ঢাকা     সোমবার   ২৮ নভেম্বর ২০২২ ||  অগ্রহায়ণ ১৪ ১৪২৯ ||  ০৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪১৪

অভিশপ্ত বেঙ্গালুরু, দিল্লিতে শাসন ও কলম্বোর ‘নাগিন’ মুশফিক

ক্রীড়া প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:৫০, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২২  
অভিশপ্ত বেঙ্গালুরু, দিল্লিতে শাসন ও কলম্বোর ‘নাগিন’ মুশফিক

দিনটি ছিল শুধুই মুশফিকুর রহিমের। প্রতিপক্ষের মাঠে গিয়ে তাদের স্রেফ এলোমেলো করে দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। প্রতিপক্ষ যখন আবার ভারত, আর খেলাটা ভারতের প্রাণকেন্দ্র দিল্লিতে, তখন কে ফেভারিট সেটা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু বাংলাদেশ শিবিরে ছিলেন এমন একজন, যিনি সেদিন টিম ইন্ডিয়ার দিল্লির সাম্রাজ্যের পতন ঘটান। 

যুদ্ধের আবহ ছিল না। ছিল না ঢাল-তলোয়ার। দিল্লির বাতাস ছিল দূষিত। কন্ডিশন একেবারে অচেনা। কিন্তু ২২ গজের মঞ্চে মুশফিকের ব‌্যাটে সেদিন ভারত জয় করেছিল বাংলাদেশ। ৪৩ বলে ৬০ রানের অপরাজিত এক ইনিংসে তিনি ভারতের দেওয়া ১৪৯ রানের লক্ষ‌্য ছুঁয়ে ফেলেন।

পরের দিন সারা ভারতবর্ষের খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন মুশফিক। আনন্দবাজার পত্রিকা শিরোনাম করেছিল এভাবে, ‘ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম টি-টোয়েন্টি জয়ে নায়ক মুশফিকুর রহিম।’ বর্তমান পত্রিকা শিরোনাম করে, ‘মুশফিকুরের কাছে হার মানলো টিম ইন্ডিয়া’। ভারতের জনপ্রিয় গণমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া মুশফিককে টেনে শিরোনাম করেছে, ‘মুশফিকুর রহিম ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশকে প্রথম টি-টোয়েন্টি জয় এনে দিলেন।’ 

২০১৮ সালের ৩ নভেম্বর দ্বিপক্ষীয় সিরিজে মুশফিক ভারতকে হারানোর মহানায়ক হলেও এর ২ বছর ৭ মাস ১১ দিন আগে বেঙ্গালুরুতে তিনি ছিলেন খলনায়ক। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মঞ্চে ভারতকে হারানোর সূবর্ণ সুযোগ মুশফিক নষ্ট করেন নিজের ভুলে। শুধু তিনিই নয়, ওই পরাজয়ে মাহমুদউল্লাহও ছিলেন সমান দোষে ‘দোষী’। বেঙ্গালুরুতে অভিশপ্ত সেই ম‌্যাচে বাংলাদেশ হেরে যায় মাত্র ১ রানে। 

দিল্লি জয়ে ‘দুই ভায়রা’ সেই অপ্রাপ্তির দায়মোচন করেছিলেন। কিন্তু বেঙ্গালুরুর ওই পরাজয় তার চিরকালের আক্ষেপ হয়ে থাকবে আজীবন। দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে মুশফিক বলেছিলেন, ‘মানুষ ভুল করে এবং সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াটা হচ্ছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। বিশ্বকাপের ম্যাচের সঙ্গে আসলে অন্য কোনও দ্বিপক্ষীয় সিরিজের তুলনা চলে না। সেই আক্ষেপ কখনও যাবে না, আমি আগেও বলেছি জীবনে যদি কোনও একটা ম্যাচে ফিরে যেতে চাই, তাহলে সেটা হবে বেঙ্গালুরুর সেই ম্যাচ।’ 

আনুষ্ঠানিকভাবে মুশফিক আজ আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক‌্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন বলেই বেঙ্গালুরু ও দিল্লির স্মৃতি ফিরে এলো। এক যুগেরও বেশি সময় এই ফরম‌্যাটে খেলা মুশফিকের ক‌্যারিয়ারের হাইলাইটস আর কী হতে পারে? ২০১৮ সালে নিহাদাস ট্রফিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম‌্যাচ ও তার নাগিন ড‌্যান্স উল্লেখযোগ‌্য। ওই বছর শ্রীলঙ্কায় আয়োজিত নিদাহাস ট্রফিতে ফাইনাল খেলেছিল বাংলাদেশ। মাঠে ও মাঠের বাইরে নানা ইস্যুতে টুর্নামেন্ট জমিয়ে তুলেছিল বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কাকে দুইবার হারিয়ে বাংলাদেশ উঠেছিল ফাইনালে। স্বাগতিকদের দুইবার হারানোর নায়ক ছিলেন ‘দুই ভায়রা’ মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ।

কলম্বোতে প্রতিযোগিতার তৃতীয় ম‌্যাচে শ্রীলঙ্কার দেওয়া ২১৫ রানের লক্ষ‌্য বাংলাদেশ ছুঁয়ে ফেলে ৫ উইকেট হাতে রেখে। যা সম্ভব হয়েছিল মুশফিকের নায়কোচিত ইনিংসে। ৩৫ বলে তার ৭২ রানের অপরাজিত ইনিংসে বিজয়ের কেতন উড়ায় বাংলাদেশ। ইনিংসের শেষ ওভারে পেরেরার বলে জয়সূচক রান নিয়ে মুশফিকের ‘নাগিন ড‌্যান্স’ ট্রেডমার্কে রূপ নেয়। এর কিছুদিন পর মাহমুদউল্লাহর শেষ ওভারের ছক্কায় বাংলাদেশ উঠে যায় প্রতিযোগিতার ফাইনালে। এবার মুশফিকের সেই নাগিন ড‌্যান্স হয়ে ওঠে বাংলাদেশের ট্রেডমার্ক। 

ভারতের কাছে শিরোপা হারালেও মুশফিকের সেই বীরোচিত ইনিংসের চর্চা হয়েছে দীর্ঘসময়। যা ইতিহাসের অক্ষয় কালিতে লেখা থাকবে অজীবন। মুশফিক অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর নিজের প্রথম ম‌্যাচও জয়ে রাঙিয়েছেন ঠিক এভাবেই। ২০১১ সালে ঢাকায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি দিয়ে তার অধিনায়কত্বের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের দেওয়া ১৩৩ রানের লক্ষ্য তাড়ায় সাকিব, তামিম, আশরাফুল, অলকরা যখন ব‌্যর্থ তখন মুশফিক ২৬ বলে ৪১ রান করে দলকে জেতান। শেষ ওভারে নানা নাটকীয়তার পর শেষ ২ বলে যখন ৪ রান লাগতো, তখন রবি রামপলকে ছক্কা উড়ান মিড উইকেট দিয়ে। অধিনায়কত্বের আগমণী বার্তা ভালো দিলেও পরবর্তীতে সেই ধারাবাহিকতা থাকেনি। ২৩ ম‌্যাচে ৮ জয়ে আটকা তার অধিনায়কত্বের রেকর্ড। 

বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১০২ ম‌্যাচ খেলে মুশফিক এই ফরম‌্যাট থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তবে ক্রিকেটের এই ছোট্ট সংস্করণে তার ক‌্যারিয়ার হাইলাইটস এই চারটি ঘটনায় সীমাবদ্ধ। কালেভদ্রে জ্বলে উঠতেন। বাকিটা সময় নিষ্প্রভ।

ঢাকা/ইয়াসিন/ফাহিম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়