Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||  আশ্বিন ৭ ১৪২৮ ||  ১৩ সফর ১৪৪৩

হোটেলে রুমের জন্য বার্লিনে উদ্ভট শর্ত

সঞ্জয় দে || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৩৭, ৩ আগস্ট ২০২১   আপডেট: ১৯:৪৭, ৩ আগস্ট ২০২১
হোটেলে রুমের জন্য বার্লিনে উদ্ভট শর্ত

সারায়েভো টু বার্লিন: তৃতীয় পর্ব

বার্লিনের হাউপট বানহফ অর্থাৎ প্রধান রেল স্টেশনে যখন পৌঁছাই, তখন সবে রাতের আঁধার পরাভূত করে ঊষা তার নম্র শুভ্রতা ছড়াচ্ছে চারিদিকে। ঘুমন্ত স্টেশনটিও ধীরে ধীরে যেন জেগে উঠছে তখন। বাড়ছে পদচারণা, বাড়ছে কফির দোকানের সামনে জটলা। এই স্টেশন কয়েক তলে বিভক্ত। তাই ট্রেন থেকে নামার পর ভ্রম হলো– এটি স্টেশন নয়, বরং যেন বহুতল মার্কেট। রাতের উচ্ছিষ্ট নিদ্রা আর খানিকটা যন্ত্রণাক্লিষ্ট মস্তক শিরাকে সম্বল করে টলতে টলতে নেমে আসি নিচতলে। এখান থেকে আমাকে যেতে হবে পূর্ব বার্লিনে। ওখানেই হোটেল বুকিং দেয়া। 

প্রায় বছর-বিশেক আগে যখন জার্মান ভাষা শিখি, মোমেন্ট মাল নামক বইতে লেখা ছিল– এ শহরে থাকার জন্যে হোটেল ঘর কিংবা সেখানে যাবার পথের ঠিকানা জানতে হলে স্টেশনের তথ্যকেন্দ্রে গেলেই হয়। তারাই সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয় কোথায়, কী করে যেতে হবে। এ-কালে অবশ্য সেই ঝুট-ঝামেলা নেই। ফোনের স্ক্রিনে গুগল থেকে দেখে নাও ক’নম্বর বাস ধরে কোন পথে যেতে হবে। সেভাবেই বলা চলে ফোনটিকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে দুটি বাস বদলে ঠিক চলে এলাম হোটেলের সামনে। 
আমি ক্লান্ত, বড্ড ক্লান্ত। আমার এখুনি একটি রুম চাই, চাই সাদা ধবধবে বিছানা। সেই সাথে উষ্ণ কম্বল হলে ভালো হয়। কিন্তু রিসেপশনে থাকা রুশি মহিলা সেসব এখনই ছাড় করতে নারাজ। বেশ রুক্ষ নিরুত্তাপ মুখায়বের অধিকারী ভদ্রমহিলার অভিব্যক্তি অনেকটা জেলখানার প্রহরীদের মতো। হিমশীতল। আমাকে সোজা বলে দিলেন– তোমাকে এতো আগেই রুম দেব কেন? শত অনুরোধেও তাকে টলানো গেল না। অবশেষে বললাম, আচ্ছা যান, আমি না হয় গত রাতের পুরো ভাড়া দিচ্ছি। এবার তো দেবেন নিশ্চয়ই একটা ঘর। 

রুম তিনি দিলেন। কিন্তু সাথে একটা অদ্ভুত প্যাঁচ মেরে দিলেন। তার হাতে নাকি দেবার মতো একটাই রুম আছে। সেটা আবার ডাবল বেডের। কিন্তু আমার আগের বুকিং যেহেতু সিঙ্গেল রুমের, তাই এই রুমটিই দিতে তিনি বাধ্য হচ্ছেন। তবে শর্ত হলো, দ্বিতীয় খাটটি আমি ছুঁয়েও দেখতে পারবো না। ওটার চাদর থাকতে হবে যেমন পাতা আছে, তেমন। বড় অদ্ভুত এই যুক্তি। এমন তো না যে তিনি ওই খাট ভিন্ন আরেকজনকে ভাড়া দেবেন, তাহলে আমি ওতে শুলেই কী আর না শুলেই কী? ভদ্রমহিলা তার দাবিতে অনড়। অগত্যা তার উদ্ভট শর্তে রাজি হয়েই সেই ঘরে এসে উঠতে হলো। 

বেলা প্রায় বারোটার দিকে ঘুম ভাঙে। টয়লেটে গিয়ে আয়নায় সামনে দাঁড়াই। নিজেকে বেশ বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে তখন। গালের দুই পাশে বেড়ে উঠেছে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, যেন কয়েকদিনের জ্বরাক্রান্ত এক ব্যক্তি। মাথার ভেতরটা ফাঁপা। কেন এখানে এসেছি, আজ কোথায় যাব, এমন কিছু আবশ্যকীয় প্রশ্নের কারণ বের করতে আমার মস্তিষ্ক তার স্মৃতিকোষের এখানে-ওখানে হাতড়ে বেড়ায়। শেভিং-এর ফোম হাতে নিয়ে আমি সামনের কাচে লিখি– আজ কত তারিখ?

একটা হট শাওয়ার নেবার পর নিজেকে খানিকটা ধাতস্থ মনে হলো। পোশাক বদলে নিচে নেমে আসি। প্রথমে কিছু খেয়ে তারপর বার্লিনের দুটো জায়গায় যাবো। দুটোই এই পূর্ব বার্লিনে। যেহেতু গ্রীষ্মকাল, তাই হয়তো দিনের বাকিভাগের সময়ের মাঝেই এ দুই জায়গায় যাওয়া সম্ভব হবে। পূর্ব বার্লিনের এ পাড়াটি পশ্চিমের বার্লিনের মতো ততটা জমকালো নয়। হয়তো সে-কারণে কিছুটা কম ভাড়ায় এ হোটেল পেয়েছি। দুই জার্মানি এক হবার পর পশ্চিমের টাকায় পূর্বে প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হলেও অর্ধ শতাব্দীর মলিনতার ছাপ এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। সেই দেয়াল ভাঙার আগের দিনগুলোতে এদিকটায় তুর্কিদের আনাগোনা তেমন একটা না থাকলেও অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সস্তা ভাড়ার লোভে ঝাঁকে ঝাঁকে তুর্কি আজকাল বাসা বেঁধেছে এ-অঞ্চলে। হোটেলের একগলি পরেই এক তুর্কিস্কুল। অনেক মা এসে বাচ্চা তুলে নিচ্ছে ছুটির পর।

আশেপাশের মুদি দোকান, কার মেকানিক শপ, সেলুন, বিউটি পার্লার– এসবও তুর্কিদের হাতে বন্দি। এমনকি আশেপাশে আর কোনো খাবারের রেস্তোরাঁ না পেয়ে যেটিকে একমাত্র ভরসাস্থল ভেবে নিয়ে ঢুকলাম, সেটিও তুর্কি রেস্তোরাঁ। এ সময়টা অলস দুপুর বলেই হয়তো খদ্দের কম। বিতরণকারি মহিলাটি বাইরে পেতে রাখা চেয়ারে বসে সিগারেট ফুঁকছে। আমাকে দেখে আধপোড়া সিগারেটটিকে ছাইদানিতে পুঁতে চটজলদি ভেতর থেকে নিয়ে এল খাবারের মেন্যু।

সার্কাসের তাঁবুর মতো করে কালো মেঘের ভেলা পুরো আকাশটাকে আজ ঢেকে আছে। সকালে খুব সম্ভবত এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। এখানে আসার পথে রাস্তায় দু’এক জায়গায় জমে থাকা জলের অস্তিত্ব দেখেছি। জুলাই মাস হলেও চিনচিনে একটা ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। ভাগ্যিস, বেরুবার সময়ে গায়ে একটা জ্যাকেট গলিয়ে এসেছিলাম। ওটা না থাকলে বিপদে পড়তে হতো।  

রেস্তোরাঁটি ছোট। ডানদিকে গুটিকয়েক টেবিলে বসবার ব্যবস্থা। বাঁ-দিকে কাউন্টারের পেছনে ঘুরছে চিকেনের মাংসসমেত গ্রিল মেশিন। সেটির একপাশে দাঁড়িয়ে চপিং বোর্ড নিয়ে লেটুস পাতা কাটছেন এক বয়স্কা ভদ্রমহিলা। মাথায় বেগুনীবর্ণা হিজাব। আর কাউন্টারের অপর ধারে দাঁড়িয়ে সংবাদপত্রের পাতা উল্টাচ্ছেন এক যুবক। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। গায়ে ধূসর বর্ণের উলের সোয়েটার। হাতে পত্রিকা থাকলেও যুবকের চোখ কিন্তু নিবদ্ধ দেয়ালে লটকানো টিভির স্ক্রিনের দিকে। খুব মনোযোগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে সে কিছু একটা দেখেছে। ফুটবল খেলার শেষ দশ মিনিটে দর্শক যেমন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করে কোনো জাদুকরী গোলের, তেমনভাবে। 

আমি যুবকের দৃষ্টি অনুসরণ করে টিভির দিকে তাকাই। তুর্কি ভাষায় সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে। কিছু একটা ঘটেছে ইস্তাম্বুলে। রাস্তায় নেমেছে ট্যাঙ্ক। জনগণ অস্ত্র হাতে রাজপথে মহড়া দিচ্ছে। কেমন যেন একটা জনযুদ্ধের আলামত। সংবাদ পরিবেশনকারীরাও বেশ উত্তেজিত ঢঙে দিচ্ছেন ধারাবিবরণী। কী ঘটলো ইস্তানবুলে? সেই যুবক এবারে হাঁক দিয়ে সেই লেটুসকাটা মহিলাকে ডাকে। হাতে সবজি কাটার ছুড়ি নিয়ে সেই মহিলাও নির্বাক ভঙ্গিতে টিভির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন। কৌতূহল চাপতে না পেরে যুবককে জিজ্ঞেস করে বসি, ‘এনিথিং হ্যাপেনড ইন টার্কি?’ আমার দিকে না তাকিয়েই অস্ফুট স্বরে সে ভাঙা ইংরেজিতে বলে, ‘ইয়েস, ভেরি ব্যাড। মে বি আ আর্মি ক্যু?’

আমি আর কথা বাড়াই না। যা-ই ঘটুক, রাতে হোটেলে ফিরে ইংরেজি কোনো চ্যানেল খুলে জেনে নেবো। এখন আর এই পৃথিবীর হানাহানি নিয়ে মাথা ঘামাতে ইচ্ছে হচ্ছে না। (সেদিন রাতে হোটেলে ফিরে বিবিসির সংবাদে দেখি– ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটে গেছে তুরস্কে। সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্ট এরদোগানকে সরিয়ে দেবার জন্যে অভ্যুথান করে। সেটি অবশ্য রাত পোহাবার আগেই ব্যর্থ হয়। জনগণ সেই অভ্যুথান মেনে নেয়নি। বসফরাস সেতুতে কামান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেনাদের উপর তারা হামলে পড়ে। সেদিন বার্লিনের গোটা তুর্কি জনপদেই এই নিয়ে চলছিল গুনগুন, ফিসফাস। ট্রেনে, বাসে, দোকানে– সর্বত্রই। জার্মানিতে ডানপন্থী এরদোগানের মোটামুটি বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী। তারা এই অভ্যুথানের সংবাদে স্বভাবতই ছিল উদ্বিগ্ন, বিচলিত।) 

বার্লিন আমার খুব প্রিয় এক নগর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নানা স্মৃতি অঙ্গে জড়িয়ে রাখা এই নগর নিজেই যেন গত শতকের এক ইতিহাস পুস্তক। শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নয়, পরবর্তী স্নায়ুযুদ্ধেরও অন্যতম মল্লক্ষেত্র ছিল এই বার্লিন। উভয় যুদ্ধের ব্যাপারেই আমার প্রবল আগ্রহ। আর তাই এখানে এসেছি একবার নয়, একাধিকবার। প্রতিবারেই আমি খুঁজে ফিরি বিশ্বযুদ্ধের বাঙ্কার, নাৎসি দপ্তর, সোভিয়েত সেনাদের গণকবর, বার্লিন দেয়ালের ভগ্নাবশেষ কিংবা স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালে পূর্ব জার্মানির মুক্তিকামী মানুষের খোঁড়া টানেল।

টানেলের প্রসঙ্গে বলি– ১৯৬১ সালে রাতারাতি দেয়াল তুলে দেবার পর পূর্ব বার্লিনের অনেকের মাথায়ই আকাশ ভেঙে পড়ে। দেয়াল তুলে দেবার কারণ ছিল- পূর্ব থেকে আশঙ্কাজনক হারে মানুষের পশ্চিমে পলায়ন। সেটা হবেই-বা না কেন? মানুষ বুঝে গিয়েছিল, পূর্বে বাস করা মানেই সোভিয়েত প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চালিত লৌহকপাটবদ্ধ সমাজে বন্দি হয়ে থাকা। সে সমাজে না আছে মত প্রকাশের বিন্দুমাত্র অধিকার, না আছে ব্যক্তি পর্যায়ে সম্পদ আহরণের সুখ। ইঙ্গ-মার্কিন সাহায্যে পশ্চিম জার্মানি যখন দ্রুত যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠে শিল্পোন্নত দেশ হবার পথে এগিয়ে চলেছে, পূর্ব তখনও অনেক শ্লথ, অনেক সংরক্ষণবাদী। অন্যদিকে জার্মান দেশটিকে যে সীমানা মেনে ভাগ করা হয়েছিল, সেটাও ছিল পুরোপুরি কৃত্রিম। অযৌক্তিক। আর তাই পূর্বের মানুষের পশ্চিমে গমন ছিল অনেকটা অবশ্যম্ভাবী নিয়তি। এটাই হবার কথা ছিল। কিন্তু মস্কোর মদতপুষ্ট নেতারা এটাকে নিয়ে নিলেন নিজেদের পরাজয় আর ক্ষরণ হিসেবে। তারা বুঝে গেলেন– এভাবে স্রোতের মতো মানুষ ওপারে পালিয়ে গেলে পূর্ব জার্মানি দেশটাকেই টেকানো যাবে না। অর্থনীতিও ভেঙে পড়বে। ফলে আচম্বিত দেয়াল তুলে তারা মানুষের গলায় রজ্জু পরাতে চাইলেন।

শুরুতে কিছুদিন দেয়াল টপকে কিংবা সীমানায় থাকা বাড়ির জানালা থেকে লাফ দিয়ে ওপারে গমন ততটা কঠিন ছিল না। কিন্তু অচিরেই কর্তৃপক্ষ সতর্ক হয়ে যায়। তারা আরও কঠোর পরিকল্পনা নেয়। মাঝখানে বেশ খানিকটা ফাঁকা স্থান রেখে প্রথম দেয়ালের পেছনে আরও দু সারির ব্যারিকেড গড়া হলো এবার। মাঝে রাখা হল কাঁটাতারের বেষ্টনী আর তালগাছের মতো একহারাভাবে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য ওয়াচ-টাওয়ার। (বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলার পর অপ্রয়োজনীয় এই টাওয়ারগুলোও ভেঙে ফেলা হয়। শত শত টাওয়ারের মাঝে টিকে আছে মাত্র দু’তিনটি। অ্যালেক্সান্ডার প্লাৎজের নিকটের এক পাড়ায় লুকিয়ে থাকা তেমন একটি টাওয়ার নেহাতই ভাগ্যগুণে একবার খুঁজে পেয়েছিলাম। আমি খুঁজছিলাম সালভাদর দালির আর্ট মিউজিয়াম। কিন্তু পথ ভুল করে ঢুকে যাই সেই পাড়ায়। পথের মোটামুটি শেষ প্রান্তে কর্পোরেশনের জলের ট্যাংকের মতো দেখতে সেই টাওয়ারটি। এক ভদ্রলোক স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে দেখভাল করেন। লোহার খাড়া সিঁড়ি বেয়ে টাউয়ারের উপর তলে উঠে এখনো চারদিকে নজর বুলানো যায়। সেই সাথে পুরনো দিনের স্বাদ পেতে সেখানে শেকলের সাথে বেঁধে রাখা আছে একটি বুলেটবিহীন একে-৪৭ রাইফেল।)  (চলবে)

 

দ্বিতীয় পর্ব: যাত্রাপথে ঘুমিয়ে পড়ার বিড়ম্বনা

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ