ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৯ জুন ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ২৬ ১৪৩৩ || ২৪ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

প্রত‌্যাবর্তনের গল্প লেখা অনন‌্য মোসাদ্দেকে অস্ট্রেলিয়া বধ

ইয়াসিন হাসান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:২৮, ৯ জুন ২০২৬  
প্রত‌্যাবর্তনের গল্প লেখা অনন‌্য মোসাদ্দেকে অস্ট্রেলিয়া বধ

মোসাদ্দেক হোসেন।

চার বছরের দীর্ঘ বিরতির পর জাতীয় দলের দরজায় আবার কড়া নাড়েন মোসাদ্দেক হোসেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে তার পারফরম্যান্স এতটাই উজ্জ্বল ছিল যে তাকে উপেক্ষা করার সুযোগ ছিল না। ফিরলেন। আর ফিরেই লিখলেন রাজসিক প্রত্যাবর্তনের গল্প।

আরো পড়ুন:

ব্যাটের ঝলক, বলের কারুকাজ আর মাঠজুড়ে প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে তিনি হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের প্রাণভোমরা। তার অলরাউন্ড নৈপুণ্যের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া-বধের রাত। সেই আলোয় ফুটে উঠল হার না মানা এক ক্রিকেটারের ফিরে আসার গল্প।

অস্ট্রেলিয়াকে ওয়ানডেতে দ্বিতীয়বার হারাতে বাংলাদেশের অপেক্ষা করতে হয়েছে ২১ বছর। ২০০৫ সালে কার্ডিফে মোহাম্মদ আশরাফুলের মহাকাব্যিক ইনিংসে এসেছিল প্রথম জয়। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে যা আজও অক্ষয় হয়ে আছে। সেই আশরাফুলই আজ দলের ব্যাটিং কোচ। ২০০৫ থেকে ২০২৬-কত সূর্যোদয়, কত সূর্যাস্তের পর অবশেষে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আবারও নিজেদের শক্তির জানান দিল টাইগাররা।

মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে আগে ব্যাট করে বাংলাদেশ তোলে ৮ উইকেটে ২৮৪ রান। জবাবে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস থেমে যায় অনেক দূরে, ৯ উইকেটে ১৯১। বৃষ্টি আইনে ৮৬ রানে ম‌্যাচ জিতে নেয় বাংলাদেশ। জয়ের ব্যবধান শুধু স্কোরবোর্ডে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের নতুন পথচলার বার্তাও দিয়েছে।

সেই জয়ের রেণু সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছেন মোসাদ্দেক। ৭০ বলে ৭ চার ও ৩ ছক্কায় অপরাজিত ৮৬ রানের ইনিংসে তিনি শুধু দলকে বিপদমুক্ত করেননি, জুগিয়েছেন লড়াইয়ের বড় প্রেরণা। ইনিংসের শেষ পর্যন্ত থেকে স্কোরবোর্ড সচল রেখেছেন অবিরাম। এরপর বল হাতেও ছিলেন সমান কার্যকর। ১০ ওভারে ১ মেডেনসহ ৩৭ রানে নিয়েছেন ২ উইকেট। সঙ্গে ফিল্ডিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ। সব মিলিয়ে দিনটি ছিল একেবারেই মোসাদ্দেকময়।

পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ হেরে বাংলাদেশে আসা অস্ট্রেলিয়ার আত্মবিশ্বাস এমনিতেই টালমাটাল ছিল। তবে মিরপুরের স্পোর্টিং উইকেট তাদের আশা দেখাচ্ছিল। পেস ও স্পিন-দুই বিভাগের জন্যই ছিল সহায়ক পরিবেশ। বল কখনো অস্বাভাবিক আচরণ করেনি, বরং গতি ও সুইংয়ের সুন্দর মিশেল ছিল।

সেই উইকেটকে দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন বাংলাদেশের বোলাররা। বিশেষ করে নাহিদ রানা। গতি আর বাউন্সারে অসি মিডল অর্ডারকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছেন তিনি। ১০ ওভারে ৪১ রানে নিয়েছেন ৪ উইকেট। শুরুটা অবশ্য করেছিলেন তাসকিন আহমেদ। ইনিংসের প্রথম বলেই ম্যাথু শর্টকে বোল্ড করে অস্ট্রেলিয়াকে চাপে ফেলে দেন তিনি। এরপর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আর হাতছাড়া করেনি বাংলাদেশ।

কখনো নাহিদের আগ্রাসনে, কখনো মোসাদ্দেকের নিয়ন্ত্রিত স্পিনে এলোমেলো হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং। পরিকল্পিত বোলিংয়ে সফরকারীদের আটকে রাখার বিকল্প ছিল না।

তবে গল্পের শুরুটা হয়েছিল ব্যাট হাতে। সাইফ হাসান দ্রুত ফেরার পর নাজমুল হোসেন শান্ত ও তানজিদ হাসান গড়ে তোলেন ৯৬ রানের জুটি। দুজনই ফিফটি পেলেও ইনিংস বড় করতে পারেননি। তানজিদ ফেরেন ৫৪, শান্ত ৬৭ রানে। লিটন দাসও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি।

হঠাৎ করেই চাপে পড়ে বাংলাদেশ। সেই সংকট থেকে দলকে টেনে তোলেন তাওহীদ হৃদয় ও মোসাদ্দেক। পঞ্চম উইকেটে তাদের ৭৫ রানের জুটিতে ঘুরে দাঁড়ায় স্বাগতিকরা। এর মধ্যে মোসাদ্দেকের অবদানই ছিল সবচেয়ে বেশি।

২০২২ সালে শেষ ওয়ানডে খেলার পর বাংলাদেশ খেলেছে ৬৩টি ম্যাচ। দীর্ঘ বিরতির পর ফিরেও আত্মবিশ্বাসে একটুও ঘাটতি ছিল না তার। প্রথম বলেই নেন ৩ রান। এরপর অ্যাডাম জাম্পাকে ডাউন দ্য উইকেটে উঠে মারেন ছক্কা। ক্যামেরুন গ্রিনকে এগিয়ে এসে বাউন্ডারি, রেনশকে লং অফ দিয়ে বিশাল ছক্কা-প্রতিটি শটেই ছিল আত্মবিশ্বাসের ছাপ।

রিভার্স সুইপ, পুল, কাট-সব ধরনের শট খেলেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, এখনও অনেক কিছু দেওয়ার আছে। শেষ পর্যন্ত অপরাজিত ৮৬ রানে ইনিংস শেষ করে দর্শকদের অভিবাদন গ্রহণ করেন। সেই ইনিংসেই লেখা হয়ে যায় তার পুনরাগমনের গল্প, আর বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া-বধের নতুন ইতিহাস।

শেষ পর্যন্ত বৃষ্টির আইনেই ম্যাচের ফয়সালা হয়েছে। কিন্তু রাতের সেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি বাংলাদেশের আনন্দে একটুও ভাটা ফেলতে পারেনি। বরং বিজয়ের উল্লাসে ভাসিয়েছে মিরপুরকে।

ঢাকা/ইয়াসিন/সাইফ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়