Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||  আশ্বিন ২ ১৪২৮ ||  ০৮ সফর ১৪৪৩

ট্যাক্সি ড্রাইভারদের ‘হাইকোর্ট দেখানোর’ প্রবণতা

সঞ্জয় দে  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:১০, ২২ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১৯:৫৩, ২২ জুলাই ২০২১
ট্যাক্সি ড্রাইভারদের ‘হাইকোর্ট দেখানোর’ প্রবণতা

সারায়েভো টু বার্লিন: সূচনা পর্ব

পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই ট্যাক্সি ড্রাইভারদের মধ্যে ‘হাইকোর্ট দেখাবার’ প্রবণতা কাজ করে। মানে হলো, এক মাইলের পথও নানা ঘুরপথে গিয়ে তারা দাবি করবে তিন বা চার মাইলের ভাড়া!

সারায়েভো শহরতলীর পেছন দিকের এক মেঠো ধূলিওড়া পথ ধরে আমার ট্যাক্সি যখন ছুটে চলে, তখন তেমনই বোধ হয়। ট্যাক্সির চাকায় ছিটকে যায় কিছু নুড়ি পাথর, তাতে মৃদু ঝাঁকুনির সৃষ্টি হয়। আগে থেকে যতদূর জানি– হোটেল থেকে এয়ারপোর্টের দূরত্ব মাত্র কয়েক মাইল। সেটুকু পথ পাড়ি দিতে পিচঢালা পথ ছেড়ে তবে এই অপরিচিত পথে আসবার কারণ কী?

আমি অবশ্য ততটা বিরক্ত হই না। হাতে সময় আছে ঢের। প্লেন ছাড়তে এখনো প্রায় ঘণ্টাতিনেক দেরি। আরো বিলম্বে হয়তো এয়ারপোর্টে আসা যেত। কিন্তু হোটেল ম্যানেজার খানিকটা শঙ্কাজড়িত কণ্ঠে বলল, ‘একটু আগেভাগে চলে যাও, এটা নিউ ইয়র্ক বা শিকাগো শহর নয় যে, চাইবামাত্র ট্যাক্সি এসে দোরগোড়ায় দাঁড়াবে। আমাদের এখানে অনেক সময় ট্যাক্সি কোম্পানিকে ফোন করলে ওদের এসে পৌঁছুতে-পৌঁছুতে ঘণ্টাখানেক লেগে যায়।’ তাই ঝুঁকি নেবার সাধ হয়নি।

আমি আড়চোখে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আরামসে দূরের পাহাড়ের দিকে প্রশান্তিমূলক দৃষ্টি দেই। পাহাড় আর রাস্তার মাঝে বিশাল এক প্রান্তর, আর পাহাড়ের কাছটায় কিছু একচালা বাড়ি। প্রান্তর আর এই মেঠো পথ একে অপরকে অনুসরণ করে। তারপর একটা সময় তাদের মাঝে বিভেদ রচনা করে মরচে ধরা লোহার বেড়া। হঠাৎ এই বেড়ার উপস্থিতি আমার মধ্যে প্রশ্নের উদ্রেক করে- তবে কি এখান থেকে শুরু হলো কোনো ব্যক্তিগত ভূমির সীমানা? যদিও তার অল্প বাদেই ধবধবে সাদা একটি বিমানের পাখা দৃশ্যমান হওয়ায় বুঝে যাই– এটি আসলে এয়ারপোর্টেরই সীমানা। আর আমার ভুল ভাঙে তখন। হাইকোর্ট দেখানো নয়; বরং পেছনের মেঠো পথ দিয়ে শর্টকাট এসে আমার ভাড়া কিছুটা বাঁচিয়ে দিলো ট্যাক্সিওয়ালা।

ট্যাক্সি থেকে মাল নামিয়ে ভদ্রলোক বিনীতভাবে ভাড়া চাইলো। আমার পকেটে বেশ কিছু বসনিয়ান নোট। এতো নোট দিয়ে আমি করবো কী? ডিউটি ফ্রি শপ থেকে কিছু যে কিনবো, তার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। আমি তাই ভাড়ার সমান বকশিস প্রদান করি, বিনিময়ে তার মুখে দেখা পাই আকর্ণ বিস্তৃত হাসি।

লাগেজ জমা দেয়ার সময় কিছুটা গোল বাধে। শহরের পুরনো বাজার থেকে যুদ্ধের সময়ে রক্ত ঝরানো বুলেটের খোসা দিয়ে তৈরি একখানা খেলনা কামান কিনেছিলাম। স্ক্যানিং মেশিনে ব্যাগ দেয়ার সময় জানতে পারলাম, কামানখানা নিয়ে প্লেনে চড়া সম্ভব নয়। এমন একটি খেলনা দিয়ে যে কার প্রাণ কীভাবে সংহার করা সম্ভব, সেটি স্ক্যানারের দায়িত্বে থাকা তন্বী পুলিশ অফিসার আমাকে বোঝাতে সক্ষম হলেন না। খানিকক্ষণ তক্কাতক্কি করলাম। লাভ হলো না। তিনি অবিচল। অগত্যা হার মেনে কামানটিকে বাতিল মালের ঝুড়িতে বিসর্জন দিয়ে টিকেট বুথের দিকে এগুতে হলো।

টিকেট সংগ্রহ করবার পর হাতে মেলা সময়। এখনই চেকইন করে ওপরে যাবার ইচ্ছে হয় না। আমি নিচের লবিতে ঘুরঘুর করি। লবিটি আমেরিকার যে কোনো ছোটখাট শহরের বিমানবন্দরের লবির মতোই। ছোট্ট, ছিমছাম। যুদ্ধের সময়ে এ ভবনটি ছিল জাতিসংঘ বাহিনীর দপ্তর। এর একদিকে সারায়েভো শহর, যেখানে দখল নিয়েছিল সার্ব বাহিনী। আর বিমানবন্দরের রানওয়ের পেছনে যে খাড়া পর্বত, তার ওপারে ছিল বসনিয়ান মুসলিম বাহিনী। মাঝখানে নো ম্যান্স ল্যান্ডের মতো আটকে ছিল এই বিমানবন্দর ভবন। যুদ্ধের পর জাতিসংঘের বাহিনী চলে যাবার পর একে নতুন করে গড়া হয়। লবির একপাশে একটি কফির দোকান, সেখানে কফির চেয়ে বেশি বিকোচ্ছে সেভেন আপের মতো সবুজ বোতলে বন্দি বিয়ার। দু’চারজন সেই বোতল নিয়ে বসে গভীরভাবে টানছেন দু’ আঙুলে আটকে রাখা সিগারেট। তাদেরকে আমার যাত্রী বলে মনে হয় না। হয়তো যাত্রী নামিয়ে দেয়া ট্যাক্সি ড্রাইভার কিংবা কাউকে বিদায় জানাতে আসা পরিজন। তাদের বলকানি সিগারেটের ধোঁয়া আর বিয়ারের কড়া গন্ধে সেখানে পানশালার বদ্ধ আবহাওয়ার মতো এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আমি পাশের এক টেবিলে বসে পকেট থেকে গোলাপি মোড়কে মোড়া চকলেটের প্যাকেট বার করি। চকোলেটের প্যাকেটটি এইমাত্র কিনলাম। পেছনে লেখা- ‘মেইড ইন বসনিয়া’।

চকলেটের টুকরোয় সবেমাত্র কামড় বসিয়েছি, এমন সময় আমাকে পাশ কাটিয়ে ওধারে গিয়ে বসে এক নারী। গলায় রেশমি রুমাল। পরনে আঁটসাঁট কোবাল্ট ব্লু রঙের স্কার্ট। ঝকঝকে মেঝেতে তার হাইহিলের জুতো সৃষ্টি করে মৃদু ছন্দ, আর সেই সাথে আমার গায়ে এসে লাগে ইউফোরিয়া ব্র্যান্ডের পারফিউমের সুবাস। আমাকে তাই বাধ্য হয়ে এই ঊর্বশীর দিকে গভীর দৃষ্টি দিতেই হয়। আমি তো আর বৃক্ষতলে চক্ষুমুদে তপস্যারত সাধু নই!

মেয়েটি এক পেয়ালা কফি অর্ডার করে। আলতো হাতে কফির কাপ তুলে চুমুক দেবার পর কাপের প্রান্তে তৈরি হয় লিপস্টিকের লালচে বৃত্ত। ওর পোশাক দেখে মনে হয়– বিমানবালা। কোন বিমানের? যে বিমানে আমি উঠতে চলেছি, সেটির? নাকি ভিন্ন কোনো কোম্পানির? এখান থেকে অবশ্য ঘণ্টায় একটি কি দু’টোর বেশি বিমান উড়ে যায় না। অর্থাৎ সেক্ষেত্রে আমার বিমান হবার সম্ভাবনা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে শতকরা পঞ্চাশ ভাগ। এ ধরনের কিছু গাণিতিক হিসেব-নিকেশ মাথায় নিয়ে এবারে আমি বোর্ডিং গেটের কাছে এসে বসি।

এখানে বিশাল কাচ। সামনেই খোলা রানওয়ে। ওপারে সেই পাহাড়ের দেয়াল। অর্থাৎ এই সেই রানওয়ে, যার মাঝ দিয়ে বসনিয়ান মুসলিম বাহিনী ওপারের পাহাড় থেকে এপারের শহরে রসদ আনার জন্যে সুড়ঙ্গ খুঁড়েছিল।

হালকা ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। অনেকটা যেন কুয়াশার মতো। ভিজে যাচ্ছে রানওয়ের পিচ। এর মাঝেই দেখি– বাঁ দিকের আকাশ থেকে একটা বিমান ডানা মেলে খুব ধীরে রানওয়ে ছুঁয়ে দিলো। তারপর গুটিসুটি মেরে এগিয়ে এলো আমাদের দিকে। পেটে আঁকা লোগো দেখে বুঝলাম, এটাই আমার প্লেন।

‘উড ইউ লাইক টু হ্যাভ এনি ড্রিঙ্কস?’– সুবেশী বিমানবালা এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে। না, এই মেয়েটি আমার সেই আরাধ্য বিমানবালা নয়। তাকে এ বিমানে দেখছি না। ফার্স্ট ক্লাসে তার পদায়ন হলেও হতে পারে। তেমনটি হলেও আরেক নজর দেখার সম্ভাবনা কম। ফার্স্ট ক্লাসের সেবিকারা সাধারণত এই দ্বিতীয় শ্রেণির যাত্রীদের মুখদর্শন করেন না। আগেই চাদর টেনে তাদের এলাকার সাথে বাকি এলাকার সীমানা নির্ধারণ করে দেন।

আমি তখন ভূমি থেকে বহু উপরে। কম করে হলেও ত্রিশ হাজার ফুট তো হবেই। জানালার কভার খোলা থাকায় পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়া মেঘের দেখা পাওয়া যায় খুব সহজেই। আর কিছুটা পথ গেলেই হয়তো মেঘের পরিবর্তে ভেসে উঠবে আল্পসের চূড়া। আর আমার আতঙ্কের কেন্দ্রবিন্দু সেখানেই। কারণ, এই বিমানটি জার্মান উইংস কোম্পানির। অলুক্ষুণে এক কোম্পানি। এই কিছুদিন আগে এই কোম্পানির এক বিমানচালক প্লেন নিয়ে সোজা নেমে যায় আল্পসের গায়ে। যাত্রীদের কেউ বাঁচেনি। যদি কেউ দুর্ঘটনায় রক্ষে পেয়েও থাকে, আপ্লসের তুষার হয়তো তাদের বাঁচতে দেয়নি। এখন গরমের কাল বলে আমার গায়ে কেবল একটি শার্ট। আচ্ছা, তেমন ধরণের কোনো ঘটনা ঘটলে আশেপাশে ভারী কোনো কাপড় পাবো? হ্যান্ডলাগেজে হয়তো কিছু গরম কাপড় রাখা দরকার ছিল। কিন্তু নেই। জুলাই মাস বলে গরম কাপড় রাখার প্রয়োজন বোধ করিনি। জানি, এসবই উদ্ভট, অযৌক্তিক চিন্তা। কিন্তু তারপরও এ ধরনের চিন্তাগুলো আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। আমি কি আসলে কোনো উদ্বিগ্নতায় ভুগছি? ভিন্ন কোনো কারণে? আমার অবচেতন মন হয়তো সেজন্যেই এসব ভেবে আমাকে খামোখা আতঙ্কে ফেলে দিচ্ছে!

বিমানবালা আবারও বলে ওঠে, ‘স্যার, এনি ড্রিঙ্কস?’ আমি অস্ফুটস্বরে বলি, ‘মে বি এ গ্লাস অফ টমেটো জুস?’ জুস চাইবার সময়ে প্লেনটি যেন কিছুটা দুলে ওঠে। হয়তো এয়ার পকেট। কিংবা হয়তো ভিন্ন কিছু। বিমানবালার কার্টে থাকা কয়েকটি কাচের বোতলের মাঝে ঠকাঠকির শব্দ হয়। আতঙ্কে আমার হাতদুটো বসবার সিটের হাতগুলোকে কামড়ে ধরে। (চলবে)

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়