ঢাকা, শুক্রবার, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

আইসল্যান্ড: আটলান্টিক টু গ্রীনল্যান্ড ভায়া আর্কটিক

ফারজানা ব্রাউনিয়া : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-১৪ ৫:৩২:৫৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-১৪ ৫:৩২:৫৮ পিএম

আর্কটিক আর আটলান্টিক সাগরের মাঝে আইসল্যান্ড। বরফে আবৃত এ ভূ-খণ্ড পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকে একেবারেই ভিন্ন। নর্ডিক দ্বীপ রাষ্ট্র আইসল্যান্ডের রাজধানী রেকজাভিক, আইসল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শহর। এক লক্ষ তিন হাজার বর্গ কিলোমিটারে বসবাস করে মাত্র তিন লক্ষ আটচল্লিশ হাজার পাঁচশ আশিজন। জুন, জুলাই মাসে এ ভূ-খণ্ডে সূর্য ডোবে না।

বছরজুড়ে বরফে আবৃত থাকলেও জুন, জুলাই, আগস্ট মানেই সবচেয়ে গরম। কিন্তু তা কখনই ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে না। এই সময়টিতেও প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বায়ু প্রবাহ, তুষারপাত কিংবা বরফ বৃষ্টি স্বাভাবিক ঘটনা। মানচিত্রে বহুবার ডান হাতে তর্জনী আইসল্যান্ডের উপরে রাখলেও বাস্তবে আইসল্যান্ড ভ্রমণ এই প্রথম।

আমার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এ দেশটির প্রতি কারণ, দেশটি পৃথিবীর শীর্ষ স্থানীয় নারীবাদী রাষ্ট্রের একটি। ৬৭ শতাংশ অবিবাহিত দম্পতির ঘরে এ দেশের শিশুরা জন্মগ্রহণ করে। পুরো পৃথিবীর মাঝে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক নারী এ ভূ-খণ্ডে শিক্ষিত। আর এ কারণেই মেয়েদের সুন্দরী, আকর্ষণীয়া ইত্যাদি বিশেষণের পরিবর্তে শক্তিশালী, দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী ইত্যাদি বিশেষণ শোনা যায়। বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতায় ‘সৌন্দর্য্য’ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী আইসল্যান্ডিক সুন্দরীকে তার ওজন কমাতে বলায় তিনি প্রতিযোগিতা ত্যাগ করেন। এদেশের মেয়েরা শিশুদেরকে নিজের যোগ্যতায় বড় করে। নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত তারা নিজেরাই গ্রহণ করে।

সদা হাস্যময়ী প্রতিটি মেয়ের দিকে গভীর মনোযোগে দেখছিলাম এয়ারপোর্টের ভিতরেই। আরও লক্ষ্য করলাম এয়ারপোর্টজুড়ে এমিরেটস্, কাতার এয়ারওয়েজ কিংবা অন্যকোনো পরিচিত এয়ারলাইন, এমনকি বাংলাদেশ বিমানও দেখা গেল না। বেশিরভাগ প্লেনের গায়ে লেখা আইসল্যান্ডিক এয়ার, স্যাস, ইজি জেট ইত্যাদি।

মুদ্রা পরিবর্তন করতে গিয়ে দেখলাম আইসল্যান্ডিক এক ক্রোনা বাংলাদেশী টাকায় ১ টাকারও কম। অর্থাৎ, প্রতি ডলারে আমার হাতে চলে এলো প্রায় একশ ক্রোনা। ট্যাক্সি ভাড়া, খাবারের দাম ও অন্যান্য খরচ আন্তর্জাতিক মানেই হবে এ কথা জেনেও নিজেকে হঠাৎ করেই ধনী মনে হচ্ছিল।

এয়ারপোর্ট থেকে বেরুতেই সবগুলো দাঁত আর মুখের ভিতরে রাখা যাচ্ছিল না। আইসল্যান্ড ভ্রমণের স্বপ্ন পূরণের অনুভূতিতে সবগুলো দাঁত বের করে যখন হাসছি ঠিক তখনই প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বাতাসে জ্যাকেটের ভিতরে বরফের দেশের বিশেষ কাপড় থার্মাল পরে থেকেই হাড্ডির মাঝে শীত অনুভব করলাম। ধূসর খোলা আকাশ মুহূর্তেই চোখ ভরে দেখে নিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে বসলাম। ধূসর মেঘগুলোকে খুব নিচে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে ট্যাক্সির উপর দাঁড়ালেই মেঘ ধরা যাবে।

হোটেলে পৌঁছেই রুমে চেকিংয়ের পর জানতে পারলাম রাতের খাবারের সময় আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ। কিন্তু সূর্য এমন সজোরে জেগে থাকলে সেই সময়কে কী করে রাত বলি। কী করে রাতের খাবারের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করি। তবুও ঘড়ি বলছে রাত সাড়ে নয়টা। রাতের খাবারে প্রিয় স্যামোন মাছ সরিয়ে রেখে তুলে নিলাম হোয়েল-মিট অর্থাৎ তিমি মাছের  মাংস। সাথে স্থানীয়ভাবে তৈরী ব্রাউন চিজ এবং ব্লু চিজ খেতে খেতে মনে হচ্ছিল আমি নিশ্চয়ই এই মুহূর্তে পৃথিবীর বাইরে অন্যকোনো পৃথিবীতে। রান্না যতো মজা তার সাজ ততো সুন্দর। বিশেষ করে এই ভূ-খণ্ডের মানুষগুলোকে মনে হচ্ছিল খাঁটি মানুষ। কারও চেহারায় কোথাও দুখের ছাপ নেই, সাজগোজের আধিক্য নেই। সদা হাস্যময় মানুষগুলো সম্পূর্ণ মনোযোগে ভালোবাসা বিলিয়ে দিয়ে কথা বলছিল।

সূর্যের সঙ্গে দীর্ঘতম অভিসারের কথা দিলাম। কখনই তার সঙ্গে একসাথে চব্বিশ ঘণ্টা থাকা হয়নি। এক মুহূর্তের জন্যেও ঘুমের কোলে ঢলে না পড়ে স্বাক্ষী হলাম মধ্যরাতের সূর্যের আলোর। এক মুহূর্তের জন্যেও সূর্যকে ক্লান্ত হতে দেখিনি। রাত সাড়ে তিনটায় হোটেলের সামনে বেরিয়ে ঝলমলে রাতের আলোতে একটা ছবি তুলে নিলাম। পরিকল্পনা অনুযায়ী আর্কটিক সাগর হয়ে গ্রীনল্যান্ড সাগরে পাড়ি জমাবো প্রথম দিনেই। সেখানে দেখা হবে তিমি মাছ, ডলফিন, সি-প্যারোট পাফিন এবং অন্যান্য সমুদ্রের অধিবাসীদের সঙ্গে। আর এ কারণেই ঘুমের খুব একটা সুযোগ পাওয়া গেল না।

দ্বীপরাষ্ট্র আইসল্যান্ডের যে দিকেই যাত্রা করা যাক, নিশ্চিত গন্তব্য সমুদ্র। সকালে ঠিক সময়মতো হোটেল থেকে তুলে নিয়ে সমুদ্র তীরে হাজির করলো বন্ধু চালক ওমর। হোয়েল-ওয়াচিং অর্থাৎ তিমি মাছ পরিদর্শনের যে দল তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল তাদেরই সদস্য ওমর। বিশেষ কাপড় দেয়া হলো আমাদের। যে কাপড়ে সমুদ্রের খুব মাঝামাঝি গিয়েও প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় পুরোপুরি জমে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। পরে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম মাঝারি সাইজের জাহাজটির দিকে।

যেতে যেতেই দলের অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে পরিচিত হলাম। অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছেন ডাক্তার ক্যারেন এবং ডাক্তার রামটিন দম্পতি। তাদের সঙ্গে আছেন আমেরিকা থেকে আইসল্যান্ডে বেড়াতে আসা তাদেরই ছোটবেলার বন্ধু পল। আর বাংলাদেশ থেকে আছি আমরা; আমি ও জেনারেল সারওয়ার্দী।   

আমাদের যাত্রায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন ক্যাপ্টেন হর্দুর; যে কিনা সাহসিকতার জন্য রাষ্ট্র থেকে সর্বোচ্চ বীরের পদক অর্জন করেছেন। মুহূর্তেই দুই দেশপ্রেমিক যোদ্ধার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। জেনারেল সারওয়ার্দীও তার সাহসিকতার জন্য দেশের প্রায় সকল সর্বোচ্চ পদক অর্জন করেছেন। যাত্রা শুরুর আগে চালক বন্ধু ওমর বিদায় নিল। হর্দুরের সঙ্গে গ্রীনল্যান্ড সাগরের দিকে আমরা যাত্রা করলাম। পাহাড়, সাগর আর মেঘের এক অপূর্ব দৃশ্যপট সৃষ্টি হলো আমার সামনে। এর মাঝে যেনো বার বারই মনে হচ্ছিল সৃষ্টিকর্তার কথা- আহ্ কী সুন্দর! বাহ্ কী সুন্দর!

দেখা মিলে গেল এক ঝাঁক পাফিনের। অর্ধেক মাছ অর্ধেক পাখি অপূর্ব সুন্দর এই উভচর প্রাণী মে মাস থেকে আগস্ট পর্যন্ত সমুদ্র তীরের কাছে থাকে বলে শুরুতেই তাদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। এর ডাক নাম সি-প্যারোট মানে সাগর-টিয়া। কখনও কখনও একে ক্লাউনস্ অব দ্যা সি অর্থাৎ সমুদ্রের ভাঁড়ও বলা হয়। জীবনের বেশিরভাগ সময় গভীর সমুদ্রে কাটাতে হয় বলে সমুদ্রের উপর পৃষ্ঠে ভাসমান অবস্থায় তারা বিশ্রাম নেয়। এর ঠোঁট গ্রীষ্মকালে কটকটে কমলা রঙ থাকলেও প্রচণ্ড শীতে তা ধূসর বরণ ধারণ করে। তবে এই কমলা ঠোঁটেই তারা সঙ্গীকে আকর্ষণ করে থাকে। হেরিং, হেইক এবং অন্যান্য ছোট মাছ খেয়েই তারা জীবন ধারণ করে থাকে। মিনিটে চারশবার পাখা ঝাপটিয়ে প্রায় একশ কিলোমিটারের মতো উড়তে পারে প্রতি ঘণ্টায়। একই সঙ্গে তারা অসাধারণ সাঁতারু। ষাট মিটার পানির নিচে প্রিয় মাছ সন্ধানে ডুব দিতেও পারদর্শী। যুগল-বন্দী হয়ে মিলনের পর বছর ঘুরে আবারও মিলনের সময় আসলে একই সঙ্গীর সঙ্গে মিলিত হয়। বিশ বছর আয়ুর এ জোড়া সাধারণত টিকে থাকে বিশ বছর পর্যন্ত।

পরিবার শুরু করার সময় পাহাড়ের গায়ে কিংবা সমুদ্র তীরে ঠোঁট এবং পা দিয়ে গর্ত করে সেখানে বাসা বানিয়ে তারা থাকে। ঘাস এবং পাখনা দিয়ে তৈরী করা সেই বাসায় মেয়ে পাফিনটি ডিম দেয়। ছত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ দিন পর্যন্ত শিশু পাফিনটিকে ডিম থেকে বের করে আনতে মা-বাবা দুজনই সমানভাবে তা দেয়।

পৃথিবীর বুকে ধীরে ধীরে পাফিনের সংখ্যা কমে আসার অন্যতম কারণ মাছ শিকারীদের মধ্য সমুদ্রে গিয়ে অতিরিক্ত মাছ শিকার। এতে করে একদিকে যেমন অপ্রতুল হয়ে পড়ে মাছ। অন্যদিকে সমুদ্রের মাছ ধরার ট্রলার থেকে নিসৃত তেল পানিতে মিশে তাদের ঈশ্বর প্রদত্ত অদ্ভুত ওয়াটার প্রুফ পালকগুলো নষ্ট করে দেয়, যা তাদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যক।

পাফিন ছাড়াও সিগাল, নর্দান গ্যানেট, আর্কটিক টার্ন ইত্যাদি পাখিও সমুদ্রের এই অঞ্চলে দেখা যায়।

পাহাড়ের গা ঘেঁষে শত সহস্র পাফিন পরিবার মুগ্ধ নয়নে দেখতে দেখতে হঠাৎ করেই ডাক্তার ক্যারেন চিৎকার করে বলল- সে একটি হোয়েল দেখতে পেয়েছে। ক্যাপ্টেন হর্দুর স্টার্ট বন্ধ করে জাহাজটিকে স্থির করল। কিছুক্ষণ পর একটু দূরে আবারও লাফ দিয়ে উঠল প্রায় পঁচিশ ফিট দৈর্ঘ্যর বিশাল এক মিংকে হোয়েল। একবার একটি মিংকে হোয়েল দেখার পর দশ থেকে পনেরো মিনিট পর প্রত্যাশা করা যেতে পারে সে আবারও নিঃশ্বাস নিতে ওপরে আসবে। সঙ্গীত প্রিয় এই মিংকে হোয়েলের  উচ্চস্বরের গান ১৫০ ডেসিবেল-এর হয়ে থাকে যা প্রায় দুই মাইল দূর থেকেও শোনা যায়। সাধারণত মিলনের সময় অথবা কোনো বিপদ-আপদের সিগন্যাল দিতেই এই গান তারা গেয়ে থাকে। পঞ্চাশ বছরের আয়ু নিয়ে জন্ম নেয়া মিংকে হোয়েলের প্রেমের বয়স আসে পাঁচ বছরের পর। মেয়ে মিংকে হোয়েল প্রতি দুই বছরে একটি সন্তান প্রসব করে দশ থেকে এগারো মাস গর্ভধারণের পর। প্রায় নয় ফুট লম্বা এক হাজার পাউন্ডের শিশু জন্ম হয়েই সমুদ্রে ভেসে বেড়ায়। মানব শিশুর মতো প্রথম পাঁচ মাস শুধু মায়ের দুধ খেয়েই জীবন ধারণ করে।

এবারে ক্যাপ্টেন হর্দুর আমাদের আরও গভীর সমুদ্রে নিয়ে যেতে প্রত্যয়ী হলো। এক অদ্ভুত সঙ্গীত শুনতে পাচ্ছি আমরা। কোথা থেকে ভেসে আসছে এই সুর দূরবীন চোখে দিয়ে চারিদিকে দেখতে লাগলাম আমরা। নাহ্, কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সমুদ্রের পানিতে এক শান্ত আর সৌম্যভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল। শান্ত সমুদ্রের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে ক্যাপ্টেন হর্দুরের ছোট্ট জাহাজ। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বাতাসে ডেকে দাঁড়িয়ে থাকাই মুশকিল। তবুও বাতাস মেনে নিয়েই দাঁড়িয়ে আছি আমরা আর আমাদের উৎসুক চোখ দূরবীনের ভেতর দিয়ে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছে কোথা থেকে ভেসে আসছে এই সুর?

প্রকৃতির কাছে কোন জবাব না পেয়ে সাঁয়ত্রিশ বছর ধরে গ্রীনল্যান্ডে সি-তে পারি জমানো ক্যাপ্টেন হর্দুরকেই জিজ্ঞেস করলাম সঙ্গীতের উৎসের কথা। যেতে যেতে বলছিলেন তিনি, গান গাইছে হাম্পব্যাক হোয়েল। এরা অত্যন্ত স্মার্ট এবং সঙ্গীত পটু। সঙ্গীত প্রতিভা নিয়েই জন্মগ্রহণ করে বলা যেতে পারে। এদের গান প্রায় বিশ মাইল দূর থেকে শোনা যায়। কোনো কোনো গান আবার বিশ মিনিট দীর্ঘ হয়ে থাকে। এই একই গান স্মৃতিতে ধরে রেখে বারবার গাইতে জানে তারা। দুজন থেকে চারজনের বেশি দল না হলেও ছিচল্লিশ ফিট লম্বা চল্লিশ টন ওজনের এই সমুদ্র দৈত্যের মধ্যে নিজস্ব দলের মাঝে ভাষাগত আঞ্চলিকতাও রয়েছে। এমনকি পেটের নিচে একেবারে স্বতন্ত্র ছাপ থাকে মানুষের আঙ্গুলের মতো যা দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন হাম্পব্যাক হোয়েলকে চিহ্নিত করা যায়। গ্রীষ্মকালে খাবার আর শীতকালে প্রেমের মৌসুম থাকা এই প্রাণী, শিশুকে এগারো মাস পেটে রেখে জন্ম দেয়ার পর দীর্ঘ পাঁচ মাস প্রতিদিন একশ লিটার দুধ খাওয়ায়। পুরো পৃথিবীতে প্রায় চল্লিশ হাজার হাম্পব্যাক হোয়েল আছে বলে ধরা হয়। পানি থেকে লাফ দিয়ে উপরে উঠতে এবং অ্যারোবিকস্ টুইর্ল করতে এদের জুড়ি নেই। মাথা পানির উপরে উঠিয়ে উঁচু-নিচু করতে কিংবা লেজের বারিতে পানি ছিটিয়ে আওয়াজ তুলতে এরা খুব পছন্দ করে। আপাতদৃষ্টিতে মুখের ভিতরে যেটিকে দাঁত মনে হয় তা কিন্তু আসলে দাঁত নয়। বরং, এক ধরনের ছাকনি, যা পানি থেকে খাবার আলাদা করে।

ক্যাপ্টেন হর্দুরের মুখে এ কথা শুনতে শুনতে একদল ডলফিন সমুদ্রের উপরে উঠে আশ্চর্য ভঙ্গিমায় নাচতেই আমাদের সকল আকর্ষণ তাদের দিকে চলে গেল।

ট্রেনিংপ্রাপ্ত ডলফিনদেরকে নাচতে দেখেছি বহুবার নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। বল মুখে নিয়ে পানির উপরে উঠে একসঙ্গে নেচে ওঠে তারা। চক্ষু ছানাবড়া করে তাদের অভিনয়ও দেখেছি। এমনকি দুবাইয়ের আটলান্টিসে আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমুও খেয়েছিল ডলফিন মানিলু। সেখানেই তাকে স্পর্শ করেছি, ডলফিন সম্পর্কে জেনেছি অনেক কিছু। কিন্তু এভাবে গ্রীনল্যান্ড সাগরে পৃথিবীর মনুষ্য উপস্থিতির সর্ব উত্তরে পৌঁছে যাবার পর উদাত্ত প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্যকে ক্যানভাস করে এভাবে প্রায় দশ থেকে এগারোটি ডলফিনের একটি দল সহজাতভাবেই লম্ফ দিয়ে নাচের মুদ্রায় পৃথিবীর বুকে স্বর্গ ছাপানো সৌন্দর্য্য বিতরণ করতে পারে, তা ছিল আমার কল্পনার বাইরে। এরই মাঝে প্রকৃতির সাথে যেনো মিশে গেল সেই সঙ্গীত মূর্ছণা। কিন্তু আমার স্মৃতিতে আমৃত্যু স্থান করে নিল অপূর্ব সেই সঙ্গীত। আমাদের জাহাজ থেকে কত গজ দূরে হবে তা ঠিক অনুমান করতে পারিনি। তবে শান্ত সমুদ্রের মাঝে এক বিশাল হাম্পব্যাক হোয়েল সর্ব শক্তি দিয়ে আকাশপানে নিজেকে ছুঁড়ে দিতেই মনে হলো আমরা খুবই ক্ষুদ্র। বিস্ময়ে, উত্তেজনায় সকলের মুখ হাঁ। ক্যাপ্টেন হর্দুর বললেন, এটি হাম্পব্যাক হোয়েল। ঐ মুহূর্তে দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দী করতে বেমালুম ভুলে গেছি! আরেকবার কি দেখতে পাবো এমন দৃশ্য? এই প্রশ্নের উত্তরে ক্যাপ্টেন হর্দুর জানালেন প্রায় চারতলার সমান এই সমুদ্র দৈত্য একবার পানির নিচে গেলে বিশ থেকে ত্রিশ মিনিট পরে আরও একবার পানির উপরে আসে। তবে নিঃসন্দেহে তার আকৃতি এবং শক্তি তাকে একই জায়গায় কিংবা কাছাকাছি কোনো জায়গায় আরও একবার লম্ফ দেয়ার সুযোগ দেয় না।

ঈশ্বর প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ উপহারগুলোর একটি আজকের এই অভিজ্ঞতা। মানুষ যত পায় তত চায়। আমারও মন যেনো আরও লোভী হয়ে উঠলো রূপকথার সেই কিলার হোয়েল দেখতে। শুনেছি পৃথিবীর খাদ্য চক্রে সবচেয়ে উঁচুতে স্থান এই কিলার হোয়েলের। এরই মাঝে ক্যাপ্টেন তার জাহাজ স্থির করে রেখেছেন। অপূর্ব দৃশ্য অবলোকনের পর এবারে কফির ডাক পড়লো। সকলেই কফির সরঞ্জামযুক্ত বক্স ঘিরে ধরলাম। যার যার কফি সে সে বানাবে এমন নিয়ম থাকলেও, সকলের জন্যেই কফি বানাতে শুরু করলাম আমি। আর কফির কাপেই কিলার হোয়েল দেখার সম্ভাবনা কতটুকু তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেল। শুনে অবাক হলাম কিলার হোয়েল আসলে হোয়েল নয়। এরা আসলে বড় আকৃতির ডলফিন। তাহলে কেনই বা লোকে তাকে ‘কিলার হোয়েল’ বলে? এর উত্তরে ক্যাপ্টেন হর্দুর জানালেন, নাবিকেরা দেখেছে এই কালো প্রাণী হোয়েলকে আক্রমণ করে। তাই এর নাম দিয়েছে হোয়েল কিলার। পরবর্তী সময়ে এটি উল্টে গিয়ে কিলার হোয়েল হয়ে যায়। একে সোর্ড হোয়েল, এসাসিন হোয়েল বা ব্লাক ফিশ-ও বলা হয়ে থাকে। যদিও এটি কোনো ফিশ কিংবা মাছ নয়। এটি সমুদ্রে বিচরণকারী স্তন্যপায়ী প্রাণী। প্রায় ত্রিশ ফিট পর্যন্ত এরা লম্বা হয়ে থাকে। ওজন হয়ে থাকে প্রায় ছয় টন। কিলার হোয়েল নামক দৈত্যাকৃতির এই ডলফিন তার আকৃতির কারণেই অন্যকোনো সামুদ্রিক প্রাণী দ্বারা আক্রান্ত হয় না। এরা দলবদ্ধ হয়ে থাকতে পছন্দ করে। অত্যন্ত সামাজিক এই প্রাণীর দলকে পড বলা হয়, যার নেতৃত্বে থাকেন একজন বয়স্ক মেয়ে হোয়েল। একটি পড-এ তিন থেকে শুরু করে প্রায় একশ পর্যন্ত সদস্য থাকে। এমনকি পাঁচ জেনারেশনের হোয়েল একসঙ্গে থাকাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। যেমন সর্বকনিষ্ঠ হোয়েল, তাদের মাতা, মাতামহ, প্রো-মাতামহ, প্রো প্রো-মাতামহ। এই দলটি সকলে একসঙ্গে মিলে শিকার করে, ঘুরে বেড়ায় এবং ঘুমায়। বিপদে-আপদে একজন আরেকজনকে সাহায্য করে এবং আশ্চার্য হলাম শুনে যে, দলের একটি কিলার হোয়েল-এর মৃত্যুতে দলের অন্য সকলেই শোক প্রকাশ করে। এদের গন্ধ নেবার ক্ষমতা নেই। তবে দৃষ্টি এবং শ্রবণশক্তি প্রচণ্ড তীক্ষ্ম। এমনকি কুকুর এবং বাদুরের চাইতেও প্রখর শ্রবণশক্তি নিয়ে জন্মানো এই প্রাণী শব্দ ছুঁড়ে তার প্রতিধ্বণী শুনে একবারেই নির্ভুলভাবে বুঝতে পারে কোথায় কী রয়েছে। প্রাণীকূলের মধ্যে সবচেয়ে জটিল ভাষায় তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে থাকে। যেমন উচ্চস্বরে হুঁইসেল, স্পন্দিত ডাক এবং নিন্ম-কম্পাঙ্কের উচ্চারণে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি বুঝিয়ে থাকে। হুঁইসেলগুলো ব্যক্তিগত যোগাযোগে ব্যবহার করে। আবার স্পন্দিত ডাকে সমষ্টিক যোগাযোগ করে থাকে। এমনকি চোয়ালের বারি দিয়ে তালির আওয়াজও তারা তুলতে পারে। ভিন্ন পড-এর কিলার হোয়েল তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলে। এমনকি শব্দ ছাড়াও স্পর্শ এবং ভঙ্গিমাতেও তারা কথা বলে থাকে। প্রায় শতবর্ষী এই প্রাণীর মধ্যে মেয়েদের আয়ু বেশি। পনেরো থেকে পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত এরা সন্তান জন্ম দিয়ে থাকে।

তাদের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু জানতে চাইলে ক্যাপ্টেন জানালেন, মানুষের পক্ষে যতটুকু যাওয়া সম্ভব ততটুকু আমরা পৌঁছে গেছি। এই সীমানার পর জাহাজ নিয়ে আর যাওয়া সম্ভব নয়। এতে পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে এই জাহাজটির।

অবশেষে ফিরবার পালা। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে ফেরার পথেও দেখা মিলতে পারে কাঙ্ক্ষিত কিলার হোয়েলের। ভাগ্যের উপর দোষারোপ করতেই ক্যাপ্টেন হর্দুর বলে উঠলেন, যে বিশাল আকৃতির হাম্পব্যাক হোয়েল আমরা দেখেছি, তাই প্রমাণ করে আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন।

ফেরার পথে লক্ষ্য করলাম ধূসর মেঘ মাথার খুব কাছে। বিভিন্ন রকমের পাখি, ডলফিন দেখতে দেখতেই দীর্ঘ এ যাত্রা যেনো মুহূর্তেই শেষ হয়ে এলো। ঐতো দূরে দেখা যাচ্ছে মনুষ্য-বসতি।

পেছনের দিকে তাকিয়ে সমুদ্রের ফেনিল জলরাশিকে আরও একবার অবলোকন করি। একটি বিন্দুতে দাঁড়িয়ে যখন জানলাম সমুদ্রের ওপারে আর মানুষ যায় না। তখন মনে হলো, ওপারেই তো যেতে হবে মানুষকে। আর মনে হলো, এই অনুভূতিতেই বোধহয় বিন্দু বিন্দু করে সমুদ্রের তলদেশ থেকে পর্বতচূড়া পর্যন্ত সবই জয় করেছে মানুষ। তাহলে আকৃতি, ওজন কিংবা হিংস্রতায় যে যাই হোক না কেন, সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি কিন্তু মানুষই। আর সেই মানুষ হয়ে যখন পৃথিবীতে আমাদের আগমন ঘটে সে আগমনটাই সম্মানের। জয় হোক মানুষের। জয়ী হোক মনুষ্যত্ব।


ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন