ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

অন্য আলোয় দেখা অন্নপূর্ণা

মিলটন আহমেদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-২১ ৪:৪৭:২৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-২১ ৪:৪৭:২৩ পিএম
মন্দিরের প্রধান ফটকের সামনে লেখক মিলটন আহমেদ

ঘড়ির কাঁটায় ইন্দোরের সময় তখন সকাল সাতটা বেজে পঁচিশ মিনিট। ঘুম ভাঙার পর থেকেই মাথার মধ্যে ব্যাপারটা ঘুরপাক খাচ্ছে। তখনও ঘুমের ঘোর কাটেনি। বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করছিল না। পাশ ফিরে আরেকটু আয়েশ করে পাতলা কম্বল মাথার উপর টেনে দিলাম। কিন্তু নাছোড়বান্দা খুঁতখুঁতে চিন্তাটা পিছু ছাড়ছে না! আজ কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায় চিন্তা করছিলাম। এতো সকালে ঘুম যখন ভাঙলই, তখন প্রাতঃভ্রমণই বা মন্দ কি! এই সুযোগে অন্তত সকালের নীরব নিস্তদ্ধ ইন্দোর দেখা হয়ে যাবে।

অগত্যা বিছানার আদুরে পরশ ত্যাগ করতেই হলো। ফ্রেশ হওয়ার কিছু নেই। আলুথালু ভাবটাই থাক। শুধু ট্রাউজার এবং কেড্স পরে নিলাম। শীতের আগমনী বার্তা এখানে। পাতলা জ্যাকেট গায়ে চড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম। হোটেলের সামনের রাস্তাটা এক মিনিটে পেরিয়েই মহাত্মা গান্ধী রাস্তায় গিয়ে উঠলাম। এমনিতেই ইন্দোরে যানজট নেই। সুন্দর ছিমছাম গোছানো শহর!

গত দু’দিনে এটা অন্তত বুঝেছি, এখানকার রাস্তাঘাটে ঢাকার মতো অতিমাত্রায় শব্দদূষণ নেই। সিগন্যাল ছাড়া কোনো প্রকার ট্র্যাফিক খুব একটা চোখে পড়েনি। এতো সকালে বেশি যানবাহনও নেই এদিকটায়। গুটিকয়েক অটোরিকশা দেখা যাচ্ছে এদিক-সেদিক। এছাড়া রাস্তার বেশিরভাগই ফাঁকা। স্বাস্থ্য সচেতনদের দেখা গেল হালকা রানিং করছেন। বয়ঃবৃদ্ধ কয়েকজন হাঁটছেন উদ্দেশ্যহীন। হেঁটে আবাসিক এলাকার মতো দেখতে একটি জায়গার আশপাশে ঘুরলাম কিছুক্ষণ। মনে হলো, পুরো এলাকা এখনো ঘুমন্ত। সকাল হতে ঢের বাকী!

মন্দিরের ভেতরে পূজার স্থান

 

ট্রাউজারের পকেটে মোবাইল ফোন। কল এলে সহজে টের পাওয়া যায় না। আর এই দূর দেশে এতো সকালে ফোন করারও কেউ নেই। কয়টা বাজে দেখা দরকার। পকেট থেকে মোবাইল বের করতেই দেখি একগাদা মেসেজ; মেসেঞ্জারে। দেশ থেকে প্রিয়জনেরা স্মরণ করেছেন। বাংলাদেশে এখন প্রায় দশটা বাজে। আমার ঘড়িতে ন’টা বেজে কুড়ি মিনিট। এতক্ষণ ঘুরলাম? সেজন্যই হয়তো ক্ষুধাটা বেশি লেগেছে। আজ আমার পরিকল্পনা ছিল অন্নপূর্ণা মন্দির দেখতে যাব কোনো এক ফাঁকে। এখন ঘুরে এলে মন্দ হয় না। পথে কোথাও নাস্তার কাজটা সেরে নেয়া যাবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। কোনো কাজে যখন ঢাকার বাইরে যাওয়া হয়, আর তখন যদি আমার বিভাগীয় প্রধান উদয় হাকিম স্যার সঙ্গে থাকেন তখন ওই এলাকার খুঁটিনাটি সব তার দেখা চাই-ই চাই। তিনি কোথাও গেলে সঙ্গে অবশ্যই ছোট্ট একটি নোটবুক রাখেন। হুটহাট পকেট থেকে বের করে কিসব যেন টুকে রাখেন। অনেক সময় সবকিছু স্মৃতিতে ধরে রাখলেও সময়মত সবটা মনে করা সম্ভব হয় না। ‍তিনি যখন ভ্রমণ-গদ্য লেখেন তখন লেখায় একারণে পর্যাপ্ত তথ্য থাকে। অনেক তথ্য ওই নোট বুকের মাধ্যমেই সংরক্ষণ করেন তিনি।

অন্নপূর্ণার উদ্দেশ্যে যখন রওনা হলাম তখন সাড়ে ন’টা বাজে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে একটা অটোরিকশা পেলাম। একশ ত্রিশ রুপির ভাড়ায় চেপে বসলাম। ভালোই লাগছে। একা। তবুও ভালো লাগছে। পরিবেশটা অসাধারণ! অটোরিকশা চালক অভিনব মানুষ। জিজ্ঞাসা করলেন- কোথা থেকে এসেছি?  বললাম- বাংলাদেশ। কেন এসেছি, কবে এসেছি, কতদিন থাকব, ক্রিকেট খেলায় আমার কাজ কী ইত্যাদি জানতে চাইলেন। তাকে সংক্ষেপে বললাম। চলন্ত অবস্থায় তাকে আমার মোবাইল থেকে কয়েকটা ছবি দেখালাম। তার নিজের কাছে কি যেন একটা খটকা লাগল! ভালোভাবে ছবিগুলো দেখার জন্য অটোরিকশা থামালেন। ছবিগুলো দেখলেন মনোযোগ দিয়ে। মাঠের মধ্যে আমার প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডিং-এর ছবি, আমার ছবি, খেলোয়াড়দের ছবি, আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলোয়াড়ের হাতে পুরস্কার তুলে দিয়েছিলাম সেই ছবিও আছে। ছবি দেখে বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখছেন। চেহারা মেলাচ্ছেন। মনে হচ্ছে, আমাকে গাড়িতে তুলে তিনি মস্ত বড় অপরাধ করেছেন! ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট লোকজন এই অটোতে ওঠানো নিষেধ- ভাবখানা এমন। ভাবছি, ‘দাদা, আপনি নেমে যান’– বলে হয়তো নামিয়ে দিবেন অটোরিকশা থেকে। কিন্তু তেমন কিছু ঘটল না। আমাকে অবাক করে তিনি অটোরিকশা স্টার্ট দিলেন। এবার শেষ টি-২০ ম্যাচে বাংলাদেশের দুর্ভাগ্যের কথা বলতে শুরু করলেন আফসোস নিয়ে।

ইন্দোরে প্রথম এসেছি শুনে অন্নপূর্ণা মন্দির নিয়ে তিনি ভাণ্ডার খুলে দিলেন। অটোরিকশার শব্দ আর  ভাষা সবটুকু না বোঝার কারণে আমিও ‘হুম-হা, রিয়েলি?, বহুত আচ্ছা!’ বলে পার করলাম। তার পরিবার আর বাড়ি-ঘরের কথাও কিছু শুনলাম। ত্রিশ মিনিটের মতো লেগেছে আসতে। পৌঁছে গেলাম একেবারে মন্দিরের সামনে। মূল ফটক নবাগত যেকোনো অতিথিকে আকর্ষণ করবে। চারটি বড় আকারের হাতি গেটের সামনে দাঁড় করানো। হাতির পিঠের উপরে পাথরের বিশাল গেটে কারুকাজ। এতো নিখুঁত যে চোখ ফেরানো মুশকিল! তাকিয়ে দেখতে দেখতে ভাবনায় পড়ে যেতে হয়– শিল্পীরা এতো সুন্দর করে কাজগুলো কীভাবে করেছেন? ছোট ছোট মূর্তিগুলো দেখে মনে হবে, হিন্দুদের কোনো দেব-দেবী বা রাজা-রানীর মূর্তি। এছাড়াও ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে দেবী, তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে কোনো রাজ সেনাপতির মূর্তি, মৎস্যমানবের মূর্তি, প্রজাদের মূর্তি, আরও অনেক কিছু। পুরো কাজটি ভালোভাবে দৃষ্টিসীমায় নিয়ে দেখলে একটি রাজপ্রাসাদের চিত্র ফুটে উঠবে মনে। মেইন রোডের সাথেই মন্দিরের প্রধান ফটক। ভাবলাম, আগে ভেতরে যাই। বের হওয়ার সময় না হয় আবার ভালো করে দেখব। ভেতরে ঢুকতে টিকেট লাগবে কিনা কে জানে! কিছুটা দ্বিধায় পড়লাম। মন্দির তো পর্যটনের অংশ। আমাকে পাশ কাটিয়ে দুজনকে ভেতরে ঢুকতে দেখলাম। তার মানে টিকেটের ঝামেলা নেই। তাহলে আর কি! চালো।

মন্দিরের খোলা অভ্যন্তর

 

ইন্দোর সম্পর্কে একটু বলে নেয়া ভালো। ভারতের মধ্যপ্রদেশের সবচেয়ে বড় জেলা ইন্দোর। এমনকি এই প্রদেশের রাজধানী ভূপালের চেয়েও। শহরের মোট আয়তন পাঁচশ ত্রিশ বর্গ কিলোমিটার বা দুইশ বর্গ মাইল। জনসংখ্যা প্রায় আটাশ লাখ। বলিউডের সুপারস্টার সালমান খানের জন্ম ইন্দোরে। বর্তমান  ইন্দোরের কয়েকটি নামকরা স্থানের মধ্যে রাজ্যদা প্যালেস, লালবাগ প্যালেস, অন্নপূর্ণা মন্দির অন্যতম। ইন্দোরের সুদামা নগরের ক্রান্তি ক্রিপলানি এলাকায় এই মন্দির অবস্থিত। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ এই মন্দিরে আসেন। কেউ আমার মতো আসেন ঘুরে বেড়াতে। কেউবা নানা রকম ইচ্ছাপূরণের উদ্দেশ্যে আসেন। অর্থাৎ কেউ এখানে ট্যুরিস্ট, কেউ তীর্থযাত্রী। পর্যটক এসে মন্দিরের ভেতরে ও বাইরের অসাধারণ আর্কিটেক্চারাল সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন। অন্যদিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই মন্দিরটি তীর্থস্থান। স্থানীয়দের মতে এটি নাকি অন্যসব মন্দিরের মতো নয়। মন্দির উৎসর্গ করা হয়েছে দেবী অন্নপূর্ণার নামে। অন্নপূর্ণাকে ইন্দোরের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা খাদ্য ও পুষ্টির দেবী হিসেবে মান্য করেন।

ভেতরে আলাদা আলাদা আরও তিনটি কুঠির মতো মন্দির রয়েছে। প্রতিটি মন্দিরেই মানুষের আনাগোনা। কেউ কেউ নত হয়ে আছেন, কেউ আবার আগরবাতি জ্বালিয়ে, ফুল দিয়ে পূজা অর্চণায় ব্যস্ত। বাইরে খোলা একটি জায়গায় গেরুয়া ধুতি পরিহিত বয়স্ক একজন কি যেন পড়ছেন দাঁড়িয়ে। তার সামনে অর্ধ গোলাকার হয়ে বসে বিভিন্ন বয়সের পুরুষ ও মহিলা পুঁথি পাঠ শুনছেন। আমাদের মুসলমানদের যেমন জুম্মার দিন ফরজ নামাজের আগে ইমাম সাহেব খুৎবা পাঠ করেন, আর নামাজ পড়তে আসা সবাই  খুৎবা পাঠ শোনেন তেমন হয়তো। 

প্রতিদিন ভোর পাঁচটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত মন্দিরে দর্শনার্থীদের ঢোকার অনুমতি থাকলেও মাঝখানে দুই ঘণ্টা অর্থাৎ বারোটা থেকে দুইটা পর্যন্ত ভেতরে ঢোকা নিষেধ। মূল গেটের ভেতরে ঢুকে প্রথমেই দেবী অন্নপূর্ণার মূর্তি চোখে পড়ল। সিংহাসনের উপরে দেবী বসে আছেন। বাঁ হাতে ধরে থাকা একটি পাত্র থেকে কিছু একটা নিয়ে অন্য হাতে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে দিচ্ছেন। দেবীর পেছনে দু’পাশে দু’জন সেবক প্রকৃতির নারী দাঁড়িয়ে আছে। দু’জনকে জিজ্ঞাসা করলাম- এই মন্দিরের প্রকৃত বয়স সম্পর্কে। একজন জানালেন আঠারোশ পঁচানব্বই খ্রিষ্টাব্দে মন্দিরটি স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু তার কথা আমি ঠিক বিশ্বাস করতে পারলাম না। আত্মবিশ্বাসহীন এভাবে বললে আমি কেন, কারোরই মন ভরবে না।

কারুকাজখঁচিত মন্দিরের একাংশ

 

যাই হোক, এটাই আমার ভরসা। অন্তত এটুকু বুঝলাম, এই মন্দিরের ঢের বয়স হয়েছে। ভেতরেও কারুকাজের কমতি নেই। শুধু মূল ফটকের বাইরেই নয়, ফটকের ভেতরেও অসম্ভব সুন্দর পাথরখচিত কারুকাজ। আমি ঘুরে ঘুরে দেখছি। পূজা অর্চণারও বেশ রকমফের আছে স্থান-কাল-ভেদে। যেমন মুসলমানদের মধ্যেও শিয়া, সুন্নি সম্প্রদায়ের অনেক কিছুতেই মিল-অমিলের ব্যাপার থাকে। পূজা করার জন্য সবচেয় বড় যে ভবনটি সেটির বড় দরজা পর্যন্ত যেতেই খুটখাট শব্দ শুনে ভেতরে উঁকি দিলাম। সংস্কারকাজ চলছে। দু’চারজন খালি পায়ে যাতায়াত করছে। ভেতরে জুতা পরে যেতে মানা। ভেতরে দেখার মতো তেমন কিছু নেই ভেবে সরে এলাম। মন্দির দেখভালের জন্য পর্যাপ্ত সেবকের দেখাও পেলাম। তারা ব্যস্ততার সঙ্গে মন্দিরের নানা রকম কাজ করছেন। উপাসনালয় বলে কথা! এর খেদমত করাও যথাযথ পুণ্যের।

মন্দিরের সদর দরজায় এসে সেই চারটি হাতি পুনরায় পরখ করলাম। এরকম কারুকাজমণ্ডিত ফটকের কোনো ছবি না তুললে এই স্বল্পদৈর্ঘ্য ভ্রমণ পরিপূর্ণতা পাবে না। আমি রাস্তা পার হয়ে গেট বরাবর উল্টো পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ছবি তুললাম বটে। তবে নিজের একখানা ছবি অন্তত না তুলে গেলে কেউ বিশ্বাস করবে না- আমি এখানে এসেছিলাম। কেউ নেই। কাকে অনুরোধ করব- একটি ছবি তুলে দেয়ার জন্য? এর মধ্যে আমার পাশে একটি অটোরিকশা এসে থামল। হোটেলের নাম বলে জানতে চাইলাম যাবে কিনা? দরদাম করার পর চালক যেতে রাজি হলেন। অমনি আমি বললাম- প্লিজ, একটি ছবি তুলে দিন।

 

ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন