Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ১৭ অক্টোবর ২০২১ ||  কার্তিক ১ ১৪২৮ ||  ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

‘আর্ট অব ফাস্ট বোলিং, ডিসিপ্লিনড’ ও একজন আগ্রাসী লিলি

রাব্বি খান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:২৬, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১  
‘আর্ট অব ফাস্ট বোলিং, ডিসিপ্লিনড’ ও একজন আগ্রাসী লিলি

গতি, নিখুঁত বোলিং আর সঙ্গে উইকেট পাওয়ার তৃষ্ণা; এই বৈশিষ্ট্যগুলো দিয়ে এক যুগ রাজ করেছেন পুরো ক্রিকেট দুনিয়ায়।  

বিংশ শতাব্দির শেষভাগে ব্যাটারদের বুকে কাঁপন ধরানো এক নাম ছিলেন ডেনিস কিথ লিলি। যতদিন খেলেছেন, ততদিন বিশ্বসেরা হয়েই খেলেছেন। নিখুঁত বোলিং করাটাই ছিল তার একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। এমনকি নিজের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারে নেই তার কোনো নো-বল করার রেকর্ড। ‘স্থায়িত্ব, ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা ও ভীতিজাগানিয়া’ অনুভূতি ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনন্য ছিলেন মার্শাল, কপিল, ওয়াসিম, ওয়াকার, অ্যামব্রোস, স্টেইন, রবার্টস, হোল্ডিং, ম্যাকগ্রা, ডোনাল্ড ও গার্নাররা। তবে সহজাত হিংস্রতার কারণে এদের সবার চেয়েই সেরা ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান এই ফাস্ট বোলার ডেনিস কিথ লিলি।

১৮ জুলাই, ১৯৪৯ সালে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার সুবিয়াকো এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ও বিখ্যাত আন্তর্জাতিক এই ক্রিকেট তারকা। তিনি তার সময়ের অসাধারণ ফাস্ট বোলাররূপে বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে পরিচিত হয়ে আছেন।

'লিলি' নামটা মনে এলেই স্বাভাবিকভাবেই ক্রিকেটপ্রেমীদের কয়েকটি দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠারই কথা। দৃপ্ত পদক্ষেপে নিজের বোলিং মার্কের দিকে হেঁটে যেতেন তিনি। ফুল স্লিভ শার্ট, কনুই অব্দি গোটানো থাকত সর্বদা। জামার উপরে বেশ কয়েকটা বোতাম খোলা রাখতে পচ্ছন্দ করতেন তিনি। তার হাঁটার ছন্দে বুকের ওপর দুলতে থাকত তার সেই বিখ্যাত চেইন ‘রুপালি ক্রস’।

এক মাথা লম্বা চুল, ষোল-সতেরো স্টেপের রান আপ। পেটের কাছে ডান হাতে বল নিয়ে আর বাঁ হাত দিয়ে সেটিকে ঢেকে বল করার উদ্দেশ্যে দৌড় শুরু করতেন। দেখে মনে হতো যেন ঈগল আকাশে ডানা মেলে দিয়েছে কিংবা সিংহ চলেছে নিজের শিকারের সন্ধানে। ক্রিজের কাছে আসার একটু আগে ডান হাত দুলতে থাকত ঊরুর পাশে; দেখে যেন মনে হতো পরিবেশ থেকে শক্তি সংগ্রহ করছেন। ক্রিজের একটু পেছন থেকে বিশাল এক লাফ দিয়ে শরীরকে বাতাসে ভাসিয়ে বল ধরা হাতটা উঠাতেন মাথার কিছুটা উপরে। ক্রিজের উপর বাঁ পায়ের সঙ্গেই চাবুক ছোড়ার মতো নামাতেন তার ডান হাতটি। ব্যাটারদের দিকে তার ছোড়া বল ধেয়ে চলত দুর্বার গতিতে। সেই সঙ্গে তার শরীরও এগিয়ে চলত সামনের দিকে, প্রায় আগ্রাসী ভঙ্গিমা নিয়ে ব্যাটারদের ক্রিজের সামনে।

তিনি যখন বোলিং করতেন; স্লিপে পাঁচ থেকে ছয়জন ফিল্ডার গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। অন্তত পিচ যতটা লম্বা উইকেটের পেছনে, ততটাই দূরে দাঁড়িয়ে থাকতেন উইকেটরক্ষক। দৃশ্যটা সত্যিই যে কোনো ফাস্ট বোলারের জন্য আদর্শ।

কী ছিল না লিলির মধ্যে? পেস, দুর্দান্ত বলের গতি, ব্যাটারদের নাকের সামনে দিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে বেরিয়ে যাওয়া বাউন্সার। একজন বোলারের সাধারণত গতি আর নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে খুঁজে পাওয়াটা বেশ অসম্ভবই বটে। কিন্তু এখানেও লিলি উজ্জ্বল এবং ব্যতিক্রম। শুধু অসাধারণ নিয়ন্ত্রণই নয়, সেই সঙ্গে তার বলে ছিল মারাত্মক কাজও। সুইং এবং কাট, উইকেটের দুই দিকেই। তার আউট সুইং বা লেগ কাটারের প্রমাণ হিসেবে ক্রিকেট রেকর্ডে পাবেন ৯৫ বার ‘কট মার্শ বল লিলি’ (বিশ্বরেকর্ড) বা ২২ বার ‘কট গ্রেগ (চ্যাপেল) বল লিলি’। তাছাড়াও ইন সুইং বা অফ কাটারের ওপর দক্ষতার নিদর্শন স্বরুপ রয়েছে ৬২ বার এলবিডাব্লিউ আর ৫৪ বার বোল্ড করে উইকেট দখল করার রেকর্ড।

পেস বোলারদের দুনিয়ার রোলস রয়েসখ্যাত মাইকেল হোল্ডিং বলেছিলেন, ‘লিলির মধ্যে সব ছিল ছন্দ, আগ্রাসন, নিয়ন্ত্রণ। শুরুর দিকে দারুণ গতিতে বল করত।’

কিন্তু পরে পিঠের ব্যথার জন্য বোলিং অ্যাকশন সম্পূর্ণ বদলে নেন। ছন্দ কিছুটা হারালেও ব্যাটারদের আউট করার নানা উপায় বের করেছিলেন তিনি। কেউ যখন এভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন, তাকে তো সেরাদের তালিকায় রাখতেই হবে। অনেকেই এই রকম পরিস্থিতিতে নিজের সেরাটা দিতে পারেন না। ক্যারিয়ার শুরু হওয়ার কিছুদিন পরেই স্পাইনের আঘাতে দেড় বছরের জন্যে মাঠের বাইরে যেতে হয় তাকে। একসময় সবাই ভেবেই নিয়েছিল তার পক্ষে আর ক্রিকেটে ফেরা কখনোই সম্ভব হবে না। কিন্তু অসাধারণ মনের জোর আর পরিশ্রমের মাধ্যমে লিলি শুধু ফিরেই আসেননি, ফিরে আসেন আরও পরিপূর্ণ  বোলার হয়ে।

তাছাড়াও লিলি কোনোদিন তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারে নো বল করেননি। ছিলেন সবচেয়ে ‘ডিসিপ্লিনড’ ফাস্ট বোলার। যদিও অনেক কম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। ৭০ টেস্ট আর ৬৩ ওয়ানডেতেই সীমাবদ্ধ তার ক্যারিয়ার। ৩৫৫ টেস্ট উইকেটের সঙ্গে নিয়েছেন ১০৩ ওয়ানডে উইকেট।

১৯৭১-এ অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেকের পর খেলেছেন টানা ১৩ বছর। অভিষেকেই নিয়েছিলেন ৮৪ রান খরচায় ৫ উইকেট। সিডনিতে শেষ টেস্টে ৮ উইকেট। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের শেষ বলে উইকেট পেয়েছিলেন।

ক্যারিবিয়ান পেস ব্যাটারির বিরুদ্ধে সফলতম ভারতীয় ব্যাটার সুনীল গাভাস্কার লিলির বিরুদ্ধে রান করতে পারেননি। ভিভ রিচার্ডস থাকতেন আশঙ্কায়। আশির দশকে লিলি-ভিভের দ্বৈরথ ছিল ক্রিকেটের সেরা আকর্ষণ। ১৯৭৫-এ তাদের প্রথম দেখা। সেই অস্ট্রেলিয়া সফরে ৫-১-এ হেরেছিল উইন্ডিজ। লিলি নিয়েছিলেন ২৭ উইকেট। ২৩ বছরের তরুণ ভিভকে ৫ বার আউট করেছিলেন।

অনেকে বলেন, ১৯৭৭ সালের ক্যারি প্যাকার সিরিজের জনপ্রিয়তার মূলে ছিল লিলি-ভিভের লড়াই। সেই সিরিজে ৮ বার ভিভকে আউট করেন লিলি। তবে বারবার কিন্তু ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি হারেননি। ১৯৭৯-৮০ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২-১-এ সিরিজ জিতেছিল উইন্ডিজ। সেই সিরিজে ৯৬.৫০ গড়ে ৩৮৬ রান করেছিলেন ভিভ। মাত্র ২ বার লিলি তাকে আউট করতে পেরেছিলেন।

তবে লিলি সেই পরাজয়ের শোধ তোলেন একাশির বক্সিং ডে টেস্টে। মেলবোর্নে তিনি প্রথম ইনিংসে ২ রানে ভিভকে বোল্ড করেন। ৮৩ রানে ৭ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচে ফিরিয়েছিলেন লিলি। তার অসামান্য বোলিং নৈপুণ্যে ৫৮ রানে সেই টেস্ট জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া। টেস্টে মোট ৯ বার ভিভকে আউট করেন লিলি। আর কোনো বোলারের কিং ভিভের বিরুদ্ধে এমন সাফল্য নেই। হয়তো সে কারণেই ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি বলেছেন, ‘একমাত্র লিলিই আমার রাতের ঘুম কাড়তে পেরেছিল।’

সেই সঙ্গে তার ছিল ফাস্ট বোলার সুলভ মেজাজ আর দম্ভও। ক্রিকেট মাঠে বারবার বিতর্কে জড়িয়েছেন লিলি তার মেজাজের জন্যে। কখনও জাভেদ মিয়াঁদাদকে লাথি মেরে, কখনও অ্যালুমিনিয়াম ছুড়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে, কখনও বা সুনীল গাভাস্কারের প্যাডে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে যে কেন তিনি এলবিডাব্লিউ আউট ছিলেন।

একটা সময় তাকে ‘আর্ট অব ফাস্ট বোলিং’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। এমনকি ভারতে তাকে নিয়ে একটি বইও লেখা হয় 'আর্ট অব ফাস্ট বোলিং নামে'। সে বইকে বলা হতো ফাস্ট বোলারদের বাইবেল। একবার ভাবুন তো, কেনই বা তাকে নিয়ে বই লেখা হবে না; কেনই বা তাকে বলা হবে না 'আর্ট অব ফাস্ট বোলিং'! কেন না তিনি সারা দুনিয়ার উঠতি পেসারদের জন্য যে এক আদর্শ ফাস্ট বোলার, হয়ে থাকবেন চিরকাল।

ঢাকা/ফাহিম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়