RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২১ ||  মাঘ ১৪ ১৪২৭ ||  ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বাদল রায়, একজন কিংবদন্তির গল্প

ক্রীড়া প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:০১, ২৩ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৫:০৩, ২৩ নভেম্বর ২০২০
বাদল রায়, একজন কিংবদন্তির গল্প

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারশনের (বাফুফে) সর্বশেষ নির্বাচনের ব্যালটে সভাপতি পদপ্রার্থী হিসেবে শোভা পাচ্ছিল বাদল রায়ের নাম। কিন্তু স্বশরীরে নির্বাচনী কার্যক্রম কিংবা ভোটের দিনেও উপস্থিত থাকা সম্ভব হয়নি এই কিংবদন্তির। ঠিক একইভাবে হাজার ভক্তের হৃদয়ে নিজের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেই ৬৩ বছর বয়সে বিদায় নিলেন রক্ত-মাংসের সেই বাদল রায়, একজন সত্যিকারের কিংবদন্তি।

১৯৫৭ সালের ৪ জুলাই কুমিল্লার দাউদকান্দিতে জন্ম এই কিংবদন্তির। নিজ এলাকায় ফুটবলের হাতেখড়ি হয় তার। পড়ালেখার পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক ফুটবলে দারুণ পারফরম্যান্সে জনপ্রিয় হতে থাকেন লিকলিকে শরীরের বাদল। আঞ্চলিক টুর্নামেন্টে বিভিন্ন দলের হয়ে নিয়মিত খেলার ডাক পেতেন সদ্য কলেজে যোগ দেওয়া এই ফুটবলার।

ক্লাব ফুটবলের অভিজ্ঞতাও হয়ে যায় দ্রুতই। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৭৪ সালে কুমিল্লা দ্বিতীয় বিভাগ ফুটবল লিগে সিএন্ডবি’র হয়ে যাত্রা শুরু। এরপরের বছর সুযোগ মেলে ইয়ংম্যান স্পোর্টিংয়ের হয়ে। তবে তখনও দ্বিতীয় বিভাগে খেলতেন। পরের বছর অবশেষে প্রথম বিভাগ ফুটবলেও নাম লেখান। আর বাদলকে সেই সুযোগ দেন ইয়ংম্যান সোসাইটি। আর এই দলের হয়ে খেলতে গিয়ে সাদা কালো জার্সিধারী মোহামেডানের হয়ে খেলার সুযোগ মেলে এই ফুটবলারের।

১৯৭৬ সালে মোহামেডানের ফুটবলাররা প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে কুমিল্লায় যান। আর সেখানে প্রতিপক্ষ দলের হয়ে আলো ছড়িয়ে মোহামেডানে আসার সুযোগ করে রাখেন নিজেই। পরের বছরে কুমিল্লা ছেড়ে বাদল রায়ের ঠিকানা হয় ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ফুটবল ক্লাব মোহামেডানে।

সেই পথচলা চলে পরের ১৩ বছর। মোহামেডানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়েন বাদল রায়। ১৯৭৭ সালে আগা খান গোল্ডকাপে ফুটবলে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে মোহামেডানের জার্সিতে নামেন ১ম ম্যাচ খেলতে। থামেন ১৯৮৯ সালে। এর মাঝে সাদা কালো জার্সিধারীদের হয়ে অধিনায়কত্বও করেছেন। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত মোহামেডানকে নেতৃত্ব দিয়ে জিতিয়েছেন লিগ শিরোপা। এছাড়াও খেলোয়াড় হিসেবে মোহামেডানের জার্সিতে জিতেছেন ছয়টি শিরোপা। ক্যারিয়ারের শুরুতে স্ট্রাইকার হিসেবে খেললেও পরবর্তীতে হয়ে যান অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। তবে গোল করার অভ্যাস ঠিকই ধরে রেখেছিলেন তিনি।

বিশেষ করে চির প্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনীর জালে বল জড়াতে বেশ পটু ছিলেন বাদল রায়। এক যুগেরও বেশি ক্যারিয়ারে আবাহনীর বিপক্ষে ভিন্ন পাঁচ ম্যাচে করেছেন পাঁচ গোল। আর বাদলের গোল মানে দলের জয়। আবাহনীর বিপক্ষে ওই পাঁচ ম্যাচের মধ্যে মাত্র ১টিতে হেরেছে মোহামেডান।

বাদলের গোল মানে দলের জয়, জাতীয় দলের ক্ষেত্রেও কথাটি ছিল দারুণ সত্য। জাতীয় দলেও অ্যাটাকিং মিডফিল্ডে খেলা বাদল করিয়েছেন অনেক গোল। কিন্তু যখনই গোল করেছেন, জয় দেখেছে জাতীয় দল। ১৯৮২ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে তার গোলেই মালয়েশিয়াকে হারিয়ে ১ম জয় পায় বাংলাদেশ। ১৯৮৬ সালে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ সাদা দলের। প্রেসিডেন্টস গোল্ড কাপ নামে এই টুর্নামেন্টে তার নেতৃত্বে এই ‘প্রায় মোহামেডান’ দলটিকে সেমিফাইনালে তোলেন অধিনায়ক বাদল।

ক্যারিয়ারে নিজের পারফরম্যান্সে নিজেকে নিয়ে যান কিংবদন্তিদের কাতারে। মাঠ ছাড়ার পরেও সংগঠক হিসেবে ফুটবলের সঙ্গেই ছিলেন। ক্যারিয়ারে যেমন মোহামেডানকে আঁকড়ে ধরেছিলেন, ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও সাদা কালোদের শিবিরে ছিলেন। ক্লাবটির ম্যানেজার থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদেই ছিলেন লম্বা সময় ধরে। বাফুফের সহসভাপতি পদও রাঙিয়েছিলেন।

বিদায়বেলায় শরীরটা বড্ড কষ্ট দিয়েছে এই কিংবদন্তি ফুটবলারকে। ২০১৭ সালে ব্রেন স্ট্রোক দিয়ে শুরু। এরপর চলতি বছরের শুরুতে আবারও করেন স্ট্রোক। সেখান থেকে শরীর চলতে শুরু করতে করোনার আক্রমণ। এরপর চতুর্থ স্তরের লিভার ক্যান্সার ধরা পড়ে। শরীরের সঙ্গে না পেরে প্রাণের সংগঠন বাফুফের নির্বাচনে থাকতে পারেননি, থাকতে পারেননি পৃথিবীর বুকেও।

তবে যেখানে থাকুন না কেন, বাদল রায়ের সকল ভক্ত সমর্থকরা চাইবেন, ভালো থাকুক এই কিংবদন্তি। একই চাওয়া বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়ারও। তাই তো কাতারে থেকেও শোকার্ত জামাল জানিয়েছেন, ‘জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ফুটবলার এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক সহ-সভাপতি বাদল রায়ের মৃত্যুর খবর কাতারে আমাদের জন্য অনেক বড় হৃদয় বিদারক ঘটনা হিসেবে এসেছে। দেশ বাসীর মতো আমিও অনেক মর্মাহত ও দুঃখিত। ভালো থাকবেন কিংবদন্তি।’

ঢাকা/কামরুল

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়