ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ আষাঢ় ১৪২৭, ১৪ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

বরফ ঢাকা লাচুঙে জ্যোৎস্না-ভরা রাত

সিয়াম সারোয়ার জামিল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-০২ ৮:১৪:২২ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-০২ ৯:৫২:৪৭ পিএম

সকাল সকাল প্যারাগ্লাইডিং শেষ করে কেমন যেন শান্তি লাগছে! মনে হচ্ছে, এখনও শূন্যে ভাসছি। উড়ছি। নামছি। স্বর্গীয় অনুভূতির রেশ কাটেনি তখনও। কিন্তু মাটিতে নেমেই দলনেতা রনি শীল তাড়া দিলেন। বললেন, দ্রুত হোটেলে যেতে হবে। লাচুঙের গাড়ি চলে আসবে। ব্যাগ নিয়ে নামতে হবে। গল্প গাড়িতে বসেও করা যাবে।

দ্রুত ট্যাক্সি ডাকা হলো। হোটেলে কোনোমতে ব্যাগ গুছিয়ে, বিল চুকিয়েই দৌড়। মান্নুদা বললেন, গাড়ি এসে গেছে। বিদায় নেয়ার সময় জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘ব্যস্ততায় তোদের সঙ্গে ঠিকমতো কথা হলো না। আবার আসিস।’ আসলেই কথা হয়নি সেভাবে। কটা দিন থাকলাম। কিন্তু ঘোরাঘুরির চাপে ঠিকমতো আড্ডা দেয়া হয়নি। কিন্তু যেটুকু হয়েছে, তাতেই বুঝেছি, এ মানুষ ভারত চষে বেড়ানো লোক। অসম্ভব সেন্স অব হিউমার নিয়ে চলাফেরা করেন। ট্যুরিস্ট কীভাবে হ্যান্ডেল করতে হয়, বেশ জানা আছে তার। যেন হাতের মোয়া। যিনিই পরিচিত হবেন তার সঙ্গে বন্ধনে আটকে যাবেন। ভালোবেসে ফেলতে বাধ্য হবেন। গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন।

বললেন, ‘যদিও দীর্ঘ পথ। তবু লাচুং থেকে ফিরে গ্যাংটকে না থেকে সোজা দার্জিলিং গেলে সময় বাঁচবে। সঙ্গে টাকাও।’ মাথা নেড়ে বিদায় নিলাম। পরিচিত হলাম ড্রাইভার রাজীব ছেত্রীর সঙ্গে। বয়স ১৯-২০ হবে। কিন্তু পাকা ড্রাইভার বুঝলাম কিছুক্ষণ পরেই। পাহাড়ি পথে দুর্দান্ত সাবধানতার সঙ্গে গাড়ি ছোটালেন। রাজীব হিন্দি ঠিকঠাক বলেন। তবে ইংরেজি বা বাংলা একেবারেই জানা নেই। কী আর করা, আমরা ভাঙা ভাঙা হিন্দিতেই আলাপ জুড়ে দিলাম। এই কদিন এখানকার ড্রাইভারদের সঙ্গে থেকে বুঝেছি, নিয়মের বিষয়ে এখানকার পুলিশ খুব কড়া। কেউ হর্ন বাজান না। ওভারটেক করেন না। আইনভঙ্গ করলেই মুহূর্তেই পুলিশ এসে হাজির।    

জিঞ্জেস করলাম, ‘ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে ঘুষ লাগে না?’ বলল, ‘না। এখানে পরীক্ষা দিয়ে ঠিকঠাকভাবেই পাস করতে হয়। পাস না করলে লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ নাই।’ হেসে কিছুক্ষণ পর বলল, ‘অনেকে এখানে পাস করতে না পেরে অন্য রাজ্য থেকে দুই নম্বরি করে লাইসেন্স নিয়ে আসে। ওয়েস্ট বেঙ্গলে টাকা দিলেই লাইসেন্স পাওয়া যায়।’

গ্যাংটক শহর ছেড়ে আসতেই চোখে পড়ল অসম্ভব সুন্দর পাহাড়ি রাস্তা। যেখানে পাহাড় আর মেঘ খেলা করে প্রতিনিয়ত। পথে অনেক ঝরনা। হাজার হাজার ফুট উঁচু থেকে পানি পড়ছে। কখনো খুব কাছে, কখনো দূরে। কখনো পুরো রাস্তা মেঘে ঢাকা, মনে হবে গাড়িতে চড়ে আকাশে উড়ে যাচ্ছি। একপাশে উঁচু পাহাড়, অন্যপাশে হাজার ফুট নিচু খাঁদ। গাড়িটা পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে নামছে আবার উঠছে। একটা একটা করে পাহাড় জয় করে এগিয়ে চলেছি। মাঝে কয়েকবার রেস্তোরাঁয় গরম মম, পাকুড়া, কফি পান করতে করতে প্রকৃতির রাজ্য হারিয়ে যাওয়া। লাচুং ঢোকার ঠিক আগ মুহূর্তে আর্মি চেকপোস্টে আগের দিনের নেয়া পারমিট দেখালাম। গাড়ির মধ্যে থাকা প্লাস্টিকের বোতল তারা রেখে দিলেন।

কর্তৃপক্ষের সাফ কথা- ঘুরতে যাচ্ছ, যাও। প্লাস্টিক নিয়ে গিয়ে প্রকৃতি নষ্ট করবে- তা হবে না। ছবি তুলতে তুলতে সন্ধ্যায় পৌঁছলাম। মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত ৯ হাজার ফুট উচ্চতায় ছোট্ট শহর লাচুং। চারপাশে আকাশচুম্বী পাহাড়। ফেব্রুয়ারি মাস হওয়ায় পাহাড়ের চূড়াগুলো বরফে মোড়ানো।

হোটেলে নামতেই কনকনে শীত গায়ে বিঁধল। হাত মোজা দ্রুত পরে নিলাম। ম্যানেজার কৌশিক রায় এগিয়ে এলেন। উঁচু পেটটা আমার বুকে সেটিয়ে ধরে আলিঙ্গন করলেন। বাংলায় বললেন, ‘দাদা, লম্বা সফরে কষ্ট গেলো বেশ!’ না সূচক মাথা নেড়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি তো দারুণ বাংলা বলেন!’ বললেন, ‘ও মা! আমি তো বাঙালি। বাংলা বলবো না? আমার বাড়ি জলপাইগুড়ি। পেটের দায়ে এখানে থাকি।’ এরপর পেট নাচিয়ে হো হো করে হেসে উঠলেন। সামলে নিয়ে বললেন, ‘দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিন। রাতের খাবার রেডি করছি আমি। ওপরে চলে আসবেন। আর হ্যাঁ, পশ্চিম দিকে আর্মি ক্যাম্প। ভুলেও ছবি তুলবেন না ওদিকে। একদম ঠা ঠা করে দিবে।’ বলেই বন্দুকে গুলি ছোড়ার ভঙ্গি করলেন।

জানালেন, ‘এখানে ফোনের নেটওয়ার্ক পাবেন না। লাচুঙে নেটওয়ার্ক নেই।’

ঝটপট ফ্রেশ হতে গিয়ে বুঝলাম, এই পানি গায়ে লাগানো যাবে না। পানিটা যেন চামড়ায় সুই ফোটাচ্ছে। টয়লেটে যাওয়া আরো বিপদ! রুমের জানালা দিয়ে তাকিয়ে চোখে পড়লো উঁচু পাহাড়। জোৎস্না ভরা রাত হওয়ায় পাহাড়ের বরফগুলো ইউরেনিয়ামের মতো জ্বলজ্বল করছে। মাইনাস টু-তেই ধুয়ে ফেললাম হাত-পা। দ্রুত গেলাম ওপরে সবাই মিলে। বসে গেলাম খেতে। ভাতের সঙ্গে আলুর দম, মুরগির মাংস আর ডাল। দারুণ!

ঠান্ডা থেকে বাঁচতে কী করা যায় ভাবছিলাম। হোটেল লাগোয়া একটা দোকান পেলাম। বয়স্ক এক সিকিমিজ নারী মালিক। মোটা উলের সোয়েটার পরে প্যাকেট হয়ে আছেন। রুমে হিটার দেয়া। হিটার ঘিরে পাশের আর্মি ক্যাম্পের দুজন সোলজার। আরো কজন টুরিস্ট। কেউ ধূমপান করছেন। কেউ বিয়ার নিয়ে বসেছেন। প্রমথেশ আর রনিদা জায়গা করে নিলেন পাশেই। আমি আর টুটুলদাও বসে পড়লাম।

যেহেতু কোনোটাই পান করি না। হিটারের ওম নেয়ার চেষ্টা করলাম কিছুক্ষণ। পাশ থেকে একজন অপরিচিত বলল, ‘আপনাকে বাংলাদেশি মনে হচ্ছে। দেশি বাংলা উচ্চারণ শুনে ঘুরে তাকালাম। এতক্ষণ শীতের চোটে কোনোদিকে তাকানোর সুযোগ পাইনি। জবাব দিলাম, ‘হ্যাঁ, ঢাকায় থাকি।’ হেসে উঠলেন তিনি। বললেন, ‘আমরা পুরান ঢাকার চার বন্ধু।’ বলেই পাশের আরো তিনজনকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ কথাবার্তা শেষে বিদায় নিলাম। ঢুকে পড়লাম ফের হোটেলে।

সকালে উঠে দেখি এ এক অন্য রকম সকাল। স্নো-ফল হচ্ছে হালকা। পাহাড়ের চূড়াগুলো সোনার পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। কয়েক কিলোমিটার বরফ সরিয়ে রাস্তা তৈরি করেছে আর্মি। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে দেখা গেল বরফ পড়ে ফের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। পাহাড়গুলো বরফে ঢাকা পড়ে সাদা আর সাদা। যেন ওপরে কেউ সাদা রং ঢেলে দিয়েছে। পাইনগাছগুলোর ওপর বরফের আবরণ মনে হচ্ছে শিল্পীর ছোঁয়া।

কিছুদূর গিয়ে বুঝলাম, বরফের আস্তর এত মোটা যে গাড়ি যাওয়া অসম্ভব। আমরা এখানেই নামলাম। অনেক পর্যটক এখানে। সবাই বরফের ওপর চলার জন্য ৫০ রুপি করে রাবারের গামবুট ভাড়া নিলাম। গামবুট পায়ে দিয়ে সবাই বাঁধনহারা হয়ে গেলাম। কেউ দৌড়ে পাহাড়ে উঠছে, কেউ বরফ ছোড়াছুড়ি করছে। ছোটরা বরফের আইসডল বানাতে ব্যস্ত। টুটুলদাও বাচ্চাদের সঙ্গে আইসডল বানাতে মেতে উঠলেন।

হঠাৎ ধপ করে পড়ে গেলাম। হাতটা হালকা ছিলে গেলেও আনন্দের উত্তেজনায় কিছু মনে হলো না। চলছে ছবি তোলা আর ভিডিও। এ এক অদ্ভুত ভালোলাগা! বিস্ময় জাগা সব মুহূর্ত। স্বর্গে হারিয়ে যাবার মতো। ঘণ্টাখানেক পর গামবুটগুলো ফেরত দিয়ে রওনা হলাম গ্যাংটকের পথে। আফসোস থাকলো বরফের জন্য উমথাম যেতে না পারার। ১২ হাজার ফুট থেকে ফিরতে হলো।

সন্ধ্যায় ঢুকতে পারলাম গ্যাংটক। দেরি করলাম না। কারণ গ্যাংটক থেকে ছ'টার মধ্যে বেরোতে না পারলে রাংপো চেকপোস্ট থেকে পাসপোর্টে ডিপার্চার সিল নিতে পারবো না। আটটায় চেকপোস্ট বন্ধ। দ্রুত দার্জিলিঙের ট্যাক্সি ঠিক করে পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে ছুটলাম ফের। ঠান্ডা আর ভ্রমণের ধকলে সবাই ক্লান্ত। কিন্তু উত্তেজনা আছে আরও। ওদিকে অপেক্ষা করছে চা বাগান, রক গার্ডেন, মিরিক, টয় ট্রেন আরও কত কী!


ঢাকা/তারা