ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

শীতে সিকিম ভ্রমণের আগে যা জানতে হবে

ইকবাল মাহমুদ ইকু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-০২ ৩:২৭:১৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-০২ ৩:৩০:১৯ পিএম

ভারতে ঘুরে দেখার মতো জায়গার অভাব নেই। বলা হয়ে থাকে দেশটি ঘুরলে নাকি পৃথিবীর অর্ধেক দেখা হয়ে যায়। একজন ভ্রমণপ্রেমীর জন্য এরচেয়ে বেশি আর কী চাওয়ার থাকতে পারে? পাহাড় থেকে শুরু করে মরুভূমি, এমনকি বরফমণ্ডিত সৌন্দর্য— কী নেই ভারতে? ভ্রমণপ্রেমীদের সব চাওয়া পূরণ করতেই যেন সৃষ্টিকর্তা গড়েছেন ভারতের উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা সিকিম। চারপাশে পাহাড়, পর্বত আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের যেন আশ্চর্য এক নিদর্শন এই রাজ্য। বরফ, পাহাড় আর ঝরনার অপরূপ দৃশ্য সহজেই আপনার মন কেড়ে নেবে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সতের হাজার ফুট উঁচু সিকিম শীতকালে যেন হয়ে ওঠে বরফে ঢাকা এক ভূস্বর্গ!

দীর্ঘদিন বাংলাদেশীদের সিকিম যাওয়ার অনুমতি ছিল না। কিছুদিন হলো এই বাধা দূর হয়েছে। তো এই শীতে আর দেরি কেন? তৈরি হয়ে নিন। তবে সিকিম যাওয়ার আগে আপনাকে অনেক কিছু জেনে নিতে হবে। যেমন কখন যাবেন, কীভাবে যাবেন, খরচই বা কত হবে- সব মিলিয়ে সিকিম ভ্রমণের আদ্যোপান্ত নিয়ে এই লেখা।

বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতো সিকিমে ঘুরতে যাওয়ার জন্য বিশেষ একটা সময় আছে। তবে অন্য সময়ে গেলেও যে আপনি একদম ঠকে যাবেন ব্যাপার মোটেও তেমন নয়। কিন্তু এই অপার সৌন্দর্যের প্রতি ফোঁটা নির্যাস আস্বাদন করতে গেলে আপনাকে যেতে হবে মার্চ-এপ্রিলের দিকে অথবা সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। কেননা, আপনি যদি অন্য সময় যান তাহলে দেখতে পাবেন না নয়নাভিরাম নীল পানির লেকগুলোর সৌন্দর্য। এছাড়া বরফে ঢাকা রাস্তা বেশ দুর্গম হয়ে যাওয়ার কারণে অনেকগুলো পর্যটন স্পট আপনি তখন মিস করবেন।  তবে প্রচণ্ড শীত এবং সাদা তুষারের অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে অন্য সময়ে খুব অল্প খরচেই ঘুরে আসতে পারবেন সিকিম। এছাড়া জেনে রাখা ভালো দক্ষিণ ও পশ্চিম সিকিমে আপনি যেকোনো সময়েই ঘুরে আসতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে বর্ষা মৌসুম এড়িয়ে যাওয়া ভালো।

সিকিম রাজ্যটি উত্তর, পূর্ব, দক্ষিণ এবং পশ্চিম- চার ভাগে বিভক্ত। উত্তর সিকিমে আপনি ঘুরে আসতে পারেন সিঙ্গিক, লাচুং, ইয়ুমথাং, লাচেনসহ আরো বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থান। পূর্ব সিকিমে ঋষিখোলা, আরিতার, জুলুক, নাথাং ভ্যালি, কুপাপ লেকসহ আরো বেশ কিছু জায়গায় গিয়ে উপভোগ করতে পারেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। দক্ষিণ সিকিমে নামচি, টেমি টি গার্ডেন, রাবাংলা, বোরং, কালুকসহ বেশ কয়েকটি জায়গা পর্যটনের জন্য বিখ্যাত। অপরদিকে পশ্চিম সিকিমে ওখড়ে, গেজিং, সিংসর ব্রিজ, কাঞ্চনজঙ্ঘা ফলস, রিনচেনপংসহ কিছু জায়গা আপনার মন কেড়ে নেবে নিমেষেই।

ভ্রমণের জন্য সিকিম উন্মুক্ত হলেও এখনো বেশ কিছু জায়গায় আপনি চাইলেই যেতে পারবেন না। সেরকম কিছু জায়গা হলো নাথুলাপাস, গুরুদংমার, বাবা মন্দির এবং কালাপাথর। এর বাইরে সীমান্তের কাছাকাছি আরো কয়েকটি জায়গা পর্যটকদের জন্য এখনও নিষিদ্ধ। আপনাকে শুধু গ্যাংটকের অনুমতি দেয়া হবে, তবে আপনি যদি আরো বেশ কিছু জায়গা ঘুরে দেখতে চান তাহলে ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে অনুমতি নেয়া ভালো।

যারা ইতোমধ্যেই ভ্রমণে অভ্যস্ত তারা জানেন- ভ্রমণ খরচ অনেকটাই নির্ভর করে আপনারা কতজন যাচ্ছেন তার উপর। জেনে রাখা ভালো, সিকিমে আপনাকে ঘুরতে হবে ছয় সিটের গাড়িতে। সেই গাড়ি দিয়ে দুইজন ঘুরতে যে খরচ লাগবে ছয়জন মিলে ঘুরতেও একই খরচ লাগবে। তাই সিকিম ঘুরতে গেলে গ্রুপ করে যাওয়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। এক্ষেত্রে একটা ব্যাপার মাথায় রাখবেন, দেশ থেকে যাওয়ার আগেই আপনি গ্রুপ করে নিবেন।

 

 

আপনি যে বর্ডার দিয়েই ভারতে প্রবেশ করেন না কেন, সিকিমে যেতে হলে প্রথমে যেতে হবে শিলিগুড়ি। আর যেহেতু ফুলবাড়ি ইমিগ্রেশন পোর্ট থেকে শিলিগুড়ি কাছে (১২ কি.মি.) তাই খরচ কমাতে সেখান দিয়ে যাওয়াই ভালো। আপনি যদি কোনো গ্রুপের সাথে সিকিম থেকে অল্প খরচে ঘুরে আসতে চান তাহলে ৮-১০ দিনের জন্য খরচ হতে পারে ১২-১৫ হাজার টাকা। মনে রাখবেন, আপনি কীভাবে থাকছেন, কোথায় খাচ্ছেন এগুলোর উপর নির্ভর করছে ভ্রমণ খরচ। অল্প খরচে সিকিম থেকে ঘুরে আসতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই মিতব্যয়ী হতে হবে। বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি আছে যাদের মাধ্যমে গেলে বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হবে না।

সিকিম যাওয়ার অনেকগুলো উপায় আছে। আপনার ভ্রমণ পরিকল্পনার উপর নির্ভর করছে আপনি ঠিক কীভাবে সিকিম যেতে চাচ্ছেন। চাইলে কলকাতা থেকে বিমানে করে পাকিয়ং চলে যেতে পারবেন। সেখান থেকে জিপে সহজেই চলে যেতে পারেন গ্যাংটক। এছাড়া ফুলবাড়ির বাংলা-বান্ধা ইমিগ্রেশন থেকে শিলিগুড়ি এসএনটি স্ট্যান্ডে টমটমে চলে যেতে পারেন। সেখান থেকে জিপে করে খুব সহজেই গ্যাংটক যাওয়া যাবে। ইমিগ্রেশন থেকে শিলিগুড়ি যেতে টমটমে খরচ হতে পারে ৩০০ রুপি এবং শিলিগুড়ি থেকে জিপে গেলে ভাড়া লাগবে ২৩০০ রুপি। পুরো খরচ এবার গ্রুপের ছয়জনের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে নিন। তাহলেই বুঝতে পারবেন একেকজনের ঠিক কত করে লাগছে।

বৈধ নিয়ম অনুযায়ী আপনি দশ হাজার টাকা এবং পাঁচ হাজার ডলার সাথে রাখতে পারবেন। একটা ব্যাপার জেনে রাখা ভালো, ভারতীয় মুদ্রা দেশ থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়া আইনত দণ্ডনীয়। তাই বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার সময় সঙ্গে ভারতীয় মুদ্রা নিয়ে যাবেন না। ইমিগ্রেশন অফিস পার হলেই মানি এক্সচেঞ্জের দোকান পেয়ে যাবেন। আপনার কাছে যদি বাংলাদেশি টাকা থাকে সেগুলো রুপি করে নিন। চাইলে মোবাইলের সিমও কিনতে পারেন।

কোথায় কোথায় যাবেন নির্ভর করছে আপনার ভ্রমণ পরিকল্পনার উপরে। আগেও বলেছি এক্ষেত্রে ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়াই ভালো। তবে আপনার গ্রুপে যদি এমন কাউকে পেয়ে যান যে আগেই সিকিম ঘুরে এসেছে তাহলে তার অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করতে পারেন। বাংলাদেশের পঞ্চগড় পর্যন্ত বাসে বা ট্রেনে যাওয়া যায়। সেখান থেকে বাংলা-বান্ধার বাস বেশ কিছুক্ষণ পরপরই ছাড়ে। ভাড়াও তেমন বেশি নয়, মাত্র ৭০ টাকা। বাস থেকে নেমেই ইমিগ্রেশন। যাবতীয় কাজ শেষ করে সেখান থেকে বের হয়ে একটা অটো ভাড়া করে নিন শিলিগুড়ি জংশন পর্যন্ত। শিলিগুড়ি নেমে এসএনটি-তে যাবেন। সেখান থেকে আপনাকে ইনার লাইন পারমিশন নিতে হবে। যদি আপনি ইতোমধ্যে বাংলাদেশ থেকেই পারমিশন নিয়ে না আসেন তাহলে এখান থেকে ইনার লাইন পারমিট করে নিতে পারেন। পারমিট হয়ে গেলে জিপের জন্য টিকেট করে নিন। চাইলে আপনি বাসেও যেতে পারেন। তবে বাসে অনেক সময় লেগে যায়, তাই পর্যটকদের জন্য জিপ হলো সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিবহন। জিপে জানিয়ে রাখবেন, আপনি বাংলাদেশ থেকে ভ্রমণ করতে এসেছেন, আপনাকে রাংপোতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। কেননা ভ্রমণ করতে আসা সবার জন্য রাংপো হলো চেকপোস্ট। আপনি এসএনটি থেকে যে ইনার লাইন পারমিট করেছেন এখানে প্রদর্শন করুন। এখান থেকে রেজিস্ট্রেশন অফিসে গিয়ে পাসপোর্টে সিল নিয়ে নিতে হবে। যাবতীয় কাজ শেষ করে এরপর সোজা গ্যাংটক। গ্যাংটকে নেমে আপনার ইনার লাইন পারমিটটি ফটোকপি করে নিন। কেননা ভ্রমণের সময় এটা আপনার বারবার প্রয়োজন হতে পারে। এরপর সেখানে পছন্দ অনুযায়ী একটা হোটেল দেখে উঠে পড়ুন এবং চাইলে আশপাশে ঘুরে দেখতে পারেন। গ্যাংটকে আপনি অনেক ট্রাভেল এজেন্সির অফিস খুঁজে পাবেন। সেখান থেকে পছন্দ অনুযায়ী ঘুরে দেখার জন্য একটি অফার নিয়ে নেবেন। একটা ব্যাপার মনে রাখবেন, গ্যাংটকে ৯টার মধ্যেই দোকান বন্ধ হয়ে যায়। আপনাকে ডিনার-পর্ব তার আগেই শেষ করতে হবে।

জেনে রাখা জরুরি

সিকিম ঠাণ্ডাপ্রবণ রাজ্য। ঠাণ্ডা মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম অর্থাৎ জ্যাকেট, কান-টুপি, হাতমোজা ইত্যাদি রাখতে হবে।

ঠাণ্ডা থেকে আপনার পা যদি বাঁচিয়ে রাখতে চান তাহলে একটা মোটা এবং ভালো কেডস নিয়ে নিন, কেননা সাধারণ জুতা পরে আপনি ভুলেও সিকিম ভ্রমণের কথা কল্পনা করবেন না।

সিকিম খুব সুন্দর এবং চমৎকার একটি রাজ্য। এখানে রাস্তায় ময়লা, থুথু ফেলা নিষেধ। এমনকি এখানে প্রকাশ্যে আপনি ধূমপান করতে পারবেন না।

চেষ্টা করবেন সবসময় একজন গাইড রাখতে। গ্যাংটকের ট্রাভেল এজেন্সি থেকে আপনাকে সেই ব্যবস্থা করে দেয়া হবে।



ঢাকা/ফিরোজ/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন