RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১৪ ১৪২৭ ||  ১১ সফর ১৪৪২

ব্র্যাডম্যানের শেষাংশে শচীনের প্রথম

বোরহান উদ্দিন জাবেদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৩০, ১৪ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
ব্র্যাডম্যানের শেষাংশে শচীনের প্রথম

ক্রিকেটের অনন্ত আক্ষেপের এক গল্পে তার নামটাও যে, সমস্বরে উচ্চারিত হবে তখনও সেটা দূরকল্পনা। নিজের নামের সাথে সাদৃশ্য রেখে ক্রিকেটের বাইশ গজের বিছানায় আক্ষরিক অর্থেই তিনি ছিলেন ডন।

হ্যাঁ, স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্রাডম্যানের কথাই বলছি। ক্রিকেট পরিসংখ্যানের ‘দ্য ডন’। ক্রিকেট লিখিয়েদের গুরু নেভিল কার্ডাস পরিসংখ্যানকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘আস্ত গাধা’ হিসেবে। সেই আস্ত গাধা পরিসংখ্যানও একমাত্র ব্রাডম্যানের কাছে সবিস্তারে পোষ মেনে লুটোপুটি খেয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কবলে ক্যারিয়ারের মধ্যগগণের আটটা বছর তলিয়ে না গেলে যে কি হতো, ভাবতেই ব্রাডম্যানের আদ্যোপান্ত বেরিয়ে আসে।

ডনের শ্রেষ্ঠত্বের এক স্মৃতিচারণায় সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক ওয়াল্টার হেমন্ডের কথা থেকে, ‘ক্রিজে সেট ডনকে থামাতে ফিল্ডিংয়ে রদবদল করে কতবারই উল্টো নিজেই উপহাসের সম্মুখীন হয়েছি। সেটা এমনই যে, মাঠের যে অংশ থেকে ফিল্ডারকে সরিয়ে নিতাম। ডন ঠিক সেই জায়গাগুলো বেছে নিয়ে বলকে সীমানা ছাড়া করতো।’

বেচারা হেমন্ড, ডনের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েছিলেন এভাবে, ‘অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমাকে আরো একবার স্বীকার করে নিতে হয়েছিল যে, তিনি সাধারণ ব্যাটসম্যান স্বত্বার বাইরে একজন— সিম্পলি অ্যা জিনিয়াস।’

ওহ, হ্যাঁ; অনন্ত আক্ষেপের কথা বলতে গিয়ে প্রসঙ্গ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ছি। আসলে ব্রাডম্যান নামটা তো এমনই।

যাঁকে বুঝতে গিয়ে আপনি নিজেই গুলিয়ে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। যেমনটা ব্রাডম্যান নিজেই হয়েছিলেন কেনিংটন ওভালের সেই শেষবেলায়। প্রথম উইকেট পতনের পর প্যাভিলিয়ন ছেড়ে বেরিয়ে আসছেন ব্রাডম্যান। বিশ হাজার দর্শকের গগণবিদারী সুর আর মুহূর্মুহূ করতালিতে মুখরিত দ্য ওভাল।

এই দর্শকের ভালোবাসাই তো ডনকে শেষবার ইংলিশদের ডেরায় টেনে এনেছিল। বয়স হয়ে গিয়েছে ৩৯। শরীরে জেঁকে বসেছে দুর্বলতা নামক দুর্ভিক্ষ। শারীরিক অসুস্থতায় দরুন ডন নিজেই আশা করেননি এই সফরে আসতে পারবেন। কি নিয়তি, ডন এই সফরে না আসলেই তো গড়টা ১০১.৩৯ তে আটকে থাকে! যুদ্ধে বিপর্যস্ত ইংলিশদের জন্য মন কেঁদেছিল ডনের। তাইতো সফরে তাঁকে না দেখার হতাশায় পোড়াতে না চাওয়াতে হাজির হয়েছিলেন ‘ভালোবাসার’ ব্রিটিশ ভূমিতে।

বরাবরের মতো ভালোবাসার কি দারুণ ‘বিনিময়’ হয়েছিল ডন এবং ইংলিশ সমর্থকদের মাঝে। ময়দান পেরিয়ে লড়াইয়ের ক্ষেত্রের কাছাকাছি পৌঁছতেই টুপিখোলা শ্রদ্ধায় ডনকে অভিনন্দন জানিয়েছে ইংলিশ ক্রিকেটাররাও।

ঘড়ির কাঁটায় পাঁচটা বেজে পাঁচ মিনিট। প্রথম ইনিংসে ইংলিশরা ৫২ রানে অলআউট হওয়াতে ম্যাচে ‘ইনভিন্সিবলস’ অজিদের দুইবার ব্যাট না করা একপ্রকার নিশ্চিত! আক্ষরিক অর্থেই ডন শেষবারের মতো পিচে অবস্থান করছেন। দিনের খেলার শেষের চল্লিশ মিনিট।

সেই ম্যাচেরই ডনের সতীর্থ মাত্রই একই বছরের জানুয়ারিতে ভারতের বিপক্ষে অভিষিক্ত নেইল হার্ভি ঘটনাটা বলছিলেন, ‘ডন ব্যাট করতে নেমেছেন, ওদিকে ইংলিশ ‘অখ্যাত’ লেগি এরিক হোলিসও বল করতে প্রস্তুত। উনিশ বছরের এরিক তাঁর ‘হিরোর’ চেয়ে বিশ বছরের ছোট। মাত্রই দ্বিতীয় টেস্ট খেলছেন।’

অখ্যাতই তো! যেখানে ডনের নামের পাশে জ্বলজ্বল করছিল ২৯ টি শতক, ১৩ টি অর্ধশতক। রানসংখ্যা ৬৯৯৬! গড় ১০১.৩৯! 

একান্ন টেস্টের ৭৯ ইনিংসে উইকেট খুইয়েছেন ৬৯ বার। শেষ ইনিংসটা এমনভাবে মঞ্চায়িত— ৭০তম বার বোলারের শিকারে পরিণত হলে ১০০ গড়ের জন্য চাই চারটে রান।

ক্রিকেটের জগতে তখনও পরতে পরতে পরিসংখ্যানের হিসেবে ঢুকেনি। তাই এমন সহজ হিসেবটাও কারো মাথায়ই আসেনি! নেইল হার্ভি পরবর্তীতে সেটাকে বলছিলেন, ‘টিভি সম্প্রচার এবং পরিসংখ্যানের এই ঝাঁঝালো খেলা তখন কল্পনাতীত। এই যে চার রানের অমীমাংসিত হিসেব; না আমাদের, না সংবাদমাধ্যমের লোকেদের কেউই জানতাম না। আমরা শুধু জানতাম ডন জীবনের শেষ ইনিংসটা খেলতে নামছেন এবং শূন্য রানে আউট হয়েছেন।’

জানতেন না বলেই কি-না লিডসের সেই জয়সূচক চার রান নিয়ে আজও নিজেকে ‘অপরাধী’ ভাবেন হার্ভি। অপরাধী ভাবেন এইজন্য যে, লিডসে হার্ভি যখন চার মেরে অজিদের ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করেছেন। অপরপ্রান্তে ছিলেন ব্রাডম্যান। এতবছর পরেও হার্ভিকে সেই আক্ষেপ তাড়া করে; কেনো শেষ চারটে রানের শটটা ডনকে মারার সুযোগ দিলেন না। তাহলেই তো ডনের গড় ১০০ থাকে!

খেলার মাঠে ফেরা যাক। এরিক হোলিসের প্রথম বল থেকে কোন রান হয় না। সিলি মিড-অফে জেন্টেল পুশ সেই বল ফিল্ডারের হাত ঘুরে ফেরত আসে হোলিসের কাছে। পরবর্তীতে ডন জানিয়েছিলেন, ইংলিশদের অভিবাদনে এতটাই আবেগাপ্লুত ছিলেন যে, তিনি আজও বুঝে উঠতে পারেন না বলটা আদৌ চোখে দেখেছিলেন কিনা!

অস্ট্রেলিয়া ১ উইকেটে ১১৭। দ্বিতীয় বলটার আগে ক্লোজিং ফিল্ডারদের অবস্থানটা জেনে নেয়া যাক— স্লিপে দুইজন, একজন সিলি মিড-অফ, ফরওয়ার্ড শর্ট লেগে একজন। হোলিসের স্লো পিচআপ গুগলিটা বুঝতে গুলিয়ে ফেলেছিলেন ডন। ফ্রন্টফুটে খেলতে গেলে বল আঘাত হানে স্ট্যাপে। একবার— হ্যাঁ, মাত্র একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে ব্যাটটা বগলদাবা করে দ্রুতবেগে প্যাভিলিয়নমুখী হয়ে গেলেন ডন।

অনন্ত আক্ষেপের শূন্য রানের এক গল্পে ব্রাডম্যানের ব্যাটিং গড় থেমে যায় ৯৯.৯৪-এ। সাতহাজার রান থেকে ওই চার রানের দূরত্বে থেমে যান ক্রিকেটের দ্য ডন।
দর্শকের সাদাচোখে আপাদমস্তক নিরীহ গুগলিটাকেই ডন বর্ণনা করেছিলেন, ‘তাঁকে বোকা বানানোর মতোই ডেলিভারি ছিল সেটা। কৃতিত্ব পুরোটাই এরিক হোলিসের!’ যদিও সেটাতে দ্বিমত করেছেন অনেকেই। এটা চোখে পড়তেই ভাবছিলাম— রোমান্টিসিজমের শেষাংশের কোন দৃশ্যে ভেজা চোখজোড়া আর আবেগের মোলায়েমে প্রেমিক-প্রেমিকা বোধহয় এভাবেই নিজেদের আত্মপ্রকাশ ঘটায়!

প্রতিটি ইনিংসে, প্রতিটি বলে মনঃসংযোগের অপরূপ সৌন্দর্য লিখতেন ডন। তাইতো আজকে এতো বছর পরেও জীবনের শেষ ইনিংসে মাত্র দ্বিতীয় বলে ওভাবে বোল্ড হওয়া নিয়ে বিশ্লেষণের ঝুপড়ি খুলে বসেন বিশ্লেষকরা। ডনের মনঃসংযোগ নিয়ে নেভিল কার্ডাস কি দারুণভাবেই না বলেছিলেন, ‘এ্যভরি বল ওয়াজ ফর দ্য ফার্স্ট বল...হি অল্টারড দ্য কারেন্সি অফ ক্রিকেট।’ বিখ্যাত ইংলিশ ক্রিকেটার সিবি ফ্রাই আরেকধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘ডনের পরিপূর্ণতার অর্ধেকই মনঃসংযোগের পরম একাগ্রতায় তৈরি হয়েছে।’

ডনের শেষ ইনিংসের শিকারী হবেন বলেই কিনা সেই সিরিজের দলে এরিক হোলিসের অমন আগমন ঘটেছিল! নাহলে এই ম্যাচটা কেনো সিরিজই তো খেলার কথা ছিল না এরিক হোলিসের! ইংল্যান্ড দল ডাক পাওয়ার পর এরিকের প্রথম অভিব্যক্তি ছিল, ‘আমি বরং ওয়ারউইকশায়ারের বাকি ম্যাচগুলোই খেলতে চাই।’
‘দ্য স্টোরি অফ ওয়ারউইকশায়ার ক্রিকেট’ নামক নিজের বইয়ে এরিক হোলিসকে উদ্ধৃত করে এমনটাই লিখেছিলেন লেসলি ডাকওয়ার্থ। ওয়ারউইকশায়ার কমিটি তাঁদের ঘরের ছেলেকে অনুমতি দিয়েছিল সিরিজটা খেলতে। নাহলে হয়তো এই ইতিহাস গুলোই অন্যভাবে লেখা হতো!

ক্রিকেট রকমারি খাবারের পসরা সাজিয়ে অপেক্ষায় থাকা একটা ডাইনিং টেবিল। যেখানে উপভোগে প্রতি মুহূর্তে আপনি আন্দোলিত হতে বাধ্য। অনিশ্চয়তায় ভরপুর বলেই তো খেলাটা এতটা উপভোগ্য। সেই অনিশ্চয়তার কাকতালটা লক্ষ্য করুন— ডন যখন লন্ডন শহরের দ্য ওভালে এহেন আক্ষেপের ছবি আঁকছিলেন। এই ইংল্যান্ডেরই আরেক শহর ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে ক্রিকেট রূপকথার একশো সেঞ্চুরির প্রথমটাতে গাঁথুনি দিচ্ছিলেন শচীন রমেশ টেন্ডুলকার। সেই গাঁথুনিতে দলকে হার থেকে উদ্ধারে লড়ছিলেন ক্রিকেট রূপকথার আরেক রাজকুমার শচীন টেন্ডুলকার। ডন স্বমহিমায় সেদিন যে অভিবাদনটা প্রথমেই পেয়ে গিয়েছিলেন। শচীন সেটা আদায় করে নিয়েছিলেন ওই স্বমহিমায়। তবে প্রথমে নয়। ম্যাচের শেষে।

একজনের যেখানটায় শেষ হচ্ছে; ক্রিকেটে একশো সেঞ্চুরির অভিমুখে আরেকজনের যাত্রাটা সেখান থেকেই। শুধু শহরটা ভিন্ন। ক্রিকেট মাঝেমাঝে এমনই অবাক বিস্ময়ে বিমোহিত করে। ১৯৪৮—১৯৯০ সালের মাঝে ৪২ বছরের ফারাক থাকলেও দিনটা মিলে হয়েছিল একাকার, ১৪ই আগস্ট! 

শচীনের একশো-শতকের রোমাঞ্চ শুরুর দিনটায় ক্রিকেট ডনকে ‘উপহার’ দিয়েছিল শূন্য। অথচ লন্ডন শহরের এই ওভাল মাঠটা হাতের তালুর মতোই চেনা ডনের। এখানেই আগের তিনটে ইনিংসে ডনের স্কোর ছিল, ২২৪, ২৩২, ৭৭। সেই সিরিজেই সারের বিপক্ষে এখানে খেলেছিলেন ১৪৬ এবং ১২৮ রানে দুটো ইনিংস। এই ৩৯-এ এসেও ইংলিশদের দুমড়েমুচড়ে দেওয়া সিরিজে সমানতালে রান করেছেন। করেছেন দুটো সেঞ্চুরিও। লিডসে আগের টেস্টে আর্থার মরিসের সঙ্গে দুর্দান্ত জুটিতে ‘ইনভিন্সিবলস অস্ট্রেলিয়ার’ রূপকার তো এই ব্রাডম্যানই। ক্রিকেট খেলাটা এমনই। কোন ব্যাকরণের ধার ধারে না। ডনের বেলায়ও ধারেনি!

ঢাকা/কামরুল

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়