RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ০১ নভেম্বর ২০২০ ||  কার্তিক ১৭ ১৪২৭ ||  ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

মেলাকা নদীর যত গল্প (দ্বিতীয় পর্ব)

ফাতিমা জাহান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৪৪, ৬ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৪:৫৬, ১২ অক্টোবর ২০২০
মেলাকা নদীর যত গল্প (দ্বিতীয় পর্ব)

ক্রাইস্ট চার্চ, রেড স্কয়ার

পর্তুগিজদের প্রথম স্থাপনা দুর্গ ‘আ ফামোসা’। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন ইউরোপিয় এ স্থাপনার নির্মাণকাল ১৫১১ খ্রিস্টাব্দ। মেলাকা হেরিটেজ টাউনের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এ দুর্গের অবশিষ্ট এখন আছে শুধু প্রবেশদ্বার। প্রাথমিকভাবে বিশাল এলাকাজুড়ে নির্মাণ করা হয়েছিল দুর্গটি। বাকি অংশের ভগ্নাবশেষ মেলাকা নদীর আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। পর্তুগিজ সরকার মেলাকা ছেড়ে চলে যাবার পর ওলন্দাজ বাহিনী দুর্গটি ব্যবহার করে। এরপর ১৮০৬ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজ ক্রাউন কলোনির সময়ে দুর্গটি ভেঙে ফেলা হয়। বর্তমানে একটি বিশাল ইটপাথরের দ্বার আর কয়েকটি কামান ছাড়া দুর্গের অবশিষ্ট আর কিছুই নেই। প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে প্রচুর পর্যটক ভিড় করেন এই প্রাচীন স্থাপনাটি দেখার জন্য। আমার মেলাকা ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল এই স্থাপনাগুলোর সঙ্গে বাস্তবে পরিচিত হওয়া।

আ ফামোসা থেকে ১০-১২ মিনিটের হাঁটা পথ ধরে পাহাড়ের ওপরে সিঁড়ি বেয়ে চললাম পর্তুগিজদের রেখে যাওয়া আরেকটি প্রাচীন স্থাপনা সেইন্ট পল’স চার্চ দেখতে। নির্মাণকাল ১৫২১ খ্রিস্টাব্দ। সেসময় ছোট পরিসরে গির্জার কাজ চালানো হতো। কিছু সময় পর ১৫৫৬ সালে গির্জাঘরটিকে সম্প্রসারিত করা হয়, দোতলাও নির্মাণ করা হয়। ১৫৯২ সালে গির্জার পাশে পর্তুগিজদের নিজেদের প্রয়োজনে সমাধিভূমি নির্মাণ করা হয়। ওলন্দাজ শাসনামলেও গির্জাটি প্রার্থনা ও অন্যান্য সামাজিক কাজে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু ইংরেজ শাসনামলে রক্ষণাবেক্ষণ না করার ফলে গির্জাটি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

নিয়োনিয়া লাকসা খাবার

গির্জার পাহাড় থেকে সমুদ্রবন্দর ও মেলাকা শহরের অনেকখানি দেখা যায়। যতদূর চোখ যায় শুধু পর্তুগিজ আর ওলন্দাজ (ঔপনিবেশিক) ধাঁচের সারি সারি বাড়ি, যার দোচালা বা চারচালা ছাদ লাল টালি দিয়ে ঢাকা, আর বাইরের দেয়াল সাদা। তারও ওপারে অথৈ নীল সাগর। বোঝা যাচ্ছে মেলাকার জনগণ শহরের সৌন্দর্য্য রক্ষায় যত্নশীল। যদিও হেরিটেজ টাউন থেকে বের হলেই চোখে পড়বে অত্যাধুনিক সুউচ্চ দালানকোঠা। সাধু পলের গির্জাটি বোধহয় ফটোশুটের অন্যতম স্থান। এক ভারতীয় মালয়েশিয়ান দম্পতির বিবাহোত্তর ফটোশুট চলছিল। তারপর এক চাইনিজ মালয়েশিয়ান দম্পত্তির।  

গির্জার বাইরে সাধু পলের মূর্তি যেন আজও ভগ্নপ্রায় গির্জাটিকে পাহাড়া দিয়ে যাচ্ছে। দূর থেকে সাধু পলকে মনে হলো জীবন্ত সত্তা। পাহারা দিচ্ছেন গির্জা, পাহারা দিচ্ছেন পাহাড়, পাহারা দিচ্ছেন আশপাশের পর্তুগিজ কবর, পাহারা দিচ্ছেন আকাশ, পাহারা দিচ্ছেন সমুদ্র, বুকে আঁকড়ে ধরে ক্রস।   

গির্জার ভেতরে গিয়ে দেখলাম তার ছাদ উধাও। শুধু কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে চারপাশের দেয়াল। আর ভেতরে সারি বেঁধে রাখা আছে পর্তুগিজদের সমাধিপ্রস্তর। সপ্তদশ শতাব্দীতে পর্তুগিজ ভাষায় লেখা অনেকগুলো সমাধিফলক চোখে পড়ল। কে জানে বাণিজ্য করতে আসা বা রাজ্যের কর্মকর্তা হয়ে আসা এ মানুষগুলোর সমাধিই বা কোথায় অথবা কোথায় তাদের বংশধরেরা, কে বা তাদের মনে রেখেছে! কাছেই পর্তুগিজ সমাধিভূমি।

মেলাকার ঐতিহ্যবাহী ডেসার্ট গুলা মেলাকা

গির্জার পাহাড় থেকে নেমে সোজা চললাম মেলাকা নদীর পাড়ে দুপুরের খাবার খেতে। কিন্তু মন আমার ঘুরঘুর করছিল পর্তুগিজ স্থাপনার আশপাশে সেই ষোড়শ শতাব্দীতে। মেলাকার খাবারের সুনাম দূর দূর অবধি প্রসারিত। তাই অর্ডার করলাম এখানকার প্রসিদ্ধ ‘নিয়োনিয়া লাকসা’। এক ধরনের রাইস নুডলস যা ঘন নারকেলের স্যুপের সঙ্গে খেতে হয়, সাথে সেদ্ধ ডিম, চিংড়ি আর মুরগির মাংস। খানিকটা ঝাল আর খানিকটা টক মিষ্টি এ স্লারপি স্যুপ নুডলস নিঃসন্দেহে যে কোনো পর্যটককে মেলাকার কাছে টানবে স্বাদ এবং ঘ্রাণের কারণে। পরে অবশ্যই মিষ্টি হিসেবে খেতে হয় রঙবাহারি নিয়োনা কেইক। দেখতে বরফির আকার আর রং নীল, সবুজ, লাল, গোলাপী ক্যান্ডির মতো। রং দেখলে মনে হয় যেন ছোটবেলা ফিরে পেয়েছি। দেখেই চোখের তৃষ্ণা যেন আরও বেড়ে যায়। খেলে শুধুই খেতে ইচ্ছে করে।   

খেয়েদেয়ে ছুটলাম পর্তুগিজ বংশধরদের গ্রাম সেইন্ট জন’স ভিলেইজ- এ। আমার মাথায় তখন গত হয়ে যাওয়া পর্তুগিজদের ভূত সওয়ার করেছে। লাল লম্বা স্কার্ট, সাদা ফুল শার্ট আর লাল জ্যাকেট পরা, মাথায় স্কার্ফ বাঁধা নারী আর জলদস্যুর মতো পোশাক পরা পুরুষরা যেন এখনই আমার চোখের সামনে ঘোরাঘুরি করছে। মনে হচ্ছিল এবার বুঝি পর্তুগিজ জলদস্যুর দেখা মিলবেই যেমন দেখা মেলে সিনেমায়।

গ্রামটি মেলাকা হেরিটেজ টাউন থেকে সাড়ে চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, ট্যাক্সি চেপে পৌঁছে গেলাম দশ মিনিটে।  বর্তমানে যারা বাস করছেন তাদের বলা হয় ক্রিস্ট্যাং। যার অর্থ পর্তুগিজ ভাষায় খ্রিস্টান। এদের পূর্বপুরুষ চাকরি বা ব্যবসার কাজে এদেশে এসেছিলেন, পরে মেলাকার স্থানীয় নারী বিয়ে করে এখানেই থেকে গেছেন, ষোড়শ শতাব্দীর আশপাশের সময়ে ইউরোপিয় নারীদের সমুদ্র পাড়ি দেওয়ায় নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। তাতে নাকি ধর্মভ্রষ্ট হবার আশঙ্কা ছিল।

মেলাকার প্রাণকেন্দ্র রেড স্কয়ার

তাঁদের ভাষা পর্তুগিজ তবে এ ভাষাকে ক্রিসট্যাং ভাষাও বলা হয়। কারণ কালের বিবর্তনে আর মূল ভূ-খণ্ডে অবস্থান না করার কারণে ভাষা খানিকটা পরিবর্তিত হয়েছে। গ্রামটিতে পর্তুগিজ খাবারের রেস্টুরেন্ট প্রচুর। সমুদ্রসৈকতের কাছাকাছি হওয়ায় পর্যটক আসেন অনেক। তবে বেশিরভাগই ইউরোপিয় ভ্রমণার্থী। পর্তুগিজদের বংশধদেরও দেখা মেলে। কারণ এখনো তারা তাদের সংস্কৃতির কিছু অংশ যেমন নাচ, গান, বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান ধরে রেখেছেন। পর্তুগিজ আমলের স্থাপনা কিছুই নেই। সব বাড়িঘর ডাচ বা ইংলিশ ধাঁচে নির্মিত। তবুও এশিয়া মহাদেশে এ যেন এক টুকরো পর্তুগাল। অনেকে একে মিনি লিসবন বলে থাকেন। আর নারী-পুরুষরাও সবাই সাধারণ পোশাক পরে আছেন। অবশ্য উৎসবের সময় অন্য কথা। আর জলদস্যুর দেখা পাওয়া, সে তো এখন শুধু কল্পনায়ই সম্ভব।    

রাতের খাবার খেলাম সমুদ্রতটের একটি রেস্টুরেন্টে। অবশ্যই তা পর্তুগিজ খাবার, মাছের একটি আইটেম ‘পর্তুগিজ গ্রিলড ফিস’। মাছকে বিভিন্ন মসলা সহযোগে কলাপাতায় মুড়িয়ে গ্রিল করা হয়। টেবিলে আসার সাথে সাথেই সাবাড় করে জোরে জোরে বললাম ডেলিসিয়োসো। রেস্টুরেন্টের বেশ কয়েকজন হো হো করে হেসে উঠল। একজন জিজ্ঞেস করল আমি স্প্যানিশ কিনা। হায় পাখি মন, সাধারণ এশিয়ানের এক শব্দ ভাষাবিদ্যায় মন ছুটে মেডিটেরিনিয়ান সাগর পাড়ে! আমার রক্তে যে শুধুই ভ্রমণ খেলা করে, আর মনে খেলে শব্দ।

কথা হলো রেস্টুরেন্ট মালিকের সঙ্গে। নাম মারটিম, দেখতে তো একেবারে পর্তুগিজদের মতো। আগে মাছ ধরতেন। এখন এখানে কিছু বছর ধরে ট্যুরিস্ট আসতে থাকার কারণে ব্যবসা ধরেছেন। সংসারী হয়েছেন একই গোত্রের মেয়ে বিয়ে করে। নাবিকের বংশ তাঁদের। সাগর সবসময় টানে। মাঝে মাঝে ছুটে যান সাগরের বুকে নৌকো নিয়ে। নোনা জলের অমোঘ টান এড়াতে পারেন না। মাঝরাতে শুনতে পান হয়তোবা কোন জলপরীর গান বা কিছুই না, শুধুই সাগরের মায়াজাল। এরকম মায়াজাল চারপাশে বোনা থাকলে কেনই বা জাগতের জালে জড়িয়ে পড়া!

সেইন্ট পল'স চার্চ

মারটিম আর তার দলকে বিদায় জানিয়ে চলে এলাম মেলাকা নদীর পাড়ে, আমার ক্ষণিকের মায়াজালের কাছে। রাতে যে কোনো নদীই নিজস্ব রূপ মেলে ধরে। সে রূপ শুধু দু’চোখ ভরে দেখতে হয়। কাউকে বলতে নেই, লিখতে নেই, গাইতেও নেই।

পরদিন নাস্তা খেতে গেলাম আমার হোম স্টের পাশেই একটি রেস্টুরেন্টে। এখানে মেলে বিখ্যাত ‘চিকেন রাইস বল’। অতি সুস্বাদু এ খাবারটি আসলে ভাতের তৈরি ছোট ছোট বল সঙ্গে স্টিমড অথবা রোস্টেড চিকেন। এই বিশেষ ধরনের ভাত পানির বদলে চিকেন ব্রোথ দিয়ে রান্না করা হয় তাই এত লোভনীয়। (চলবে)

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়