা হয়েছে এই বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে সত্যতা মিললে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

বরগুনার জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘অধিকাংশ ইটভাটা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র পেয়ে চালাচ্ছে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশে এবং ঘনবসতি এলাকায় ইটভাটা গড়ে কীভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাচ্ছে এ বিষয়ে কিছুই জানে না জেলা প্রশাসন।’ 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় সহকারী পরিচালক আবদুল হালিম রাইজিংবিডিকে বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা নির্মাণ করা যাবে না। এমন হয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

ছাড়পত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেক ইটভাটা বন্ধ করে দেবো। সবার আগে আমাদের পরিবেশ রক্ষা করতে হবে।’ 
 

ইমরান/বকুল 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়