ঢাকা     সোমবার   ১০ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৬ ১৪২৭ ||  ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

স্বামী বিবেকানন্দের জন্মভিটায়

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:২১, ৪ জুলাই ২০২০  
স্বামী বিবেকানন্দের জন্মভিটায়

মা আর মামিকে নিয়ে কলকাতা চষে বেড়াচ্ছি। সকালবেলা বের হয়েছি সিথির মোড়ে মামার বাসা থেকে। ঘুরে বেড়াচ্ছি নন্দন কানন থেকে প্রিন্সেপ ঘাট। ঘুরতে ঘুরতে চলে এলাম ৩ নং গৌরমোহন স্ট্রিটে স্বামী বিবেকানন্দের জন্মভিটায়।

১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি এই বাড়িতেই স্বামী বিবেকানন্দ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শৈশব ও প্রথম যৌবনে বিবেকানন্দ এই বাড়িতেই থেকেছেন। নরেন্দ্রনাথ দত্ত থেকে স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে ওঠা যুবকের জীবনের গল্প কম-বেশি সবাই জানেন। বাঙালি জাতিকে বিশ্ব মঞ্চে তিনিই প্রথম তুলে ধরেন। শিকাগোর সেই ধর্ম সভার গল্প পাঠকের অজানা নয়। নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখা, সমস্যায় বুক চিতিয়ে লড়া, সমাজের সকলকে এক করে দেখার অনুপ্রেরণা- এই মহান বাঙালির কাছ থেকেই পাওয়া।

এর আগে যখন এসেছিলাম তখন বাড়ির মিউজিয়ামটি বন্ধ ছিলো। এ কারণে আজ সময় নিয়ে একটু আগেভাগেই এসেছি। এখনো প্রবেশ দ্বার খোলেনি। অপেক্ষার পাশাপাশি আশপাশের ছবি তুলছিলাম। এমন সময় ঘড়ির কাঁটায় ঢং ঢং আওয়াজ হলো। অর্থাৎ বারোটা বেজে ত্রিশ পূর্ণ হলো। প্রবেশ দ্বার খুলতেই আমরা ঢুকে পড়লাম। প্রথমেই চোখে পড়ল বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘ছবি তোলা নিষেধ’। মন খারাপ হয়ে গেলো। এতো সুন্দর জায়গায় এলাম কিন্তু ছবি তুলতে পারব না! মনকে সান্ত্বনা দিলাম, এই মহাপুরুষের জন্ম ভিটায় পা দেয়াটাও ভাগ্যের ব্যাপার। যাই হোক, আমরা পদব্রজে এগিয়ে চললাম। বাড়ির প্রতিটি ঘরে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে স্বামীর ব্যবহৃত তৈজসপত্র। কর্তৃপক্ষ শতভাগ চেষ্টা করেছে স্বামীজির শৈশবের স্মৃতি তুলে ধরার জন্য। শিব মন্দিরও পেলাম। কথিত আছে শিবের উপাসনা করতেন স্বামী বিবেকানন্দের মা ভুবনেশ্বরী দেবী। অন্যরকম পরিবেশ, চারপাশে ধুপকাঠির মহোনীয় সুবাস! কোলাহল নেই।

লক্ষ্য করলাম, প্রতিটি জায়গায় স্বামীজির স্মৃতি জীবন্ত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। বাড়িতে দুর্গা মন্দিরও রয়েছে। প্রতি বছর দুর্গাপূজা হয়। প্রতিটি দেয়ালে স্বামীজির বাণী সম্বলিত বোর্ড ঝুলছে। দেখতে দেখতে কীভাবে যে সময় কেটে গেল! এবার বিদায় নেবার পালা। বলে রাখা ভালো, ১৮৮৪ সালে বিবেকানন্দের বাবা বিশ্বনাথ দত্তের মৃত্যুর পর এই বাড়িরই বাসিন্দা বিবেকানন্দের কাকিমা বাড়ির দখল নিতে চেয়েছিলেন। তিনি বিবেকানন্দের মা ভুবনেশ্বরী দেবী এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। নিম্ন আদালতে বিবেকানন্দের জয় হয়। কিন্তু মামলাটি পরে উচ্চ আদালতে ওঠে। হাইকোর্টে মামলাটি অনেক দিন চলেছিল। ১৯০২ সালে বিবেকানন্দের মৃত্যুর কিছুদিন আগে মামলার নিষ্পত্তি হয়। রায়ে বিবেকানন্দ বাড়ির পূর্ণ অধিকার পেয়েছিলেন।

১৯৬২ সালে রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃপক্ষ বাড়িটি অধিগ্রহণ করে। ১৯৯৯ সালে মিশন জমির দখল নেয় এবং পাশের কিছুটা জমি পশ্চিমবঙ্গ সরকার দান করে। মিউজিয়ামের জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়। কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার ও জনসাধারণের দান থেকে এই কাজের জন্য কমিটি ১০ কোটি টাকা পায়। ২০০৪ সালে বাড়িটির উদ্বোধন করা হয় ‘রামকৃষ্ণ মিশন স্বামী বিবেকানন্দ’স অ্যানসেসট্রাল হাউজ অ্যান্ড কালচারাল সেন্টার’ হিসেবে। এটি এখন মিউজিয়াম এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে গবেষণা কেন্দ্র, স্মারক পূজাকক্ষ, গ্রন্থাগার, ইংরেজি শিক্ষাকেন্দ্র, কম্পিউটার শিক্ষাকেন্দ্র ও দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে। নিয়মিত সেমিনার আয়োজিত হয়। স্বামী বিবেকানন্দের আধ্যাত্ম-চিন্তা, বেদ, উপনিষদ সম্পর্কে তাঁর বাণী নিয়ে চর্চা করতে এবং উনবিংশ শতকে বাংলার নব জাগরণের পরিপ্রেক্ষিতে তার গুরুত্ব এবং আজকের দিনে তার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে অধ্যয়ন করতে দেশ-বিদেশের বহু গবেষক এখানে আসেন।

কলকাতা বিমানবন্দর থেকে ৩ নং গৌরমোহন স্ট্রিটে অবস্থিত স্বামী বিবেকানন্দের জন্মভিটার দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। বিমানবন্দর, রেলস্টেশন থেকে যে কেউ ট্যাক্সি অথবা অটো ভাড়া করে যেতে পারবেন। চাইলে বাসেও যাওয়া সম্ভব। মিউজিয়ামে ঢুকতে ফি দিতে হয় না। সাপ্তাহিক বন্ধ সোমবার। 
 

 

ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়