ঢাকা     শুক্রবার   ০৭ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৩ ১৪২৭ ||  ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

বিশ বছরে টাইগারদের সেরা পাঁচ টেস্ট জয় (শেষ পর্ব)

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৪৭, ৫ জুলাই ২০২০  

বিশেষ ক্ষণে বিতর্ককে সঙ্গী করে বিশেষ জয়; আর এটিই ছিল বাংলাদেশের শততম টেস্ট জয়ের গল্প। স্বাগতিক দেশ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তাদের মাঠে নিজেদের শততম টেস্ট খেলা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ কিছু ছিল। আর তারপর এলো সে ম্যাচ রঙিণ করা এক জয়। আরেকটি কারণেও এই জয়টা বিশেষ, কারণ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৮ টেস্ট পর এসেছিলো প্রথম জয়; আর চতুর্থ দেশ হিসেবে শততম ম্যাচে জয়ে রাঙাতে পেরেছিল বাংলাদেশ। আর বিতর্ক! সেই উত্তরও থাকছে রাইজিংবিডির পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক ‘বিশ বছরে সেরা পাঁচ জয়’-এর আজকের শেষ পর্বে।

শ্রীলঙ্কার মাঠে দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজের প্রথমটিতে ২৫৯ রানের শোচনীয় পরাজয়। টাইগারদের সে সময়কার কোচ চান্ডিকা হাথুরুসিংহ বিষয়টি একদম পছন্দ করেননি। আর তাই শততম টেস্ট ম্যাচের জন্য বিতর্কিত দুটি সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন এই লঙ্কান কোচ। প্রথম ম্যাচের স্কোয়াড থেকে বাদ দেন দুই অভিজ্ঞ টাইগার ক্রিকেটার মুমিনুল হক এবং মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে। তাঁর এমন সিদ্ধান্তে বিতর্কের তৈরি হয় প্রচুর। তবে ২০১৭ সালের কলম্বোর পি সারা ওভাল স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় টেস্টে টাইগারদের ৪ উইকেটের জয় ম্লান করে দেয় সেসব তর্ক-বিতর্ক।

সে ম্যাচে টস হেরে শুরুতে ফিল্ডিংয়ে নামতে টাইগার ক্রিকেটারদের। আর নেমেই স্বাগতিকদের ব্যাকফুটে ঠেলে দেন মেহেদী মিরাজ এবং মুস্তাফিজুর রহমান। ৩৫ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে শুরুতেই চাপে পড়ে যায় স্বাগতিকরা। চতুর্থ উইকেটে দিনেশ চান্দিমাল গুনারত্নকে নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। তবে শুভাশিষ রায় ভাঙেন ৩৫ রানের সেই জুটি। এরপর নিচের দিকের সব ব্যাটসম্যানের মাঝারি মানের ইনিংসের সহায়তা নিয়ে একাই দেয়াল হয়ে দাঁড়ান চান্দিমাল। ৪ নাম্বারে ব্যাটিংয়ে নেমে আউট হয়েছেন নবম উইকেট হিসেবে। চাপ সামলে দলকে আগলে রেখে ১৩৮ রান করেন এই লঙ্কান ব্যাটসম্যান। ১০ চার ও ১ ছক্কায় সাজানো চান্দিমালের নান্দনিক ইনিংসের ইতি ঘটান মিরাজ। তবে ততক্ষণে লড়াই করার মতো ৩৩৮ রানের পুঁজি পেয়ে যায় শ্রীলঙ্কা। স্বাগতিকদের পক্ষে লাকমাল ৩৫, ডিকওয়েলা এবং ধনাঞ্জয়া ৩৪ করে করেন। টাইগারদের পক্ষে মিরাজ ৩টি এবং ২টি করে উইকেট পান মুস্তাফিজ, শুভাশিষ ও সাকিব।

দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের ইনিংস শুরু করেন তামিম ইকবাল ও সৌম্য সরকার। গড়েন ৯৫ রানের উদ্বোধনী জুটি। ব্যক্তিগত ৪৯ রানে হেরাথের বলে তামিম আউট হলে ভাঙে ওপেনিং জুটি। এরপর ৬১ রান করে আরেক ওপেনার সৌম্য সরকার আউট হন দলীয় ১৩০ রানে। তবে তৃতীয় উইকেটে ৬২ রানের জুটি গড়ে ইনিংস বড় করতে থাকেন সাব্বির ও ইমরুল। তবে শেষ বিকালের ঝড়ে ভেঙে পড়ে টাইগার ইনিংস। স্কোরবোর্ডে ৬ রান যোগ করতেই হারায় ৩ উইকেট। ১৯২/৩ স্কোর থেকে ১৯৮/৬ দাঁড়ায় টাইগারদের স্কোর। ৩৪ করেন ইমরুল আর ৪২ রানে আউট হোন সাব্বির।

তৃতীয় দিন সাকিব-মুশফিক মিলে টাইগারদের রানের চাকা আবার সচল করেন। গড়েন ৯২ রানের জুটি। দলীয় ২৯০ রানে ব্যক্তিগত ৫২ করে মুশফিক ফিরলেও সাকিব অবিচল থাকেন। অভিষিক্ত মোসাদ্দেককে নিয়ে এগুতে থাকেন দারুণভাবে। তারা দুজন গড়েন ১৩১ রানের জুটি। ১০ চারে ১১৬ রান করে সান্দাকানের বলে দলীয় ৪২১ রানে ফিরেন সাকিব। এরপর বেশিক্ষণ টিকেনি টাইগার ইনিংস। শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে ৭৫ রান করে মোসাদ্দেক যখন আউট হোন টাইগারদের স্কোর তখন ৪৬৭/১০। হেরাথ এবং সান্দাকান ৪টি করে উইকেট শিকার করেন।

১২৯ রান পেছনে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো সূচনা করেন থারাঙ্গা ও করুণারত্নে। মিরাজ এসে ভাঙেন ৫৭ রানের জুটি। এরপর কুশল মেন্ডিসকে নিয়ে ৮৬ রানের জুটি গড়েন করুণারত্নে। দলীয় ১৪৩ রানে মেন্ডিসকে ৩৬ রানে ফিরিয়ে বাংলাদেশকে খেলায় ফেরান মুস্তাফিজ। দ্রুতই ফেরান চান্দিমালকেও। লঙ্কানদের স্কোর দাঁড়ায় ১৬৫/৩। এরপর ২৫ রানের ব্যবধানে ফিরে যান গুনারত্নে (৭), ধনাঞ্জয়া (০) ও ডিকওয়েলা(৫)। তখনও লঙ্কানদের শেষ ভরসা করুণারত্নে ছিলেন ক্রিজে।

তবে বেশিক্ষণ থাকতে পারেননি। শতক হাঁকিয়ে দলীয় ২১৭ রানে ব্যক্তিগত ১২৬ করে সাকিবের বলে আউট হন তিনি। এরপর ২৩৮ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে শ্রীলঙ্কা যখন বিপদে তখন দলের হাল ধরেন পেরেরা ও লাকমাল। পেরেরার ৫০ ও লাকমালের ৪২ রানে ভর করে দ্বিতীয় ইনিংসে ৩১৯ রান তোলে স্বাগতিকরা। লিড পায় ১৯০ রানের। টাইগারদের পক্ষে ৪টি উইকেট নেন সাকিব। আর ৩টি মুস্তাফিজ।

চতুর্থ ইনিংসে ১৯১ রানের লক্ষ্য উপমহাদেশের মাটিতে ফিল্ডিং দলের জন্য দারুণ পুঁজি। বাংলাদেশের জন্যও সেটি পাহাড়সম হয়ে উঠতো যদি না তামিম-সাব্বির দুর্দান্তভাবে খেলতেন না। মাঠে নেমে ২২ রানে ২ উইকেট হারিয়ে বসে বাংলাদেশ। তখন আরেকটি হারের শঙ্কা। তবে সাব্বিরকে নিয়ে দারুণভাবে প্রতিরোধ গড়েন তামিম। তৃতীয় উইকেটে গড়েন ১০৯ রানের জুটি। চালিয়ে খেলতে থাকা তামিম ১২৫ বলে ৮২ রান করে আউট হলে ভাঙে এই জুটি। এরপর ৪১ রান করে দলীয় ১৪৩ রানে বিদায় নেন সাব্বিরও। ৪ উইকেট হারানো বাংলাদেশ এরপর সাকিব-মুশফিক-মোসাদ্দেকের ব্যাটে সহজেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। তবে সাকিব (১৫ রান) এবং মোসাদ্দেক (১৩) করে ফিরে যান। ২২ রানে অপরাজিত মুশফিকের সঙ্গী হোন মিরাজ। আর এই স্পিনিং অলরাউন্ডার ২ রান নিয়ে হয়ে যান ইতিহাসের সাক্ষী।

লঙ্কায় টাইগারদের বিজয় উল্লাসের সঙ্গে উল্লাসে মাতোয়ারা হয় পুরো বাংলাদেশ। সে ম্যাচে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হন অনুমিতভাবেই তামিম ইকবাল খান। আর এই জয় দিয়ে শততম টেস্টে জয়ের ক্লাবে অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তানের সাথে নাম লেখায় বাংলাদেশ।

পি সারা ওভালে ২০১৭ সালের ১৯ মার্চ বাংলাদেশ জিতেছিল নবম টেস্ট। বিশ বছরে ১১৯ টেস্টে এখন জয়ের সংখ্যা ১৪। জয়ের সংখ্যা কম হলেও বেশিরভাগ জয়ই ঐতিহাসিক। সেসব জয় চিরকালই মনে থাকবে বাঙালীদের। রাইজিংবিডি’র ‘বিশ বছরে পাঁচ টেস্ট জয়’-এর ধারাবাহিকের প্রতিটি জয়ই তাই আমাদের কাছে গুরুত্বপুর্ণ। কোনোটাই কোনটার চেয়ে পিছিয়ে নেই। তবে টেস্টে এখনও পরিসংখ্যানটা আমাদের পক্ষে নয়। তবে ধারাবাহিকভাবে টেস্টে উন্নতি করা টাইগারদের সামনের দিন হবে আরও রঙিন। এমন আশা করতে তো কোন মানা নেই!


ঢাকা/কামরুল

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়