ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ মাঘ ১৪২৬, ২৮ জানুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

আরেকটি বিপিএল : প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

ইয়াসিন হাসান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-০৭ ৯:৪৩:৪৮ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-০৭ ১:৪৪:২৮ পিএম

আরেকটি বিপিএল দরজায় কড়া নাড়ছে। কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হবে চার-ছক্কার মারদাঙ্গা টুর্নামেন্ট। ২২ গজে ব্যাট-বলে ঝড় তুলবেন ব্যাটসম্যান-বোলাররা। গ্যালারিতে উঠবে ঢেউ। কিন্তু কোথায় যেন এক ঠুনকো ‘আশা’ আবারও বীজ বপন করছে!

এবারের বিপিএল ছাড়িয়ে যাবে আগের সব আসর! হবে হাইভোল্টেজ সব ম্যাচ! পাওয়া যাবে ১৪০ স্ট্রাইক রেটে ব্যাটিং করা ব্যাটসম্যান! পাওয়া যাবে ভালোমানের লেগ স্পিনার! পাওয়া যাবে ডেথ বোলিংয়ের বিশেষজ্ঞা কাউকে! বরাবরের মতো এবারও বিপিএল শুরুর আগে এসব কথা আসছে ঘুরে ফিরে। কিন্তু মাঠের ক্রিকেটে এমন কিছু পাওয়া যাবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

তবে বিপিএল শুরুর আগে যে উন্মাদনা, উত্তেজনা, সৌরভ ছড়ায়, তা এখনো টের পাওয়া যাচ্ছে না মিরপুর। বড় কারণ থাকতে পারে ফ্র্যাঞ্চাইজি ছাড়া বিপিএল হওয়ায়। এবার বিপিএল বিসিবি আয়োজন করছে বিশেষ উদ্দেশ্যে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজন করা হচ্ছে এই টুর্নামেন্ট। ফলে বিসিবি বাদ দিয়েছে আগের সাত ফ্রাঞ্চাইজিকে। টেনেছে পাঁচ স্পন্সর প্রতিষ্ঠানকে। বাকি দুটি দল বিসিবি নিজেই চালাবে।

বঙ্গবন্ধু বিপিএল শুরুর মাহেন্দ্রক্ষণে একটি প্রশ্ন আবারও উঠছে, ফ্র্যাঞ্চাইজিদের দিয়েই কি বঙ্গবন্ধু বিপিএল করা যেত না? এ প্রশ্নে এক ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকের একটাই আক্ষেপ, ‘বিসিবির বিপিএল নিয়ে কোনো পরিকল্পনা কখনোই থাকে না! হুট করে এটা করে করে, ওটা করে! ধরুন, এই বিপিএল শেষ হবে জানুয়ারিতে। বিপিএলের পরবর্তী আসর কীভাবে হবে, সেটা নিয়ে তারা আলোচনা করবে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে। আর বলবে নভেম্বর-ডিসেম্বরে বিপিএল। এটা আসলে হয় না। আপনি মার্চে আলোচনায় বসুন না। ফ্র্যাঞ্চাইজিদের সম্পৃক্ত করে দেন সারা বছরের জন্য। তখন দেখবেন ফ্র্যাঞ্চাইজিরা কী করতে পারে।’ ওই ফ্র্যাঞ্চাইজির দম থাকলেও বিসিবির যে সেই দম নেই, তা আগের থেকেই প্রমাণিত! তাইতো বিপিএল বরাবরই হয় হ-য-ব-র-ল!

বিপিএল শুরুর আগে থাকে বেশ কিছু প্রত্যাশা। এই যেমন সেদিনই মিরপুরে হাবিবুল বাশার সুমন বলছিলেন, ‘আগামী বছর অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য বিশেষায়িত খেলোয়াড় তৈরি করতে চাই আমরা। সেজন্য এবারের বিপিএলের দিকে তাকিয়ে আছি। বিপিএলে আমরা তরুণদের যেমন অনুসরণ করব, তেমনই সিনিয়র খেলোয়াড়দেরও পরখ করব। আমাদের টি-টোয়েন্টি দলে ১৪০/১৫০ স্ট্রাইক রেটের খুব বেশি বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান নেই। ৫/৬/৭ নম্বরে আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যানও প্রয়োজন। প্রতিটি বিপিএলেই কয়েকজন ভালো খেলোয়াড় খুঁজে পাওয়া যায়। আশা করি, এবারও খুঁজে পাব।’

বাস্তবতা তো বলছে ভিন্ন কথা। গত বিপিএলে প্রতিশ্রুতিশীলদের মধ্যে ছিলেন ইয়াসির আলী রাব্বী৷ কিন্তু বিপিএলের পর থেকেই ইয়াসির আলী নিজেকে হারিয়ে খুঁজেছেন। তাতে দায় আছে টিম ম্যানেজমেন্টেরও! জাতীয় দলে ডেকে খেলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। সফরসঙ্গী হয়ে ঘুরে ফিরে ইয়াসির যেন ভুলে গেছেন খেলা! বিসিবি ‘এ’ হোক আর এইচপি, কোথাও বলার মতো পারফরম্যান্স নেই। নজর কাড়েননি ঘরোয়া লিগেও। ফলে শেষ বিপিএলের একমাত্র ‘আবিষ্কার’কেও হারাতে হয়েছে অযত্নে, অবহেলায়! প্রায় একই অবস্থা আরিফুল হকের। বিপিএলে ভালো করে এসেছিলেন জাতীয় দলে। কিন্তু প্রত্যাশা মেটাতে না পারায় এখন অনেক দূরে।

 

 

এক বছর পর আরেকটি বিপিএল। মাঝে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে প্রিমিয়ার লিগ হয়েছে বছরের শুরুর দিকে। প্রথমবারের মতো প্রিমিয়ার লিগের দলগুলো নিয়ে আয়োজিত টি-টোয়েন্টি আলো ছড়িয়েছিল বেশ। কিন্তু ওই পারফরম্যান্সগুলোতেও ধরেছে মরিচা! পুরোনো পারফরম্যান্স কার-ই বা মনে থাকে।  জাতীয় দলে ফিরতে ক্রিকেটাররা বসে থাকেন বিপিএল ও ঢাকা লিগের জন্য। সবার ধারণা, এখানে পারফরম্যান্সের হাইলাইট হয় সবচেয়ে বেশি। সেই সূত্রে বিপিএলের দিকে তাকিয়ে তারা। তাদের ওপরে অযাচিত চাপ! তাতে চিড়ে চ্যাপ্টা নিজেরাই।

এনামুল হক বিজয়ের মুখে সেই সুর, ‘আমি জাতীয় দলে ফিরতে চাই। এজন্য বিপিএল সেরা মঞ্চ। এখানের পারফরম্যান্স কাউন্ট হয়। আমাকে জাতীয় দলে ফিরতে হলে এখানে পারফর্ম করতেই হবে।’ একই সুর জাতীয় দলের মিথুনেরও, ‘আমাদের দলে তারকা ক্রিকেটার নেই। এটা আমাদের জন্য একটা বড় সুযোগ। অন্যবার প্রতিটা দলে বিদেশি ক্রিকেটারদের আধিপত্য বেশি থাকে ফলে স্থানীয়দের পারফরম্যান্স করার সুযোগ থাকে না। আমার লক্ষ্য থাকবে নিজের সেরাটা দিয়ে দলের প্রত্যাশা পূরণ করা। যত বেশি রান করা যায় সেই চেষ্টা থাকবে।’

বিপিএলে এবার তারকা বিদেশি ক্রিকেটারদের ঘাটতি রয়েছে বেশ! ক্রিস গেইল আসবেন শেষ দিকে। আন্দ্রে রাসেল শুরু থেকে থাকবেন কি না, তা অজানা। নেই কাইরন পোলার্ড, এবি ডি ভিলিয়ার্স, রাইলি রুশো, শেন ওয়াটসনের মতো তারকারা, যারা টি-টোয়েন্টি ফেরি করে বেড়াচ্ছেন। ফলে বিপিএল যে বর্ণহীন হতে যাচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

পুরোনো খবর নতুন করে এলে আরও মন খারাপই হবে! এবার সাকিব আল হাসানও নেই। আইসিসির নিষেধাজ্ঞায় বিপিএলের ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডারকে পাওয়া যাচ্ছে না।

তারকা বিদেশি ক্রিকেটারদের পাশাপাশি বিপিএলে এবার নেই তারকা কোনো বিদেশি কোচও। বিসিবি নিজেদের খরচে কোচ আনায় বেছে নিয়েছে ‘আনকোড়া’দের! সাত দলের বিপিএলে বিদেশি কোচ ছয়জন। দেশিদের মধ্যে আছেন শুধু মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। এছাড়া ওটিস গিবসনের নামটারই ওজন আছে শুধু। অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোচ ছিলেন ওটিস গিবসন। বাকিরা কোচিং ক্যারিয়ারে একেবারেই নতুন। বলার মতো কোনো সাফল্যও নেই। অনেকেরই নেই বড় কোনো টুর্নামেন্টে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা। তাদের থেকে স্থানীয় ক্রিকেটাররা কতটুকু গ্রহণ করতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।

বিপিএলের উইকেট কেমন হবে সেটা নিয়েও হয় আলোচনা। মিরপুরে বিপিএলের সবচেয়ে বেশি ম্যাচ হবে। আর মিরপুরের উইকেট নিয়েই সবার হতাশা সবচেয়ে বেশি। ‘স্লো ও লো উইকেট কখনোই হতে পারে না টি-টোয়েন্টির আদর্শের। মিরপুরের উইকেটকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া জরুরি। তাহলে ভালো টি-টোয়েন্টি উইকেট পাওয়া সম্ভব’- বলছিলেন এক কোচ। বাস্তবতা হচ্ছে টানা ম্যাচ হওয়ায় মিরপুরের উইকেট তৈরি করা সম্ভব হয় না। দেওয়া যায় না পর্যাপ্ত বিশ্রাম। ফলে মিরপুর ট্র্যাডিশনাল অ্যাক্ট থেকে বের হতেও পারে না।

শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামের কিউরেটর গামিনি ডি সিলভা হতাশার সুরে বারবার বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো মাঠেই এত বেশি খেলা হয় না।’ চট্টগ্রামের উইকেট বরাবরই হয় ব্যাটিং সহায়ক। সেখানে রান উৎসব হয়। আর সিলেট বিভ্রান্তি ছড়ায়! কখনো স্পিনারদের খুব সাহায্য করে, কখনো পেসারদের। আবার ব্যাটসম্যানরা খুঁজে পান নিজেদের কমফোর্ট জোন।

টি-টোয়েন্টি মানেই চার-ছক্কার ধুন্ধুমার লড়াই। ২২ গজের ক্রিজে ব্যাটসম্যানরা রানের ফুলঝুড়ি ছুটিয়ে রান বন্যায় ভাসাবেন, এমনটাই প্রত্যাশা। রোমাঞ্চ, পরতে পরতে উত্তেজনা, শেষ মুহূর্তে জয়-পরাজয় নির্ধারণ; সব মিলিয়ে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণীয় এক প্যাকেজ। ব্যাট-বলের রান উৎসবে জমবে বিপিএল এমনটাই প্রত্যাশা ক্রিকেটপ্রেমীদের। আয়োজকরা কি প্রত্যাশা মেটাতে পারবে? আরেকটি বিপিএল শুরুর আগে সবার থেকে অনেক প্রত্যাশা। দর্শক, ক্রিকেটার, আয়োজক সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিপিএল আলো ছড়াতে পারে কি না, সেটাই দেখার।

 

ঢাকা/ইয়াসিন/পরাগ