ঢাকা     রোববার   ১৬ জানুয়ারি ২০২২ ||  মাঘ ২ ১৪২৮ ||  ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

‘দা‌রিদ্র্য দূর করার আনন্দটাই সবচেয়ে বেশি’

ইয়াসিন হাসান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:২৮, ১৪ জুন ২০২০   আপডেট: ১২:৪৪, ২৯ এপ্রিল ২০২১
‘দা‌রিদ্র্য দূর করার আনন্দটাই সবচেয়ে বেশি’

অলংকরণ: সিজার

কৃষক বাবার সন্তান হয়ে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখা ছিল বিলাসিতা। দুইবেলা ঠিকমতো খাবার জোটার নিশ্চয়তা যেখানে ছিল না সেখানে বল-ব‌্যাট নিয়ে সময় কাটানো ছিল বাড়াবাড়ির মতো। কিন্তু রাত জেগে স্বপ্ন দেখা শরীফুল জানতেন, অভাবের সংসারে আলোর মুখ দেখাবে ক্রিকেট।

তাইতো বাবা-মাকে রাজী করিয়ে শরীফুল স্বপ্নের পেছনে ছোটা শুরু করেন। কাঁটা বিছানো পথ পেরিয়ে শরীফুল এখন বিশ্বকাপ জয়ী তারকা। জিতেছেন যুব বিশ্বকাপ।

অতটুকুন ছেলে দেশের জন্য যে সম্মান এনে দিয়েছেন তাতে ভরে গেছে দরিদ্র বাবা মায়ের বুক। আর দারিদ্রতার সঙ্গে যুদ্ধ জিতে যাওয়ার আনন্দতেই ব‌্যাকুল লম্বা গড়নের এ পেসার।

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দন্ডপাল ইউনিয়নের নগরপাড়া এলাকায় শরীফুলের বাস। সেখান থেকে মুঠোফোনে রাইজিংবিডিকে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিলেন দ্রুতগতির বোলার। তার কথা শুনেছেন ইয়াসিন হাসান।

রাইজিংবিডি: এই লকডাউনে নিজের ফিটনেস নিয়ে কিভাবে কাজ করছেন?

শরীফুল: প্রথম যখন লকডাউন দিলো, তখন বেশি কিছু করা হয়নি আসলে। বিশ্রামেই ছিলাম। তারপর যখন দেখলাম লকডাউন বাড়ছে, তখন থেকে কোনও সপ্তাহে তিনদিন বা কোনও সপ্তাহে চারদিন রাস্তায় রানিং করা শুরু করি, রাবার ব্যান্ড দিয়ে কাজ করি, সুইমিং করি। আসলে একটা রুটিন ভাগ করা আছে। এখন সে রুটিনটি অনুসরণ করছি।

রাইজিংবিডি: শুনেছি আপনি করতোয়া নদীতে সাঁতরান…

শরীফুল: জি ভাই। সাঁতার আসলে আমার নিয়মিত কাটা হয়। কখনো একা একা কাটি, আবার কখনো বন্ধুদের নিয়েও যাই। নদীতে ঝাঁপাইতে ভালো লাগে।

রাইজিংবিডি: বিশ্বকাপ জেতার পর জীবন বদলে গেল কিভাবে?

শরীফুল: জীবন বদলানোর কথা বলতে গেলে…বিশ্বকাপ জেতার আগে আমার এলাকায় বা যেখানে হোক আমাকে খুব কম মানুষই চিনতো। কিন্তু ভারতকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জেতার পর মানুষ এখন বেশি চিনছে। আমার এলাকার মানুষ বা পঞ্চগড়ের সবার কথাই বলেন না কেন, সবাই আমাকে ভালোবাসতো, এখন সেই ভালোবাসার মাত্রা বেড়ে গেছে আরও।

রাইজিংবিডি: আপনার এক বন্ধুর কাছ থেকে শোনা…আপনি নাকি ঘুমের মধ্যে এখন উইকেট উদযাপন করেন? আর মাঝে মাঝেই নাকি পকেটে হাত দিয়ে রাখেন? (উইকেট উদযাপনে যেটা করতেন)

শরীফুল: নাহ নাহ, উদযাপন করি না। তবে ফাইনালের স্মৃতিকে স্বপ্ন হিসেবে দেখি। মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যে সেদিনের সেই ফাইনাল খেলা স্বপ্ন দেখি। এমনকি আমি জাতীয় দলের জার্সিতেও বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন দেখি। প্রায়ই এই স্বপ্ন দেখে থাকি। তাও আবার সেই ফাইনালেও ভারতকেই হারিয়েছি।

আসলে বিশ্বকাপ জেতার পুরো বিষয়টা আমার কাছে এত ভালো লাগে যে, বলার বাইরে। নিজের কাছে মনে হয় যেন স্বপ্নের মধ্যেই সেই ফাইনাল খেলেছি। সেই ম্যাচের পুরো ভিডিওটাই আমার কাছে আছে। যখনই মন খারাপ হয় সেই ভিডিওটা আমি দেখি।

রাইজিংবিডি: আপনি অনেকটা তৈরি হয়ে বিশ্বকাপে গিয়েছিলেন। ঢাকা লিগ খেলেছেন। জাতীয় লিগ খেলেছেন। বিপিএলও খেলেছেন। আপনার জন‌্য কি কাজটা খুব সহজ ছিল?

শরীফুল: যেহেতু আমি সিনিয়রদের সাথে খেলার সুযোগ পেয়েছি, তাই আমার কিছুটা অভিজ্ঞতা ছিল। আমি যখন প্রথমবার প্রাইম ব্যাংকে খেলি, তখন রুবেল ভাই ছিল। এছাড়াও বিপিএলে যেবার খেলছি সেবার জুনায়েদ খান ছিল, আমির ছিল। এইচপি ক্যাম্পে, অনূর্ধ্ব-১৮ দলের হয়ে নেট বোলিং করার সময় মুস্তাফিজ ভাইয়ের কাছে শিখেছি। এছাড়াও ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে অনেক ভালো ভালো বোলার ছিল।

সবার কাছ থেকে শিখেছি। আমার নিজের কাছে, যখন যেটাতে সন্দেহ লাগতো, সব প্রশ্ন করতাম; জিজ্ঞেস করতাম, ‘ভাই কোন সময়ে ব্যাটসম্যানকে কোন বল করে অসুবিধায় ফেলা যাবে?’ এছাড়াও কোচরা তো ছিলই। তো যেহেতু আমি প্রিমিয়ার লিগ, ‘এ’ দলে খেলেছি, তাই নিজের একটা অভিজ্ঞতা ছিল আর আত্মবিশ্বাসও তৈরি হয়েছিল যে, আমি যেখানে যেভাবে খেলি না কেন, নিজের সেরাটা দিতে পারবো।

রাইজিংবিডি: শুনেছিলাম, আপনার প্রথম পারিশ্রমিকের টাকা ঢাকা থেকে পাঠাতে কঠিন যুদ্ধ করা লেগেছিল?

শরীফুল: এ রকমটাই হয়েছিল। ২০১৭ সালে যখন আমি প্রথমবারের মতো প্রিমিয়ার লিগ খেলি, সেবার আমি প্রাইম ব্যাংকে ছিলাম। আমি সেবার ভালোও খেলি। খেলা শেষে সবার কাছে চেক আসছে। আমারটাও আসছে, কিন্তু আমি টাকা তুলতে পারছিলাম না। তখন আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না। আর আমার অ্যাকাউন্ট খোলা যাবে কিনা, সে ভয় ছিল। কারণ আমার তখনও জাতীয় পরিচয়পত্রও ছিল না। এমনকি পাসপোর্টও করা হয়নি। পরে জন্ম নিবন্ধন কার্ড দিয়ে খোলা হয়েছিল। কঙ্কন ভাই আমাকে অনেক সাহায্য করেছিল। পরে আমার নামে স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল। তবে প্রথমবার টাকাটা আমি চেকে তুলতে পারিনি। সেই টাকাটা আমাকে হাতেই দেওয়া হয়েছিল। তবে পরেরবার থেকে চেকে তুলতে পেরেছি। সেই হাতে টাকা দিতেই ঢাকা থেকে লোক এসেছিল পঞ্চগড়ে।

রাইজিংবিডি: এমন কোনও কোচ আছে যার সাথে এক সেশন হলেও কাজ করার ইচ্ছে আছে?

শরীফুল: আমার পাকিস্তানি পেস কিংবদন্তি ওয়াসিম আকরামের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা আছে। উনার আউটসুইং, ইনসুইং দুইটাই আমাকে মুগ্ধ করে। তবে আমি বিশেষ করে উনার থেকে ইনসুইং বোলিংটা শিখতে চাইবো।

রাইজিংবিডি: আপনি রানের আপের সময় পায়ে ক্রস চিহ্ন আঁকেন। সেটা কেন?

শরীফুল: এটা এখন আর নেই। এটা জ্যাকি স্যার ঠিক করে ফেলছে। আগে রান আপ মিলতো না তাই ওইভাবে দৌড় দিতাম। ওইটা আমার জন্য ছন্দের মতো কাজ করতো।

রাইজিংবিডি: আপনার রানআপ বিশাল্। ২৭ কদম দৌড়ান…

শরীফুল: আমার রান আপ এখনও ২৭-২৮ কদম। বড় রান আপেই বোলিং করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

রাইজিংবিডি: শরীফুলের ক্রিকেটার হয়ে উঠার পেছনে কোনও কষ্টের গল্প আছে?

শরীফুল: অনেক আছে, কোনটা ছেড়ে কোনটা বলবো…

রাইজিংবিডি: যেটা বলে তৃপ্তি পান সেটাই বলেন…

শরীফুল: আমাদের বাড়িতে আমি, ভাই, মামা আর আমার বাবা-মা থাকি। আমাদের ঘর বলতে একটা টিনের আরেকটা ছনের ঘর। আমাদের বাড়িতে বিদ্যুতের কোনও সংযোগ ছিলও না। যার কারণে খেলা দেখতে হলে আমাদের ১ কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে দেখতে হতো।

পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের একটা টি-টোয়েন্টি ম্যাচ দেখতে ভাই-মামারাসহ একটা দলবল গেছিলাম পাশের এলাকাতে। সে ম্যাচে মুস্তাফিজুর রহমানের অভিষেক হয়। তখন উনি অনেক হ্যাংলা-পাতলা ছিলেন। তাকে দেখে আমার মামা-ভাই বলে, মুস্তাফিজ যদি খেলতে পারে তুইও পারবি শরীফুল।

তখন আসলে আমি টেপ টেনিস বলে প্রচুর খেলে বেড়াই। পড়াশোনার চেয়েও ক্রিকেটে বেশি মন আমার। তারপর মামা বাসায় আমার বাবা-মা’কে রাজি করালো। তারপর অনেক কষ্ট করে আমাকে অনুশীলনে দিলো। আসলে অনুশীলনের জন‌্যও অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল। আমার থাকা-খাওয়ার খুব সমস্যা ছিল। টাকা-পয়সার সমস্যা ছিলও শুরু থেকেই। তবে আসলে আমার মামা এবং ভাই, বাবা-মা না থাকলে আমার এখানে আসা সম্ভব ছিল না। তারা যদি সেই সমর্থন আর চেষ্টা না করতো তাহলে তো কিছুই হতো না।

রাইজিংবিডি: আপনার বাবা কৃষিকাজ করতেন। সেই বাবাকে আর্থিক কষ্ট থেকে বাঁচিয়ে, সুখে জীবনযাপন করাচ্ছেন। ছেলে হিসেবে কতটুকু আনন্দ ও তৃপ্তি পান। 

শরীফুল: আমার জানামতে, কোনও সন্তানের সামনে যদি তাঁর বাবা-মা হাসে, তাহলে পৃথিবীতে তাঁর চেয়ে সুখী কিন্তু আর কেউ হয় না। কারণ, বাবা-মা চায় তাঁর ছেলে কিছু করুক; তাঁর বাবা-মাকে খুশি রাখুক। ইনশাল্লাহ, সেটা পেরে আমি খুশি। আলহামদুলিল্লাহ এখন যে অবস্থায় আমি আমার বাবা-মাকে রাখতে পেরেছি, এটা ভেবে আমি আমার আসলে অনেক ভালো লাগে। আসলে আগে অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে আমরা দিন পার করছি। সে হিসেবে এখন আমরা অনেক ভালো আছি। দারিদ্রতা দূর করার আনন্দটাই আমার সবচেয়ে বেশি।

রাইজিংবিডি: আপনার কথায় বোঝা যাচ্ছে পরিবারের প্রতি আপনার বিশেষ কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা ও টান আছে…

শরীফুল: আমি সবসময় চিন্তা করি যে, আগে কোথায় ছিলাম, এখন কোথায় আসছি। আর আরও ভালো করলে কোথায় যাবো।আরও ভালো কিছু করলে জাতীয় দলে খেলতে পারবো। তাহলে খেলার মাধ্যমে হলেও দেশের জন্য কিছু করতে পারবো, নিজের পরিবারের জন‌্য ভালো কিছু করতে পারবো।

রাইজিংবিডি: বাবার স্বপ্ন কি?

শরীফুল: বাবার স্বপ্ন আমি একদিন জাতীয় দলে খেলবো, ইনশাল্লাহ। আর সেই ম্যাচ আমার বাবা দেখতে যাবে স্টেডিয়ামে।

রাইজিংবিডি: আর শরীফুলের স্বপ্ন?

শরীফুল: আমার স্বপ্ন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে একদিন বিশ্বকাপ জিতবো, ইনশাল্লাহ। আর আমার বাবা-মাকে সর্বোচ্চ পরিমাণ হাসিখুশিতে রাখবো।

রাইজিংবিডি: বোলিংয়ে আপনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র কোনটি?

শরীফুল: আমার বোলিংয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সামনে থেকে বল সুইং করানো। এটা ডানহাতি ব‌্যাটসম‌্যানদের ক্ষেত্রে খুব ভালো পারি। আর বাঁহাতিদের জন‌্যও বল ভেতরে ঢুকাতে পারি।

রাইজিংবিডি: এমন একজন ব‌্যাটসম‌্যানের কথা বলেন, যার উইকেট পাওয়ার পর আপনি যদি আর কোনও উইকেট নাও পান কোনও কষ্ট থাকবে না?

শরীফুল: আমার ইচ্ছা আছে বিরাট কোহলির উইকেট নেওয়া। আসলে উনি তো বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। তো ইচ্ছা আছে, ভারতের সাথে কোনও সিরিজ হলে আমি উনাকে ইনসুইংয়ে পরাস্ত করে ব্যাট-প্যাডের মাঝখান দিয়ে বোল্ড করে উইকেট উদযাপন করবো।

রাইজিংবিডি: আপনার সেই স্বপ্ন পূরণ হোক এমনটাই প্রত‌্যাশা থাকল। আপনারা সাফল্য পেলেই সফল হবে বাংলাদেশ।

শরীফুল: ধন্যবাদ।

 

ঢাকা/ইয়াসিন

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়