Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০২ ডিসেম্বর ২০২১ ||  অগ্রহায়ণ ১৮ ১৪২৮ ||  ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

সমরখন্দে নীল মাদ্রাসা

সঞ্জয় দে || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:০০, ১১ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৭:১৭, ১১ মার্চ ২০২১
সমরখন্দে নীল মাদ্রাসা

উলু বেগ মাদ্রাসা

বোয়িংয়ের লক্কড়ঝক্কড় উড়োজাহাজ যখন সমরখন্দের মাটি স্পর্শ করলো, আমি যেন মুখে হাসি, বুকে বল ফিরে পেলাম। পাবো নাই-বা কেন? তাসখন্দের এয়ারপোর্ট থেকে উড়াল দেওয়ার পর উড়োজাহাজের পাখা যেভাবে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ তৈরি করছিল, মনে হচ্ছিল ওগুলো যেন মরচে ধরা ধাতুর জঞ্জাল!

উড়োজাহাজের ফিউসলজের সঙ্গে আটকে থাকাটাই যেন এক অলৌকিক ঘটনা! ওদিকে আমাদের পায়ের নিচে নীলচে কার্পেট ধূলিধূসরিত, বিবর্ণ। কার্পেটের এখানে-ওখানে যাত্রীদের হাত থেকে ছলকে পড়া তরলের মানচিত্র। অর্থের অভাবে এরা যে প্লেনের দেখভাল খুব একটা ভালোভাবে করতে পারে না- সেটি স্পষ্ট। অথচ তাসখন্দের এয়ারপোর্টে ফেলে রাখা কয়েকটি অতিকায় ইলিউচিন উড়োজাহাজের কঙ্কাল দেখে মনে পড়ল এককালে কিন্তু এই তাসখন্দেই তৈরি হতো এমন দুনিয়াকাঁপানো ভারী ওজনবাহী বিমান। যে বিমান যুদ্ধক্ষেত্রে মুহূর্তেই উড়িয়ে নিয়ে যেত কামান কিংবা মিসাইলবাহী ভারী ট্রাকের বহর।

আর আজ? ফেলে আসা বসন্তসময়ের সাক্ষী হয়ে তারা ডুবে আছে এয়ারপোর্টের কোণে গজিয়ে ওঠা এক মানুষসমান ঘাসবনে। এই যে তাসখন্দ এয়ারপোর্ট, এটি কিন্তু সুবিশাল। টার্মিনালগুলো বিশাল নয়, বিশাল হচ্ছে ভেতরকার রানওয়ের জমিন। ফলে আন্তর্জাতিক টার্মিনাল এক কোণে আর অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল কয়েক মাইল দূরে অন্যদিকে। একটি থেকে অন্যটিতে যেতে হলে রীতিমতো ট্যাক্সি ভাড়া করে যেতে হয়। আর এই বিশালত্বের অন্যতম কারণ আফগান যুদ্ধ। তাসখন্দ থেকে কাবুল অবধি তখন গড়ে ওঠে বিমানসেতু। সে সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সৈন্য আর যুদ্ধের রসদ জড়ো করে তাসখন্দে এনে একত্র করে তারপর উড়িয়ে নেওয়া হতো কাবুল। একইভাবে কাবুল থেকে ভাগ্যক্রমে প্রাণ বাঁচিয়ে যারা ফিরে আসতেন, তাদের বহনকারী সামরিক বিমানের চাকাও স্পর্শ করত এই তাসখন্দের মাটি। এখানে নেমে নিজ নিজ বাড়ির ট্রেন ধরে সৈনিকেরা চলে যেতেন কাজান, আস্ত্রাখান কিংবা হয়তো নভসিবিরস্ক শহরে আঁচল পেতে অপেক্ষারতা মায়ের কাছে। তাসখন্দ তখন এই হতোদ্যম, আহত, আতঙ্কিত, ভোদকায় চূড় হয়ে থাকা তরুণদের পদভারে মুখর গমগমে এক শহর।

সমরখন্দ এয়ারপোর্ট

একদার সেই প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর শহর তাসখন্দ থেকে সমরখন্দ আকাশপথে মাত্র চল্লিশ-পঞ্চাশ মিনিটের পথ। বিমানবালা পাতলা কাগজের গ্লাসে জল পরিবেশনের সঙ্গে সঙ্গেই ক্যাপ্টেন সাহেব ঘোষণা করলেন, ‘আমরা এখন নামছি। দয়া করে তরল পান আর তরল বর্জনের কাজটি জলদি সারুন।’ মনে যথেষ্ট কু গাইলেও শেষ অবধি কিন্তু কৌশলী পাইলট বেশ মুন্সিয়ানার সঙ্গে বিমানটি নিচে নামিয়ে আনেন। এখানে নেমে দেখি তাসখন্দের মতো একই অবস্থা! দোকানপাটের দেখা নেই। বলতে গেলে সেই আগের রাতে রওনা দিয়েছিলাম জর্জিয়া থেকে। সেখান থেকে মাঝরাতে বাকু। বাকুতে বেশ কয়েক ঘণ্টার যাত্রাবিরতি। তারপর তাসখন্দ। তাসখন্দের এয়ারপোর্টের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে ঢুকে আশা ছিল কোনো রেস্তোরাঁয় বসে কিছুমিছু খেয়ে নেব। কিন্তু কোথায় কী? এর চেয়ে পাড়াগাঁয়ের বাসস্ট্যান্ডেও বোধকরি বেশিসংখ্যক চা-বিস্কুটের দোকান থাকে।

সুনসান নীরব সেই টার্মিনালে আছে সবেধন নীলমণি একটিমাত্র কফি শপ। গালে হাত দিয়ে বসা এক মহিলা কেটলিতে কফির জল গরম করছেন। আধো অন্ধকার সেই কফি শপের সামনের দিকের শেলফে ফেলে রাখা মলিন কয়েক পিস কেক। মোট কথা, এখানে দুপুরে খেয়ে পেট ভরানোর মতো কিছু নেই। খানিকটা খিন্ন হয়েই ওখানে কিছু খাইনি। আর এখানেও যেহেতু খাবার মিলল না, তাই হোটেলে না-যাওয়া অবধি হয়তো পেটপূজার কোনো আশু সম্ভাবনা নেই।

যে হোটেলে এসে উঠলাম, তার ক্যাশিয়ার ছেলেটি আমার পাসপোর্টের পাতাগুলো ভালো করে উল্টেপাল্টে দেখার পর কোনো এক অজানা কারণে তার মালিককে ফোন করে ডেকে আনলেন। মালিক ভদ্রলোক ভুঁড়ি বাগিয়ে ওপরতলা থেকে মোজাইকের সিঁড়ি বেয়ে ধীরলয়ে নেমে এলেন। ভদ্রলোকের বয়স ষাটের কোঠায়। সামনের পাটির কটি দাঁত তামা দিয়ে বাঁধানো। ঠোঁটের উপরিভাগে খড়ের ঝাড়ুর মতো গোঁফের জঙ্গল। থ্যাবড়ানো নাকটির সম্মুখভাগে জখমের চিহ্ন। অমসৃণ গালটিতে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। পুরো মাথায় গুনেগেঁথে একটি চুলও নেই। গায়ে একটি কালচে টি-শার্ট। সেই ছেলেটি চিনিয়ে না-দিলে আমি হয়তো একে হোটেলের দারোয়ান ভেবে ভুল করে বসতাম!

তিনি এলেন। ছেলেটির সঙ্গে কথা কইলেন। তারপর হলদেটে বিদ্ঘুটে দাঁতগুলো বের করে অমায়িক একখানা হাসি উপহার দিয়ে বললেন, ‘পাসপোর্টে আপনার ঠিকানা দেখে ও আমাকে ডেকে নিয়ে এসেছে। আপনি দেখি সান ডিয়েগো শহরে থাকেন। আমি নিজেও বছর বারো ছিলাম লস অ্যাঞ্জেলেসে। ট্যাক্সি চালাতাম। বহুবার যাত্রী নিয়ে সান ডিয়েগো গিয়েছি। ওখানে পয়সাকড়ি জমিয়ে এই নিজের শহরে ফিরে হোটেল বানিয়েছি।’ ভদ্রলোকের পূর্বনিবাসের সঙ্গে আমার বর্তমান নিবাসের নৈকট্য থাকায় কিছুটা বুঝি বাড়তি লাভ হলো। ভদ্রলোক ঘোষণা করলেন, ‘আপনি আমার বিশেষ অতিথি। যেকোনো সমস্যা হলে এদের না বলে সোজা আমায় ডাকবেন। আমি এই ওপরের তলাতেই থাকি।’ বলে আঙুল তুলে তিনি ওপরের তলার দিকে নির্দেশ করলেন।

প্রয়োজনের মধ্যে সবচেয়ে বড় যেটি, সেটি হলো এই মুহূর্তে খাবারের রেস্তোরাঁ খুঁজে পাওয়া। সে কথা ভদ্রলোককে জানাতে তিনি আমাকে একপ্রকার হাত ধরে বাইরে নিয়ে এলেন। তারপর দেয়ালে আঙুল চালিয়ে মানচিত্র এঁকে বুঝিয়ে দিলেন দুই রাস্তা হেঁটে গেলেই নাকি বিখ্যাত এক রেস্তোরাঁর দেখা মিলবে। সেখানে খাবার খেয়ে কেউ নিরাশ হয়নি। তার কথায় ভরসা রেখে লাগেজপত্র সেই ক্যাশিয়ার ছেলেটির জিম্মায় রেখে আগে ছুটলাম উদরপূর্তির অভিলাষে।

‘রেস্টুরেন্ট সমরখন্দ’-এর বাইরে থেকে কিচ্ছুটি বোঝার উপায় নেই। আবাসিক প্রাসাদোপম অট্টালিকার সমুখে বেশ ছোট করে নিয়নবাতির আলোয় লতানো অক্ষরে লেখা রেস্তোরাঁর নাম। মূল রাজপথ থেকে ভেতরের সড়কে এর অবস্থান। খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে সেটাও এক বিপদ। বেশ কয়েকবার এই সামনের পথটি ধরে হেঁটে যাওয়ার পর আমি অবশেষে একে আবিষ্কার করি চতুর্থ প্রচেষ্টায়। ভেতরে ঢুকতেই আলোকোজ্জ্বল প্যাসেজ। বেশ উঁচুতে ঝুলছে বাহারি স্ফটিক ঝাড়বাতি। দুপাশের নীলচে চুনকাম করা দেয়ালে প্রকাণ্ড সব পেইন্টিং ঝোলানো। লোমশ উটের পিঠে চড়ে আমির চলেছেন ভৃত্যবর্গসহ। এমন ছবি আঁকা রয়েছে শুরুর পেইন্টিংটিতে। পুরো প্যাসেজ ঢাকা উজবেক চতুষ্কোণ মোজাইকের আবরণে। ঝলমলে কাপড়ের মোড়কে ঢাকা ফাঁকা কিছু সোফা এদিক-ওদিক ছড়ানো। কিন্তু সেখানে কেউ বসে নেই।

এয়ারপোর্টে যাত্রীর আনাগোনা

এটি সত্যিই কোনো রেস্তোরাঁ কি না, এ নিয়ে আমি সন্দিহান হয়ে পড়লাম। সেই মুহূর্তে কেউ একজন ডান ধারের দরজা ঠেলে এই প্যাসেজের ঝকঝকে জমিনে পা রাখলেন। সেই ফাঁকে ভেতরের বাদ্যযন্ত্রের ঝংকার এসে আছড়ে পড়ল প্যাসেজের এই আবদ্ধ স্থানটিতে। চনমনে মিউজিকের সঙ্গে ভেসে এলো গানের কলি, ‘মাস্তি ও মাস্তি।’ আমি ছলকে আসা সেই ধ্বনির সন্ধানে ডান দিকের দরজা খুলতেই দেখি ভেতরে বিশাল একখানা হলঘর। চারদিকে ছড়ানো গোল টেবিল। সামনের ড্যান্স ফ্লোরটিকে হাই হিল দ্বারা হিট করে দুলে দুলে গাইছেন উজবেক এক গায়িকা। তৎসৃষ্ট সুরতরঙ্গ হলঘরে রাতের খাবার খেতে আসা রূপসী নারীদের প্রলুব্ধ করে নিয়ে এসেছে এই ফ্লোরে। প্লেটের খাবার ফেলে রেখে তারা ছুটে এসে গায়িকার চারপাশে নৃত্যবৃত্ত তৈরি করেছেন।

হলঘরটিতে ইচ্ছে করেই আলো কমিয়ে রাখা। অল্প কিছু মদির পার্টিলাইট কেবল ঘুরে ঘুরে গিয়ে পতিত হচ্ছে ড্যান্স ফ্লোরের আশপাশে। তাতে মাঝেমধ্যে ঝিকমিকিয়ে ওঠে সেখানে নৃত্যরতা ললনাদের ম্যাক্সি গাউনের মাঝ থেকে ভেসে ওঠা উজ্জ্বল গাত্রদেশ। আমি তাদের এড়িয়ে হলঘরের ডান দিক ঘেঁষে এগিয়ে পেছনের দিকের একটি ফাঁকা টেবিলে বসি। পাশেই কারুকাজ করা খিলান। আলো কম থাকায় খিলানের রং সাদা নাকি নীল, সেটি ঠিক স্পষ্ট করে বুঝতে পারি না। তার আগেই ওয়েটার এসে খাবারের মেনু রেখে যায়। পাতা ওলটাতে গিয়ে দেখি জিবে জল আনা নানা পদের খাবারের বর্ণনা রয়েছে, তবে পাশে মূল্যতালিকা নেই। আমি প্রমাদ গুনলাম। সমরখন্দ শহরের বিশেষ কোনো বনেদি রেস্তোরাঁয় যে কপালের ফেড়ে ঢুকে পড়েছি, সেটি নিয়ে সন্দেহ নেই। অন্তত রেস্তোরাঁয় ভেতরের চাকচিক্য আর আমার আশপাশে উপবিষ্ট মানুষের আভিজাত্য আমাকে সে কথা জানান দিচ্ছে। আর তাই হয়তো এ রেস্তোরাঁয় যারা আসেন, তারা খুব সম্ভবত খাবারের মূল্য নিয়ে মাথা ঘামান না। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তো ঘটনা ভিন্ন। ভবঘুরের মতো এ অঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছি, আরও কয়েক সপ্তাহ হয়তো থাকব। তাই পয়সা ওড়ানোর খুব একটা সুযোগ নেই। তবে এসে যখন পড়েছিই, ফিরে যাওয়ার উপায়ও তেমন নেই। তাতে এই ভিনদেশি ওয়েটারদের কাছে ইজ্জত থাকে না।

দেয়ালজুড়ে নীল রঙের কারুকার্য

খিদেটাও বড্ড জ্বালাতন করছে। আমি তাই পয়সার ব্যাপারটা মাথা থেকে গুলি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বেশ কয়েক পদ অর্ডার করে ফেললাম। সবার শেষে দিতে বললাম চা আর চিজ কেক। একে একে সব খাবার এলো। ততক্ষণে অবশ্য ড্যান্স ফ্লোর থেকে সেই গায়িকা বিদায় নিয়েছেন। আর ঘেমে-নেয়ে ওঠা বাকি উর্বশীরাও কিছুটা ক্ষান্ত দিয়ে ফিরে এসেছেন নিজ নিজ টেবিলে। ফাঁকা ফ্লোরটি তখন দখল করে নিয়েছে  উজবেক ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা উনিশ-কুড়ি বয়সের একদল তরুণী। ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন শুরু হলো রেকর্ডে বাজা কিছুটা ধীরলয়ের উজবেক গান। এর মধ্যেই আমার পাশের লম্বাটে টেবিলে কেক কাটার পর্ব চলছে। বয়স্কা এক রমণী বান্ধবীদের সঙ্গে নিয়ে এসেছেন জন্মদিন উদযাপন করতে। কেক কাটার আগেই গানের সঙ্গে তারা একপ্রস্থ নেচে নিলেন। তারপর কেক কাটার পর্ব শেষ হলে বেয়ারা যখন বিশাল ট্রেতে কেক সরিয়ে নিচ্ছে, তখন সেই দলের একজনের সঙ্গে বেখেয়ালি সংঘর্ষে পুরো ট্রে মাটিতে পড়ে মেঝে হয়ে গেল কেকময়। সে এক বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড!

একটুর জন্য সেই কেকের আঠালো স্রোত আমার টেবিল অবধি এসে পৌঁছায়নি। বেচারা বেয়ারাটির কোনো দোষ নেই এ ক্ষেত্রে। মহিলাটির বেভুল নাচ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। কিন্তু খেয়াল করলাম, দূর থেকে হোটেলের স্যুট-টাই পরা ম্যানেজার রোষকষায়িত লোচনে বেয়ারার দিকে তাকিয়ে আছে। আজ হয়তো বেচারার কপালে দুর্ভাগ্য আছে। ওর কপালে যা-ই থাকুক, আমাকে কিন্তু খুব একটা বিপাকে পড়তে হলো না। কারণ, অপর এক বেয়ারা বিলের কাগজ নিয়ে এলে দেখি, রাজ্যের খাবার গেলার পর বিল এসেছে মাত্র ছয় ডলারের মতো। আমেরিকা দূরের কথা, বাংলাদেশেও এমন এক বনেদি রেস্তোরাঁয় এ টাকায় এক কাপ চা মিলবে কিনা সন্দেহ। এ যেন সেই শায়েস্তা খাঁর আমলের শহর। (চলবে)
 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়