RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     শনিবার   ০৫ ডিসেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ২১ ১৪২৭ ||  ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

হিমলুং শিখরে রুদ্ধশ্বাস অভিযান: সূচনা পর্ব

ইকরামুল হাসান শাকিল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:১৮, ২২ জুন ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
হিমলুং শিখরে রুদ্ধশ্বাস অভিযান: সূচনা পর্ব

ভোর রাত ৪.৪৫ মিনিট। মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠলো। আমার ঘুম ভেঙে গেলো। চোখটা খুলতে পারছি না ঘুমের কারণে। মনে হচ্ছে দুনিয়ার সকল ঘুম আল্লাহ আমার চোখে ঢেলে দিয়েছেন। চোখ বন্ধ রেখেই ফোন রিসিভ করে বললাম, আসছি।

ঘুমভরা চোখ নিয়েই বাথরুমে ঢুকলাম। খুব দ্রুত প্রস্তুতি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বাসা থেকে। এখনো চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে আছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় নিজের ছায়ার সঙ্গে হাঁটছি। কয়েকটি নিশাচর কুকুর ছাড়া গলিপথে কেউ নেই। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গেইটের কাছে রফিক ভাই চা বিস্কুট সিগারেট বিক্রি করেন সারারাত। নানা পেশার মানুষ যারা রাতে রাস্তায় থাকে তারা রফিক ভাইয়ের গ্রাহক। মনে হয় সবার সঙ্গেই সে পরিচিত। আমার সঙ্গেও তার ভালো পরিচয়। আমিও প্রায় প্রতিদিন তার এখানে চা বিস্কুট খাই। আজও রফিক ভাইকে বললাম, ভাই দ্রুত এককাপ চা দিন। বলে নিজেই বয়াম থেকে দুটো বিস্কুট বের করে নিলাম। এরপর নিশ্চিন্ত মনে উঠে পড়লাম বাসে। ততক্ষণে বাস চলতে শুরু করেছে। অন্ধকারও অনেকটা কেটেছে। ৬টার মধ্যে চলে এলাম রমনা পার্কে।

প্রতিদিন সকালের রুটিন এটা আমার এবং আমাদের। বিপ্লব ভাইয়ের ফোনে আমাদের সবার ঘুম ভাঙে প্রতিদিন। তারপর আমরা বিএমটিসির সবাই একে একে ৬টার মধ্যে চলে আসি রমনা পার্কে। মুহিত ভাই আমাদের সবাইকে এখানেই নিয়মিত শরীরচর্চা করান। সামনে সেপ্টেম্বর, অক্টোবরে হিমালয় অভিযান। ফিটনেস ঠিক রাখতে কোনো প্রকার অবহেলার সুযোগ নেই। কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমেই আমরা অভিযানের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছি। প্রথমে রমনা পার্কের চারপাশে একাধিক চক্করে প্রায় ৭/৮ কিলোমিটার দৌড়ানো শেষে ঘণ্টাখানেক ব্যায়াম। তাবে এখনো আমরা জানি না, অভিযানে কে কে সুযোগ পাচ্ছি।

বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব (বিএমটিসি) সবসময়ই পর্বতারোহীদের শারীরিক ফিটনেসের উপর ছাড় দেয় না। তাই ক্লাব থেকেই সিদ্ধান্ত হয় কখন কাকে অভিযানের জন্য ডাকবে। তাই আমরাও সব সময় শারীরিকভাবে প্রস্তুত থাকতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। সকালে মুহিত ভাইয়ের সঙ্গে রমনায় আর সন্ধ্যায় একা একাই হাতিরঝিলে ব্যায়াম করছিলাম। ৭ হাজার মিটারি পর্বতের জন্য একটু বেশিই প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। যে কারণে অফিস শেষ করে হাতিরঝিলেও যেতে হয় ব্যায়াম করতে। এরপর বাসায় ফিরি। খাবারেও কিছুটা পরিবর্তন এনেছি। সময়মতো খাবার খাচ্ছি। রাত ১১ টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ছি। এক কথায় বলা চলে এই অভিযানের জন্য যতটা বেশি নিজের ফিটনেস বাড়ানো যায় ঠিক ততটা চেষ্টা করছি। তারপরেও জানি পর্যাপ্ত ফিটনেস আমার এখনো তৈরি হয়নি।

ক্লাব থেকে জানানো হলো এবারের অভিযান হবে ৭ হাজার মিটারি পর্বত। এই কথা শুনে সবাই ভীষণ আনন্দিত হলাম। আমরা যারা নবীন পবর্তারোহী আছি, ৭ হাজার মিটারি পর্বত আমাদের জন্য একটি মাইলফলক। সবাই ভীষণ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করি এর জন্য। একদিন ক্লাব থেকে জানানো হলো, স্পন্সরসহ সব কিছু যদি ঠিক থাকে তাহলে এবারের অভিযানে মুহিত ভাইয়ের নেতৃত্বে নুর মোহাম্মদ ভাই ও আমাকে পাঠানো হবে। আর যদি স্পন্সর দুজনের হয় তাহলে মুহিত ভাইয়ের সঙ্গে আমি থাকবো। যেহেতু নুর ভাই অভিজ্ঞ পর্বতারোহী এবং তিনি অনেকগুলো পর্বত অভিযান করেছেন। তার ঝুড়িতে ৫টি ৬ হাজার মিটারি পর্বত আরোহণের অভিজ্ঞতা আছে। তাই এবার নবীন হিসেবে আমি সুযোগ পাবো। সময় যেন যেতেই চাচ্ছে না। প্রতিটা মুহূর্ত মাথায় অভিযান নিয়ে নানান চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।

দেশের সবচেয়ে পুরনো ও নামি পর্বতারোহণ সংগঠন বিএমটিসি। সেই ক্লাবের ৩৩তম হিমালয়ান অভিযানের জন্য বাছাই করা হয়েছে হিমলুং পর্বত। এর উচ্চতা ৭ হাজার ১২৬ মিটার। হিমালয়ের মানাসলু ও অন্নপূর্ণা অঞ্চলের মাঝে নেপাল তিব্বত সীমান্তে এটি অবস্থিত। হিমলুং পর্বত স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘নেমজুং’ নামে। আবার হিমলুং-এর আরেক মানে হলো ঠান্ডা ঝড়ো বাতাস। সেক্ষেত্রে আগে থেকেই বলা যেতে পারে পর্বতারোহীদের এটি ক্ষমতা পরখ করে তবেই রেহাই দেয়। ১৯৮৩ সালে নেপাল ও জাপানের একটি যৌথ অভিযাত্রী দল প্রথমবারের মতো এই চূড়া আরোহণ করে। সকল প্রস্তুতিই শেষ। যদিও পরে জানা গেল শুধু মুহিত ভাইয়ের স্পন্সর হয়েছে। আমার এবং নুর ভাইয়ের এখনো স্পন্সর হয়নি। তাই মুহিত ভাইয়ের নামেই ইনভাইটেশন কার্ড ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। তাই এবারো আমাদের আর অভিযানে যাওয়া হচ্ছে না।

সংবাদ সম্মেলনের আগের দিন রাতে মুহিত ভাই আমাকে ফোন দিয়ে বললেন, ‘সকালে অনুষ্ঠানে আপনার দাঁড়ানো হতে পারে। এখনো নিশ্চিত না, তবে প্রস্তুতি নিয়ে আসবেন।’ যে অভিযানে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো প্রায় শূন্যের কোটায়, এখন সেটা আবার জেগে উঠলো। তাই আবার স্বপ্ন দেখা শুরু হয়ে গেলো। তারপরেও চিন্তা দূর হচ্ছিল না। সারা রাত আর ঘুম হলো না। সকাল ৯টার মধ্যেই প্রেসক্লাবে চলে এলাম। এসেই মুহিত ভাইয়ের কাছ থেকে সুখবরটি পেলাম। অবশেষে আমিও যাচ্ছি অভিযানে। এটা যে কতো বড় সুখবর আমার জন্য তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। কিছু সময়ের জন্য থমকে রইলাম আনন্দে!

গত বছর ২৭ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে পতাকা প্রদান ও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠানে আমাদের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়া হলো। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ব্র্যাকের চেয়ারপার্সন হোসেন জিল্লুর রহমান স্যার। তিনি আমাদের শুভকামনা জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বললেন, ‘পর্বতারোহণ নিছক সৌখিনতা নয়, কিংবা পর্বত বিজয় পর্বতারোহণের মূল উদ্দেশ্য নয়। বিশ্বের প্রকৃতি ও জলবায়ু যে ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে, পর্বতারোহীরা সে সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করবে বলে আমি আশা করছি।’ অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন নেপাল দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ধন বাহাদুর ওলী এবং অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন আমাদের মেন্টর বিএমটিসির প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্টার্কটিকা ও সুমেরু অভিযাত্রী ইনাম আল হক স্যার। আমাদের এবারের হিমলুং অভিযানের পৃষ্ঠপোষকতা করছে ইস্পাহানি টি লিমিটেড ও ডানো (আরলা ফুডস বাংলাদেশ লিমিটেড)। প্রেসক্লাবে প্রেস কনফারেন্স হলো উৎসবমুখর। পরদিন দেশের প্রায় সবগুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলো সে খবর। যা আমাদের উদ্যোম বাড়িয়ে দিলো কয়েকগুন।


ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়