RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১৫ ১৪২৭ ||  ১২ সফর ১৪৪২

গ্যাংটকের আকাশে প্যারাগ্লাইডিং

সিয়াম সারোয়ার জামিল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:০৭, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
গ্যাংটকের আকাশে প্যারাগ্লাইডিং

গ্যাংটকে এসেছি দুই দিন হয়ে গেল। পরিকল্পনা অনুযায়ী আরো দুই তিনদিন থাকার কথা। লাচুং এক রাত। মান্নুদার হোটেলেই আছি। এখানকার খাবার যাই হোক, দাদার আপ্যায়নে কমতি নেই। তাই হোটেল চেঞ্জ করার কথা চিন্তা করিনি। আগের দিন নাথুলা পাস, বাবা মন্দির আর সাংঙ্গু লেক ঘুরেছি। আজ ভোর বেলা বাজরা স্টেশনের দিকে গেলাম। হোটেলে ঢুকলাম ব্রেকফাস্ট করতে। বসেছিলাম জানালার পাশে, সেখান থেকে মোটামুটি পুরো গ্যাংটক শহর দেখা যাচ্ছিল।

হঠাৎ করেই চোখ আটকে গেল আকাশে। কিছু একটা উড়ছে। হ্যাঁ ঠিকই দেখছি। প্যারাগ্লাইডিং হচ্ছে। এই জিনিস দেখেই উতলা হয়ে উঠলেন টুটুল ভাই। যেকোনো ভাবেই হোক প্যারাগ্লাইডিং করতে হবে তাকে। আমাদের টানাটানি শুরু করলেন। ভেবেছিলাম, আজ শহরটা আরেকটু ঘুরে দেখব। সেটা আর সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে হলো। রনিদাও সায় দিলেন। দ্রুত ব্রেকফাস্ট শেষ করেই খোঁজ নিয়ে ট্যাক্সি ঠিক করে নিলাম- রিজার্ভ যাওয়া আসাসহ।

যেতে যেতে প্যারাগ্লাইডিংয়ের ব্যাপারে ট্যাক্সি ড্রাইভারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। কথায় কথায় উনি বললেন, ৭০ কেজির বেশি কারো ওজন হলে নাকি এই রাইড দিতে পারবে না। আমার ওজন ৬০ কেজি হওয়ায় খুশিতে আটখানা। কিন্তু যার উত্তেজনা সবচেয়ে বেশি, সেই টুটুলদা মনের মধ্যে ধাক্কা খেলেন। তার ওজন আশি কেজির কম হবে না। এতো আশা নিয়ে যাচ্ছেন, যদি না করতে পারেন, তাহলে কী হবে! মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল শঙ্কায়।

সৃষ্টিকর্তার নাম নিতে নিতে চলে গেলাম সবাই। টিমে এসেছি। টিমের সবাই একই কাজ করব। নইলে করব না। যাওয়ার পর প্রথমেই আমাদের একে একে ওজন মাপাতে শুরু করলাম। টুটুলদা পায়ের জুতা সবে খুলতে শুরু করেছেন দেখে গাইডরা জানালেন, জুতা খুলতে হবে না। স্বাভাবিক পোশাকে ওজন মাপলেই হবে। আমি তাদের বোঝাতে চেষ্টা করলাম টুটুলদার ওজন বেশি হবে তাই জুতা খুলে নিক। সবাই হেসে ফেলল আমার কথা শুনে। গাইড বারবার বললেন, খুলতে হবে না।

মুখ গোমড়া করে উঠলেন টুটুলদা। উঁচু পেটটা কমিয়ে এমনভাবে ওজন মাপার যন্ত্রে উঠলেন, যেন পেটের বাতাস বের করলেই ওজন কম দেখাবে। কিন্তু তার পেট কমিয়ে খুব একটা লাভ হলো বলে মনে হলো না। স্পষ্টভাবে মিটারে উঠে গেল ৮৩ কেজি। টুটুলদা বললেন, জুতা জ্যাকেট এগুলার জন্য বেশি ওজন দেখিয়েছে। আমি ফোড়ন কাটলাম, হ্যাঁ। ড্রেস, জুতো, জ্যাকেট খুলে ফেললে আপনার ওজন শুধু ২৫ কেজি হয়ে যাবে। খুলে ফেলুন।

প্রমথেশদা আর রনিদা দুজনেই হো হো করে হেসে ফেললেন। টুটুলদার মুখ শুকিয়ে গেছে ততক্ষণে। দাদার মুখ দেখে এক গাইড বললেন, ওজন বেশি হলেও সমস্যা নেই রাইডে ওঠা যাবে। ৮৫ কেজি পর্যন্ত তারা গ্রহণ করেন। সাথে সাথে টুটুলদা লাফ দিয়ে উঠলেন। বয়স চল্লিশ হলেও মুহূর্তেই তা কমে যেন কলেজপড়ুয়া যুবকের মতো হয়ে গেল। সবাই মিলে হেসে ফেললাম। থামালাম টুটুলদাকে। বললাম, দ্রুত রেডি হন।

প্যারাগ্লাইডিঙের দুই রকম প্যাকেজ আছে এখানে। একটা বারোশ ফুট উচ্চতার। সেটাতে আবহাওয়া ভালো থাকা সাপেক্ষে সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে জুলাই পর্যন্ত প্যারাগ্লাইডিং করা হয়। খরচ নেয় ২৫০০ রুপি। এটাই অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ সময় ধরে চলে। আরেকটি আছে। ২৭০০ ফুট উঁচু। অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত এখানে প্যারাগ্লাইডিং করা হয়। খরচ নেয় পাঁচ হাজার রুপি। আমরা ২৫০০ রুপিরটাতে উঠব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।

ঝটপট ফরমালিটি অনুযায়ী পুরণ করে ফেললাম তাদের নির্ধারিত ফর্ম। ফর্মে লেখা ছিল- প্যারাগ্লাইডিং করতে গিয়ে কোনো প্রকার দুর্ঘটনার কারণে মৃত্যু হলে সেজন্য তারা দায়ী থাকবেন না। দায়ী থাকব আমি নিজেই। শুনে টুটুলদা ফের ভয় পেলেন। পিছু হটলেন যেন। জান চলে গেলে তো আর ফেরত পাওয়া যাবে না! বোঝালাম, এটা সব ঝুঁকিপূর্ণ রাইডেই স্বাক্ষর করতে হয়। বাস্তবে কে শোনে এসব? কিছুক্ষণ গাইগুই করে রাজি হলেন।

ওই মুহূর্তে সবার মনের মধ্যেই এডভেঞ্চার কাজ করছে। তবে টুটুলদার মনের শঙ্কা গেল না। কেমন যেন ভয়-ভয় ভাব ফিরে এসেছে। একটু আগের প্রাণচঞ্চল্য মুখে এবার আঁধার নেমেছে যেন। আমাদের মধ্যে কেবল তিনিই বিবাহিত! ঘর আছে, সংসার আছে। বাচ্চাও আছে। বললাম, টেনশন কইরেন না। কিচ্ছু হবে না। দাদা কষ্ট করে হাসলেন। দ্রুত আমরা সবাই প্রস্তুত হলাম। অপেক্ষা করছিলাম, কখন পাহাড় থেকে লাফ দেব।

ফর্মপূরণ শেষে তাদের নির্ধারিত গাড়িতে উঠলাম। চলে গেলাম আরো ১০ কিলোমিটার উপরে। পাহাড় বেয়ে বেয়ে গাড়ি উঠে গেল বড় একটি পাহাড়ের চূড়ায়। সেখান থেকে গ্যাংটক শহর দেখা যাচ্ছিল। অদ্ভুত সৌন্দর্য! মনে হলো পুরো শহরটাই একটা স্বর্গ। একেকটা বসতবাড়ি-হোটেল যেন, পাহাড়ের থরে থরে সাজানো একেকটা অলঙ্কার। সব প্রস্তুতি শেষ করে এবার লাফ দেয়ার পালা। শুরুতেই প্রমথেশদাকে দেয়া হলো। তিনি নির্বিঘ্নে লাফ দিলেন।

এরপর টুটুলদাকে পাহাড় থেকে ছুড়ে দেয়ার পালা! তিনি বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়ালেন। ব্যাপারটা বুঝে এগিয়ে গেলাম। ফের মোটিভেশন দিয়ে তাকে ছেড়ে দিলাম। চোখটা বুজে কী একটা ভাবলেন যেন। হয়তো দোয়া দরুদ পড়লেন। সৃষ্টিকর্তাকে ডাকলেন। এরপর লাফ দিলেন। গাইড তাকে সাপোর্ট দিলো বেশ। শুরুতে কিছুক্ষণ চিৎকার করলেও মুহূর্তেই মুখে হাসি দেখা গেল। এরপরে আমরা একে একে সবাই পাহাড় থেকে লাফিয়ে পরলাম।

আমারও যে একআধটু ভয় লাগছিল না, তা নয়। তবে লাফ দেয়ার ১০ সেকেন্ড আগে থেকে লাফানোর পর ৫ সেকেন্ট পর্যন্ত ভয় লেগেছিল। তারপর আর ভয় লাগেনি। পরবর্তী ৮ মিনিট ছিল এক স্বর্গীয় অনুভূতি। মনে হলো, সত্যিই জীবন অনেক বেশি সুন্দর। এ জীবনই আসল জীবন। পোড় খাওয়া ঢাকার রাস্তাঘাট, গাড়ির হর্ন, মেট্রোরেলের ধুলো, বিষাক্ত কার্বন-সীসার বায়ু সব ভুলে গেলাম। মনে হলো, আমি অন্য কোথাও চলে গেছি। অন্যরকম স্বর্গে।


ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়