ঢাকা, রবিবার, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৭ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

উড়ছে মেয়েরা, উড়ছে লাল-সবুজের পতাকা (দ্বিতীয় পর্ব)

কামরুল ইসলাম ইমন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-১০ ৭:২১:৩৩ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-১০ ১:৫৫:৪৯ পিএম

বাংলাদেশের ইতিহাসে ফুটবলের গৌরবজ্জ্বল অধ্যায়ের কথা আগের পর্বে বলা হয়েছে। তবে সে গৌরবের কৃতিত্বের ভাগিদার হিসেবে নেই নারীদের নাম। কারণ ফুটবলের বড় ক্ষয়িষ্ঞু সময়ে জন্ম নারী দলের। এছাড়া ততদিনে দেশজুড়ে ক্রিকেটের জয়োধ্বনি।

পড়ুন প্রথম পর্ব : শেকল ভাঙা নারীদের ফুটবলপ্রেম (প্রথম পর্ব)

তাইতো নারী ফুটবল দল দীর্ঘ ৯ বছরের মতো পড়ে ছিলো আঁতুড়ঘরে। ২০০১ সালে প্রথম নারী ফুটবল দল গঠন করা হয়। অথচ নারী ফুটবলে জাতীয় দল আলো দেখে ২০১০ সালে এসে। সে থেকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে কেটে গেছে আরও এক দশক। এই সময়ের মধ্যে সাফল্য ও ব্যর্থতাকে সঙ্গী করে এগিয়েছে জাতীয় দল। এই সুদীর্ঘ সময়ে দলটির কোচ হিসেবে আছেন গোলাম রাব্বানী ছোটন। জাতীয় দল ছাড়াও বয়সভিত্তিক দলেরও কোচিংয়ের দায়িত্ব সামলান তিনি।

এ সময়ে জাতীয় দলের ব্যর্থতার পাল্লা বেশি হলেও সাফল্যগুলো সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অতি গুরুত্বপূর্ণই বটে। তবে বাংলাদেশ নারী ফুটবলের আশা হয়ে আছে বয়সভিত্তিক দলগুলো। জাতীয় দলের তুলনায় তাদের সাফল্যের হার বেশি। এসব দল থেকে উঠে আসছে সানজিদা, মারিয়া, তহুরার মতো দুর্দান্ত সব প্রতিভা। তাই নতুন ঊষায় উদ্বেলিত হবার অপেক্ষায় আছে নারী ফুটবল দল।

নারী ফুটবলের বিষন্ন গল্পগুলো

নারী ফুটবলের সাফল্যের গল্প জেনে নেওয়ার আগে এই দলটি কতবার আমাদের বিষন্নতায় ভুগিয়েছে সেটি জানানোর চেষ্টা করবো।

১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো নারী বিশ্বকাপ চালু হয়। এর প্রায় কুড়ি বছর পরে বাংলাদেশের জাতীয় নারী ফুটবল দলের আবির্ভাব। ফলে ২০১১ সালের বিশ্বকাপ ছিলো বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের সামনে প্রথম বিশ্বকাপ। কিন্তু এসেই পথ হাতড়ে খোঁজা বাংলাদেশের জন্য সে বিশ্বকাপ ছিলো আকাশ কুসুম কল্পনার মতো, হয়েছেও তাই। বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব খেলার যোগ্যতাও অর্জন করতে পারেনি নারীরা।

তবে ২০১৫ বিশ্বকাপের লক্ষ্যে ভালো প্রস্তুতি শুরু করে বাংলাদেশ। আবারও ব্যর্থ বাংলাদেশ। তবে এবার কিছুটা উন্নতির ছাপ ছিলো। এশিয়ান ফুটবল কনফাডেরেশন কাপের বাছাইপর্ব খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। তবে মূলপর্বে জায়গা করে নিতে না পারায় থামতে হয় সেখানে। চিত্র বদলায়নি ২০১৯ বিশ্বকাপের ক্ষেত্রেও। একই গতিপথে এগিয়েছে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া অনূর্ধ্ব-২০ দলের গল্পও।

বিশ্বকাপের মতো আসরে বাংলাদেশ নারী দলের না খেলা, অবস্থা বিবেচনায় স্বাভাবিকই ধরা যায়। তবে বাংলাদেশ দলের জন্য অস্বাভাবিক রকম ব্যর্থতার প্রথম গল্প হলো ২০১২ সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়া। ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো সাফে খেলতে গিয়ে সেমিফাইনাল খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ। অথচ পরের আসরেই গ্রুপ পর্ব থেকে ছিটকে যায় দলটি। চার দলের গ্রুপে বাংলাদেশ ভূটানের বিপক্ষে জিতলেও ভারত ও শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে বাদ পড়ে। এছাড়াও সাফে পাঁচবার অংশ নিলেও শিরোপার স্বাদ পায়নি কখনোই।

সাউথ এশিয়ান গেমসে ২০১০ সালে প্রথমবার অংশ নিয়ে ব্রোঞ্জ জিতে বাংলার নারীরা। অথচ ছয় বছর পর আরও পোক্ত দল নিয়েও সে সাফল্য টপকাতে পারেনি বাংলার নারীরা। ব্যর্থতার গল্পে তাই চলে আসে ২০১৬ সালের গুয়াহাটির সাউথ এশিয়ান গেমসও।

ব্যর্থতার ছোট গল্প লেখা যায় বয়স ভিত্তিক দল নিয়েও। তবে হামাগুড়ি থেকে হাঁটতে শেখা বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের সে গল্পগুলো সাফল্যের পথের চাবিকাঠি হিসেবে পরিমাপ করাই শ্রেয়।

সাফল্যের পালকে স্বপ্নের পরশ দেওয়ার গল্প

খুব বড় ক্যানভাসের সাফল্য না পেলেও ভবিষ্যতে ভালো কিছুর রসদ জোগানিয়া সাফল্য নিজেদের করে নিতে পেরেছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বড় সাফল্য ২০১৬ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে রানার্স আপ হওয়া। কোচ গোলাম রাব্বানীর অধীনে সাবিনা খাতুনরা সেবারই প্রথম ফাইনালে শিরোপার জন্য লড়াই করতে নামে।

শিলিগুড়িতে হওয়া সে ম্যাচের ১২ মিনিটে এগিয়ে যাওয়া স্বাগতিক ভারতের জালে ৪০ মিনিটে গোল পরিশোধ করে সিরাত জাহান স্বপ্না। এরপর ম্যাচের ৬০ মিনিট পর্যন্ত খেলায় সমানে সমানে লড়ে সাবিনার বাংলাদেশ। তবে পরের ৭ মিনিটের ব্যবধানে ২ গোল করে বাংলাদেশ থেকে জয় ছিনিয়ে নেয় ভারত। তবে সে আসর থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি আছে আরও। অধিনায়ক সাবিনা খাতুন ৮ গোল দিয়ে দ্বিতীয় ও স্বপ্না ৫ গোল দিয়ে তৃতীয় সেরা গোলদাতা হন।

এছাড়াও সাফে পাঁচবার খেলতে নেমে চারবারই সেমিফাইনাল খেলে বাংলাদেশ। সাফল্য আছে সাউথ এশিয়ান গেমসেও। এ নিয়ে দুইবার প্রতিযোগিতাটিতে অংশ নিয়ে দুইবারই ব্রোঞ্জ পদক জিতে নেয় বাঘিনীরা।

জাতীয় দলের সাফল্যের চেয়ে বেশি জাজ্বল্যমান বয়সভিত্তিক দলের সাফল্য। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৪ দল দুই দুইবার এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) কাপের শিরোপা জিতে নেয়। সাফে অংশ নেওয়া অন্যান্য দলগুলো এএফসি কাপে খেলার সুযোগই পায়নি এখন পর্যন্ত। সেখানে এই প্রতিযোগিতার শিরোপা জেতা গোলাম রাব্বানীর দলের জন্য দারুণ গৌরবের।

শিরোপা জেতার গল্প আছে, অনূর্ধ্ব-১৫ ও ১৮ দলের। দুই দলই সাফে শিরোপার স্বাদ পেয়েছে। অনূর্ধ্ব-১৫ দল প্রথম দল হিসেবে আলাদা দুটি প্রতিযোগিতা থেকে শিরোপা জেতার গৌরব অর্জন করেছে। তার মধ্যে একবার দেশের বাইরে হংকংয়ে। ফাইনালে স্বাগতিকদের হারিয়ে শিরোপা জিতেছে চার জাতির জকি সিজিয়াই টুর্নামেন্টের।

শিরোপা ভাগ্যের শিকে ছিড়তে না পারলেও এএফসি কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল অনূর্ধ্ব-১৬ দল। যদিও শক্তিশালী, জাপানের কাছে পরাজিত হয়ে গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়েছে। তবে অস্ট্রেলিয়ার মত দলের সঙ্গে ২-২ গোলের ড্র করে নিজেদের জাত চিনিয়েছে বাঘিনীরা। এভাবেই ফুটবল পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে নারীরা। সাফল্য আসা শুরু করেছে, শোকেজে উঠছে ট্রফি। উড়ছে মেয়েরা, উড়ছে লাল-সবুজের পতাকা।

বাংলাদেশ জাতীয় নারী দলের কোচ গোলাম রাব্বানী তার শিষ্যদের অর্জনগুলোতেই মন দিতে চান বেশি করে। ব্যর্থতাগুলোকে নতুন এবং ছোট দল হিসেবে উন্নতির পাথেয় হিসেবে মানতে চান, ‘আমাদের দলের ব্যর্থতা নিয়ে অনেক কথা হয়। তবে শুরুর দিকে যে দল ছিলো, তারা নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। আর সময়ের সাথে দলের শক্তিমত্তাও বাড়ছে। বয়সভিত্তিক দলগুলোও ভালো করছে। সে দলের মারিয়া, তহুরা ভবিষ্যতে জাতীয় দলের কান্ডারি হয়ে উঠলে দৃশ্যপট বদলাবে বলে আমার বিশ্বাস।’

‘মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে।’ সেই সূর্যের আলোয় আলোকিত হবে বাংলাদেশের নারী ফুটবল এমনটাই আশা ভক্ত-সমর্থকের। কোচের বিশ্বাসের মতো সাফল্যের রঙে বদলাবে নারী ফুটবলের গল্প। এমন বিশ্বাসেই তো বিশ্বাসী হতে চাই আমরা, ভক্ত-সমর্থকবৃন্দ।

***শেষ পর্বে থাকবে নারী ফুটবল দলের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যতের লক্ষ্য।

 

ঢাকা/কামরুল/ইয়াসিন