ঢাকা     বুধবার   ০৫ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২১ ১৪২৭ ||  ১৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

বিশ বছরে টাইগারদের সেরা পাঁচ টেস্ট জয় (দ্বিতীয় পর্ব)

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৬:০৭, ২ জুলাই ২০২০  

প্রথম জয় এসেছিল টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পাচঁ বছর দুই মাস পর, দ্বিতীয় জয় পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল চার বছর। তৃতীয় জয় এসেছিল পরের টেস্টেই। টেস্টে বাংলাদেশের এই তৃতীয় জয়ই থাকছে রাইজিংবিডির পাচঁ পর্বের ধারাবাহিক "বিশ বছরে সেরা পাচঁ জয়" এর আজকের দ্বিতীয় পর্বে।

দ্বিতীয় জয় না হয়ে তৃতীয় জয় কেন সেরা পাঁচে? এর অনেক কারণই আছে। আপাতত এই একটা কথাই বুঝিয়ে দেবে এর গুরুত্ব- বাংলাদেশ সে জয়ে জিতেছিল সিরিজ। আর ওই সিরিজ জয়ের পর বোর্ড থেকে বোনাস হিসেবে পেয়েছিলো ২ লাখ ১৪ হাজার ডলার যা অন্য সিরিজ জয়ে বোনাসের চেয়ে সাতগুণ বেশি ছিল।

ওয়েস্ট ইন্ডিজে পাড়ি দেওয়ার আগে বাংলাদেশ ক্রিকেটে আসে বড়শড় পরিবর্তন। অধিনায়কত্ব হারান মোহাম্মদ আশরাফুল, দায়িত্বটা পান তারই বন্ধু মাশরাফি বিন মুর্তজা। মাশরাফির ডেপুটি হন সাকিব আল হাসান। মাশরাফি তার ক্যারিয়ারে বহুবার ইনজুরিতে পড়েছেন। সেবার আরও একবার। উইন্ডিজদের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে ৬.৩ ওভার বল করেই হাঁটুর চোটের শিকার মাশরাফি। নড়াইল এক্সপ্রেসকে যেতে হয় ডেভিড ইয়াংয়ের ছুরির নিচে।

ডেপুটি সাকিবের কাঁধে দলের ভার। সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে প্রথমবারের মতো টস করতে নেমে জিতে যান সাকিব, নেন ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত। শুরুতেই আঘাত হানেন কাপ্তান সাকিব। তামিমের ক্যাচ বানিয়ে ফিলিপসকে ফেরান ২৩ রানে। তবে রিচার্ডস ও ডাওলিনের ব্যাটে ২২.২ ওভারে শত রান করে ফেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এরপর মাহমুদুল্লাহ ২ রানের ব্যবধানে পরপর তুলে নেন রিচার্ডস ও হিন্ডসের উইকেট। রিচার্ডস ৬৯ ও হিন্ডস ২ রান করে ফেরেন মাহমুদুল্লাহর হাতে ক্যাচ দিয়েই।

১০৭/৩ স্কোরে লাঞ্চে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। লাঞ্চের পর মাহমুদুল্লাহর বলে অধিনায়ক রেইফার ১ রানে ফিরলে ১১৪ রানেই ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এরপর বার্নার্ড ও ডাওলিনের ব্যাটে এগুতে থাকে তারা। কিন্ত তাদের ৪৩ রানের জুটিকে দীর্ঘ করতে দেননি সাকিব। ১৭ রানে আশরাফুলের হাতে ক্যাচ দিয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরেন বার্নার্ড। ৩ নাম্বারে নামা ডাওলিনকে একপাশে রেখে উইকেট হারাতে থাকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ড্যারেন সামি ও ওয়ালটনকে যথাক্রমে ১ ও ২ রানে আউট করেন আরেক বাহাতি স্পিনার এনামুল হক জুনিয়র। এরপর বাংলাদেশের দুর্দান্ত বোলিংয়ের সামনে ডাওলিন ও অস্টিন দারুণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। তাদের ৫৯ রানের জুটি ভাঙে হিট উইকেটে।

শাহাদাতের বলে ১৯ রান করা অস্টিন হিট উইকেটে ফেরেন সাজঘরে। শেষ পর্যন্ত ৯৫ রানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সর্বশেষ উইকেট ডাওলিনকে সাজঘরের পথ দেখান সাকিব। প্রথম দিনের তৃতীয় সেশনে ৭৬.১ ওভার খেলে ২৩৭ রান করে অলআউট হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তিনটি করে উইকেট শিকার করেন সাকিব, মাহমুদুল্লাহ ও এনামুল।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও বাংলাদেশের লড়াইটা ছিল অনেকটা স্পিন বনাম পেস। যেখানে বাংলাদেশের স্পিনের কাছে হেরে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেস। এর প্রমাণ পাবেন একটু পরেই।

প্রথম দিনের শেষভাগে ব্যাটিং করতে নেমে ২৬ রানে ইমরুলের উইকেট হারায় বাংলাদেশ। ১৪ রান করে স্যামির বলে আউট হন তিনি। ৩৫/১ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় দিন শুরু করে টাইগাররা। তামিম ইকবালকে এক পাশে রেখে দলীয় ৫১ রানেই ফিরে যান নাইটওয়াচম্যান এনামুল হক জুনিয়র। এরপর ৩৭ রান করে বার্নার্ডের বলে আউট হন তামিমও। তামিমের দেখানো পথ অনুসরণ করেন জুনায়েদ ও আশরাফুল। দুজনের ব্যাট থেকে আসে যথাক্রমে ৭ ও ১২ রান।

১০৬ রানে ৫ ব্যাটসম্যান সাজঘরে। সেখানে ৪৪ রানের জুটি গড়ে চাপ সামলান সাকিব ও রকিবুল। রকিবুল বড় কিছুর সম্ভাবনা দেখালেও ৪৪ রানের বেশি করতে পারেননি। অধিনায়ক সাকিবের প্রথম ইনিংসে ছিল না প্রাণ। ৫৩ বলে ১৬ রানে শেষ কাপ্তান নক। এরপর লড়তে থাকেন মুশফিক ও মাহমুদুল্লাহ। ৪৮ রানে রোচের বলে মুশফিক ফিরলে ভাঙে তাদের ৬২ রানের জুটি। এরপর বেশিদূর যায়নি বাংলাদেশের ইনিংস।৭৯.৫ ওভার খেলে ২৩২ রান করে দ্বিতীয় দিনেই অলআউট হয়ে যায় বাংলাদেশ। ৪৮ রান খরচায় ৬ উইকেট পান কেমার রোচ। ১টি করে উইকেট লাভ করেন সামি, বার্নার্ড, অস্টিন ও হিন্ডস।

প্রথম ইনিংসে লড়াইটা সমান সমান। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৫ রানের লিড নিয়ে কিছুটা এগিয়ে। তবে তাদের থামানোর সকল উত্তর জানা ছিল সাকিব, এনামুল, মাহমুদউল্লাহদের। মূলত সাকিবের পাঁচ ও এনামুলের তিন উইকেটে ২০৯ রানে শেষ স্বাগতিকদের দ্বিতীয় ইনিংস। সর্বোচ্চ ৭২ রান করা ফিলিপস ও ৪৯ রান করা ডাওলিনকে ফিরিয়ে সাকিব দলকে এগিয়ে দেন। ম্যাচের নাঁটাই এবার বাংলাদেশের হাতে।

সিরিজ জয়ের জন্য বাংলাদেশের লক্ষ্য ২১৫ রান। সে লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে বিনা উইকেটে ১৭ রান করে চতুর্থ দিনের মধ্যাহ্ন বিরতিতে যায় যায় বাংলাদেশ। বিরতির পর ফিরে ইমরুল দ্বিতীয় ইনিংসেও ব্যর্থ হন। তামিমের ব্যাট থেকেও আসেনি রান। ২৯ রানে দুই ওপেনার সাজঘরে। প্রথম ইনিংসের মতো দ্বিতীয় ইনিংসেও হতাশ করেন জুনায়েদ, আশরাফুল। এরপর জমে যায় সাকিব ও রকিবুল জুটি। তাতে উড়তে থাকে বাংলাদেশ। হাফ সেঞ্চুরির পর রকিবুল ৬৫ রানে সামির বলে ফিরতি ক্যাচ দিলেও সাকিব ছিলেন অপ্রতিরোধ্য,অনবদ্য। ওয়েস্ট ইন্ডিজের আক্রমণ দুর্দান্তভাবে ফিরিয়ে সাকিব খেলেন ৯৫ রানের নজরকাড়া ইনিংস। 

২১১ রানে থাকা অবস্থায় রোচকে লং অন দিয়ে ছয় হাঁকিয়ে প্রথমবারের মতো বিদেশের মাটিতে সিরিজ জয়ের স্বাদ পান সাকিব, এবং বাংলাদেশ। রোচের ফুল লেংথের বলে শট খেলেই বলের দিকে না তাকিয়ে কিছু ভাবতে না ভাবতেই অধিনায়ক সাকিব জড়িয়ে ধরেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে। ড্রেসিং রুম থেকে বেরিয়ে আসেন তামিম-আশরাফুলরা। সবার অভিবাদন পেতে পেতেই ড্রেসিং রুমের দিকে যেতে থাকেন অধিনায়ক হিসেবে প্রথম টেস্টেই জয় পাওয়া সাকিব।

বাংলাদেশের ৬১তম টেস্টে এসেছিলো সে জয়। টেস্টে লাল-সবুজের তৃতীয় জয়। সে টেস্টে লড়াইও হয়েছিলো দারুণ। ওই যে আগেই বলেছিলাম স্পিন বনাম পেসের লড়াই। বাংলাদেশের স্পিনে কুপোকাত হয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আর ক্যারিব্যানদের পেসে পথ হারানোর পর কিনারা খুঁজে পায় টাইগাররা। ম্যাচে বাংলাদেশ স্পিন বোলিংয়ে উইকেট শিকার করেছে ১৮টি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ পুরো ম্যাচে বাংলাদেশের ১৬ উইকেট নিতে পেরেছে যার মধ্যে ১৪টিই নিয়েছেন পেসাররা।

পরের পর্ব আরেকটি ঐতিহাসিক জয় নিয়েই!

 

ঢাকা/ইয়াসিন

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়