ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৬ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২২ ১৪২৭ ||  ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

বিশ বছরে টাইগারদের সেরা পাঁচ টেস্ট জয় (চতুর্থ পর্ব)

ক্রীড়া প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৫৭, ৪ জুলাই ২০২০  

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়। অকল্পনীয়! খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলতে থাকা দলের জন্য অবশ্যই অকল্পনীয়। কিন্তু দল যখন দৌড়াতে থাকে তখন প্রতিপক্ষ স্রেফ উড়ে যায়। ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়াকেও তেমনভাবে উড়িয়ে ছিল বাংলাদেশ।

সাকিব-তামিম জুটির ৫০তম ম্যাচে এসেছিল সেই জয়। সাকিব ছিলেন মূল নায়ক। তামিম আনসাং হিরো। সেবার ম্যাচ জিতে বাংলাদেশ ‘জবাব’ দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়াকে। কিন্তু কিসের জবাব? সেটা অবহেলার জবাব, ক্রিকেট বিশ্বে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের জবাব। ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর বিশ বছরে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ সফরে এসেছে মাত্র দুবার। যেখানে আয়ারল্যান্ড বাদে বাকি সব টেস্ট খেলুড়ে দেশই বাংলাদেশ সফরে এসেছে তিনবারের বেশি।

প্রথম সফরের ১১ বছর পর দ্বিতীয়বার ২০১৭ সালে বাংলাদেশে এসেছিল অস্ট্রেলিয়া। এটা অবহেলা নয় কি? ২০১৭ সালের সফরেও নানা টালবাহানা শেষে বাংলাদেশে এসেছিল অস্ট্রেলিয়া। ঢাকা টেস্টের সেই জয় তাই বাংলাদেশের কাছে অনেক গুরুত্বপুর্ণ।

ঢাকায় অজিদের বিপক্ষে ২০ রানের সে জয় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ছয় টেস্টে একমাত্র। এ জয় নিয়েই রাইজিংবিডির পাচঁ পর্বের ধারাবাহিক "বিশ বছরে সেরা পাচঁ টেস্ট জয়" এর আজকের চতুর্থ পর্ব।

২০১৬ সালে টার্নিং উইকেট বানিয়ে ক্রিকেটের জনক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এসেছিল জয়। জয়ের জন্য স্পিন সহায়ক উইকেটই বাংলাদেশের জন্য 'একশ তে একশ পাওয়া' রণকৌশল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাই তৈরি টার্নিং উইকেট। এরকম উইকেটে টস জিতলেই ব্যাটিং করতে চাইবে দুই দলই। মুশফিকও তাই টস জিতেই নিলেন ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত। ১০ রানে নেই বাংলাদেশের তিন উইকেট। সৌম্য ৮ এবং ইমরুল ও সাব্বির ফিরেছেন ০ রানে৷ সেসময় একবারের জন্যও কি আপনি ভাবেননি এই টেস্টও গেল! ভাবলেও এতে কোন দোষ নেই- এরকমই তো দেখে এসেছেন আপনি। কিন্ত বলেছিলাম না এ বাংলাদেশ ভিন্ন বাংলাদেশ। এ বাংলাদেশ জেতার জন্যে খেলে।

দুই বন্ধু সাকিব-তামিম মিলে গড়লেন ১৫৫ রানের জুটি। ৭১ রান করে তামিম আউট হলে ১৬৫ রানে ৪ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। স্মরণীয় টেস্টে ১৬ রানের জন্য সেঞ্চুরি মিস করেন সাকিব আল হাসান। ৮৪ রান করে অফ স্পিনার নাথান লায়নের বলে স্টিভেন স্মিথের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরে যান তিনি। এরপর মুশফিক(১৮), নাসির(২৩), মিরাজের(১৮) ছোট্ট ইনিংসে ভর করে স্কোরবোর্ডে ২৬০ রান তুলতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। তিনটি করে উইকেট পান লায়ন, কামিন্স ও এস্টন এগার। ম্যাক্সওয়েল নেন ৭১ রান করা তামিমের উইকেট৷

প্রথম দিনের শেষভাগে ব্যাটিং করতে নেমে বাংলাদেশের মতোই দশা হয় অস্ট্রেলিয়ার। ১৪ রানেই নেই তিন উইকেট। স্কোরবোর্ডে আরও চাররান যোগ করে দিন শেষ করে অতিথিরা। দ্বিতীয় দিনের শুরুতে ৩৩ রানে অস্ট্রেলিয়ার চতুর্থ উইকেট তুলে নেন মেহেদী হাসান মিরাজ। ৮ রানে বোল্ড করে ফেরান স্টিভেন স্মিথকে। এরপর ৬৯ রানের দারুণ এক পার্টনারশিপ গড়েন পিটার হ্যান্ডসকম্ব।

৩৩ রান করে তাইজুলের বলে হ্যান্ডসকম্ব এলবিডব্লিউ হলে ১০২ রানে ৫ উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া৷ ওপেনিংয়ে নামা ম্যাট রেনশো শেষমেশ ৪৫ রান করে সাকিবের বলে আউট হন দলীয় ১১৭ রানে। ২৩ ও ২৫ রানে গ্লেন ম্যাক্সওয়েল ও প্যাট কামিন্সকেও ফেরান সাকিব আল হাসান। শেষ মুহুর্তে এস্টন এগারের ৯৭ বলে অপরাজিত ৪১ রানের দুর্দান্ত ইনিংসের পরও অস্ট্রেলিয়া অলআউট ২১৭ রানে। ৬৮ রানে সাকিব নেন ৫ উইকেট। তাইজুল ও মিরাজ শিকার করেন যথাক্রমে ১ ও ৩ উইকেট।

৪৩ রানের লিড নিয়ে খেলতে নেমে আবারও ছন্দপতন। ৬৭ রানে নেই ৩ উইকেট।

সঙ্গী হারালেও তামিম ছিলেন দারুণ। দুর্ভাগ্যবশত এ ইনিংসেও সেঞ্চুরির দেখা পাননি তামিম। ৭৮ রানে কামিন্সের বলে ওয়েডের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি৷  সাকিবের ব্যাট হাসেনি দ্বিতীয় ম্যাচে। ৫ রানে সাজঘরে বিশ্বসেরা অলাউন্ডার৷ শেষ পর্যন্ত মুশফিকের ৪১, মিরাজের ২৬ ও সাব্বিরের ২২ রানে বাংলাদেশ অলআউট ২২১ রানে।

অস্ট্রেলিয়ার জন্য ২৬৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করা খুব মুশকিল হবে তা বোঝাই যাচ্ছিল। বিশেষ করে চতুর্থ ইনিংসে উইকেটের ফাটল আর বল যেভাবে ঘুরছিল তাতে বাংলাদেশ ছিল এগিয়ে। অতিথিরা ২৮ রানে হারায় ২ উইকেট। এরপর বাংলাদেশকে চোখ রাঙাণি দেন স্মিথ ও ওয়ার্নার। ১৩০ রানের জুটিতে লক্ষ্য এগিয়ে আনেন তারা।

অস্ট্রেলিয়ার জয়ের জন্য দরকার ছিল ১৫৬ রান, হাতে আছে দুই দিন, বাংলাদেশের দরকার ৮ উইকেট- এরকম সমীকরণ নিয়েই শুরু হয় চতুর্থ দিনের খেলা। তখন হয়তো অনেকেই 'হেরে যাওয়ার আগেই হেরে গিয়েছিলেন'। কিন্ত টাইগাররা তো তা পারেনা।

একের পর এক অজিকে সাজঘরের পথ দেখাতে থাকেন সাকিব-মিরাজ-তাইজুল স্পিনত্রয়ী। সেঞ্চুরিয়ান ডেভিড ওয়ার্নারকে ফিরিয়ে সাকিব ভাঙেন জুটি। ৪ ওভার পর সাকিবের শিকার স্মিথ। এরপর সাকিব-তাইজুল ৩৫ বলে আরও চারটি উইকেট নিয়ে ১৭১/৪ থেকে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ১৯৯/৮ এ নেন নিমিষেই। শেষে লড়াই করতে থাকেন প্যাট কামিন্স ও নাথান লায়ন। লায়নকে ১২ রানে মিরাজ আউট করলে ২২৮ রানে ৯ উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। একপাশে ১৫ রান করে অপরাজিত থাকা কামিন্স ছিলেন বলে হয়তো আশা করছিল অস্ট্রেলিয়া।

জয়ের জন্য যখন ৩৭ রানের দরকার তখন অস্ট্রেলিয়ার শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে মাঠে নামেন জস হ্যাজলউড। তাকে সাথে রেখে দলকে জয়ের কাছে নিয়ে যেতে থাকেন কামিন্স। কিন্ত এ ম্যাচ তো বাংলাদেশের! অস্ট্রেলিয়ানরা জিতবে কেন? ২৪৪ রানে হ্যাজলউডকে তাই এলবিডব্লিউ করে ২০ রানে জিতে নেয় বাংলাদেশ। অপরপাশে ৩৩ রানে অপরাজিত থেকে কামিন্স দেখতে থাকেন বাংলাদেশের বিজয় উল্লাস। ম্যাচে মোট ১০ উইকেট এবং ৮৯ রান করে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হন সাকিব আল হাসান। ২ ইনিংসে মোট ১৪৯ রান করে এ পুরষ্কারে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তামিম ইকবাল।

অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে মাঠে যেমন ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে, ঠিক তেমননি কথার লড়াইয়েও জিততে হবে। ঢাকায় সেবার তেমন কিছুই করে দেখিয়েছিল বাংলাদেশ। ক্রিকেট বিশ্বে স্লেজিং বললেই যে চোখে ভাসে অস্ট্রেলিয়ানদের চেহারা! সে অস্ত্রের মোকাবেলা করতে প্রয়োজন 'মারের বদলে মার' নীতি। মানে, স্লেজিংয়ের বদলে স্লেজিং নীতি। তাতেই কাজ হয়ে যায় বাংলাদেশের।

শেষ পর্বে থাকছে শততম টেস্ট জয়ের গল্প।

 

ঢাকা/ইয়াসিন

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়