ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৯ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

দীপাবলি উৎসবে

সুমন্ত গুপ্ত : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-২৭ ৬:০৭:৫৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-২৭ ৬:১৭:২৮ পিএম

কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে সাধারণত শ্যামাপূজা বা কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। হিন্দু পুরাণমতে, কালী দেবী দুর্গারই একটি শক্তি। কালীপূজা হচ্ছে শক্তির পূজা। জগতের সব অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে শুভ শক্তির বিজয়ের মধ্যেই রয়েছে কালীপূজার মূল ভাব।

দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালনের মাধ্যমে ভক্তের জীবনে কল্যাণের অঙ্গীকার নিয়ে পৃথিবীতে আগমন ঘটে দেবী শ্যামার। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে শ্যামা দেবী শান্তি, সংহতি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় সংগ্রামের প্রতীক। এ দিন সন্ধ্যায় পূজামণ্ডপে, বাড়িতে, শ্মশানে প্রদীপ জ্বালানো হয়। এই উৎসব তাই দীপাবলি নামেও পরিচিত। সিলেট শহর থেকে খুব কাছের দূরত্বে চালিবন্দর মহাশ্মশান। প্রতি দীপাবলির প্রাক্কালে অনুষ্ঠিত হয় দীপাবলি উৎসব। হাজার হাজার মানুষ অংশ গ্রহণ করেন এই অনুষ্ঠানে। আমার কোথাও যাওয়া মানেই হলো শুধু পরিকল্পনা আর পরিকল্পনা। তাছাড়া ভ্রমণ নেশা হলেও পেট চালাতে হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। তাই কোথাও যেতে হলে আগে চিন্তা করতে হয় অফিস থেকে ছুটি চাইলে পাবো তো!

অফিসের সবাই জানে আমি ভ্রমণপ্রিয় মানুষ। এরপর কখনো ছুটি পাই, কখনো পাই না। সিলেটের চালিবন্দর  শ্মশানে দীপাবলি উৎসব দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আসছে। বিভিন্ন জায়গা থেক মানুষ আসেন এই উৎসব দেখতে। কিন্তু সময় আর সুযোগের অভাবে যাওয়া হচ্ছিল না। তাই গতবার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম- যত বাঁধা আসুক, দীপাবলি উৎসবে যেতেই হবে। অফিসে আগে থেকে বলে রেখেছিলাম, তাই ছুটি নিয়ে খুব একটা ঝামেলা পোহাতে হয়নি। দীপাবলির অনুষ্ঠান মূলত সূর্যদেব পাটে যাওয়ার পর অনুষ্ঠিত হয়। তাই দুপুর হবার আগেই দ্রুত হাতের কাজ শেষ করে নিলাম। সূর্যদেবের প্রস্থানের পূর্বেই প্রস্তুতি নিয়ে আমি আর মা বের হলাম গন্তব্যপানে। বন্দরবাজার, সোবাহানি ঘাট পেড়িয়ে চললাম এগিয়ে। ঘড়ির কাটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পৌঁছে গেলাম চালিবন্দর মহাশ্মশানের প্রবেশ দ্বারে।

গিয়ে দেখি মঙ্গল প্রদীপের আলোয় আলোকিত চারপাশ। বছরের অন্য সময় অন্ধকার থাকলেও দীপাবলির রাতে আলোকিত হয়ে উঠেছে জায়গাটি। অনেকে এসেছেন পূর্বপুরুষের স্মৃতির উদ্দেশ্যে মঙ্গল আলোক প্রজ্জলন করতে। আমিও মোমবাতি, আগরবাতি কিনে নিলাম। পূর্বপুরুষদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে দিলাম আলোকঞ্জলি। আপনি চাইলে অংশ নিতে পারেন সবার সঙ্গে। যারা ছবি তুলতে ভালোবাসেন তাদের জন্য এটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা হবে। আলো আঁধারের মাঝে তুলতে পারবেন মনের মতো ছবি।

দীপাবলি শব্দের একটি অর্থ প্রদীপের সমষ্টি। এই দিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ঘরে ঘরে ছোট মাটির প্রদীপ জ্বালান। এই প্রদীপ জ্বালানো অমঙ্গল বিতাড়নের প্রতীক। বাড়িঘর পরিষ্কার করে সারা রাত প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখলে ঘরে লক্ষ্মী আসেন বলে উত্তর ভারতীয় হিন্দুরা বিশ্বাস করেন। বাংলার দীপান্বিতা কালীপূজা বিশেষ জনপ্রিয়। তবে এই পূজা প্রাচীন নয়। ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে কাশীনাথ রচিত শ্যামাসপর্যা বিধিগ্রন্থে এই পূজার সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। কথিত আছে, নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় অষ্টাদশ শতকে তাঁর সকল প্রজাকে শাস্তির ভীতিপ্রদর্শন করে কালীপূজা করতে বাধ্য করেন। সেই থেকে নদিয়ায় কালীপূজা বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্রও বহু অর্থব্যয় করে কালীপূজার আয়োজন করতেন। অমঙ্গল বিতাড়নের জন্য আতসবাজিও পোড়ানো হয়। বিশেষত উত্তর ভারতে দীপাবলির সময় নতুন পোশাক পরা, পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণের প্রথাও আছে।

যাই হোক, আমরা পদব্রজে শ্মশান ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। শত শত মানুষের পদচারণায় মুখর এলাকা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন: ‘ঘরে ঘরে ডাক পাঠালো, দীপালিকায় জ্বালাও আলো, জ্বালাও আলো, আপন আলো সাজাও আলোয় ধরিত্রীরে।’ আলো জ্বেলেই যেন আজ উৎসবে মেতেছে পুরো এলাকা। এক পাশে বড় বড় পাতিলে রান্না করা হচ্ছে, আগত দর্শনার্থীদের জন্য খাবার। বেশ মোহনীয় গন্ধ ছড়িয়েছে। অন্ধকারে আলোকবাজি এক অন্যরকম পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

যাবেন কীভাবে: প্রথমে ট্রেন অথবা বাস যোগে পৌঁছাতে হবে সিলেট শহরে। ভাড়া ৩০০ থেকে ১২০০ টাকা। আর সিলেট শহর থেকে খুব কাছেই চালিবন্দর মহাশ্মশান। রিকশা ভাড়া মাত্র ৩০ টাকা রেলস্টেশন অথবা বাস টার্মিনাল থেকে।


ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন