Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শনিবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||  আশ্বিন ১০ ১৪২৮ ||  ১৬ সফর ১৪৪৩

পর্বত কখনো ভুলের ক্ষমা করে না

ইকরামুল হাসান শাকিল  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৪৫, ২৩ আগস্ট ২০২১  
পর্বত কখনো ভুলের ক্ষমা করে না

সকালে ঘুম ভাঙার পরেই জানতে পারলাম ক্যাম্প-৩ এর কিছুটা উপরে ফার্নান্দো মারা গেছেন। গ্রাস ফার্নান্দো আমাদের দলের সদস্য। তার সঙ্গে ছিলেন ডেল কেরু মিল্লিয়ান জেসুস ও ডেল কেরু মিল্লিয়ান জোয়ান কার্লোস। তারা তিনজনই স্পেনের অভিজ্ঞ পর্বতারোহী। জেসুস আর জোয়ান যমজ ভাই।

তাদের সঙ্গে যেটুকু সময় কাটিয়েছি কখনো হাসি ছাড়া দেখিনি। জেসুস আর জোয়ান ইংরেজি জানেন না। তাই দোভাষী হিসেবে ফার্নান্দো তাদের সাহায্য করেন। ফার্নান্দো তাদের দলনেতাও। এই দলটি তিন চারদিন বেসক্যাম্পে অপেক্ষা করেছেন ভালো আবহাওয়ার জন্য। পরে তারা পর্যায়ক্রমে ক্যাম্প-১ ও ক্যাম্প-২ হয়ে ক্যাম্প-৩ এ চলে যান। রাতে সেখানে থেকেই তারা সামিট পুশ করবেন। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ হয়ে গেছে। সারারাত তাঁবুতে কাটিয়ে ভালো আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা আর ভালো হলো না।

নভেম্বরের ১ তারিখ, দিনটি ছিলো শুক্রবার। ভালো আবহাওয়ার জন্য অতিরিক্ত এক দিন থাকার মতো প্রয়োজনীয় খাবার ও জ্বালানি ছিলো না তাদের সাথে। তাই এ দিনেই তাদের সামিট পুশ করতে হবে নয়তো নেমে আসতে হবে। তাই তারা ঝুঁকি নিয়েই সামিটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তারা দুপুরের দিকে খারাপ আবহাওয়ার মধ্যেই উপরের দিকে আরোহণ শুরু করেন।

বেসক্যাম্পে লেখক, জেসুস, ফার্নান্দো, জোয়ান এবং এম এ মুহিত। ছবি: ড্যান্ডি শেরপা  

প্রচণ্ড ঠান্ডা, তুষার ঝড় আর চারপাশ হোয়াইট আউটের মধ্যেই এক ভয়ানক অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে গেলেন। হোয়াইট আউট হলো মেঘ আর তুষারে চারপাশ সাদা হয়ে যাওয়া। এর ফলে চারপাশের কিচ্ছু দেখা যায় না। তখনো তারা জানতেন না যে সামনে তাদের জন্য কতটা ভয়ঙ্কর অবস্থা অপেক্ষা করছে। সন্ধ্যার সময় নিচে নেমে আসার পথেই তাদের সঙ্গে ঘটে গেলো পর্বতের চিরচেনা করুণ ঘটনা।

প্রচণ্ড ঠান্ডা আর খারাপ আবহাওয়ার কারণে ফার্নান্দো ব্লাইন্ড হয়ে যান। ফলে তিনি চোখে দেখতে পারছিলেন না। অপর দিকে তিনজনই শারীরিকভাবে অতি উচ্চতাজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শেষ পর্যন্ত ক্যাম্প-৩ এর কাছাকাছি আসতেই ফার্নান্দোর মৃত্যু হয়। জোয়ান ও জেসুস প্রায় মৃত অবস্থায় ফার্নান্দোকে রেখে ক্যাম্প-৩ এ নেমে আসেন। 

ফার্নান্দোর নীরব নিথর প্রাণহীন দেহটা হিমলুং-এর বুকে পড়ে রইলো। সংবাদটা শোনার সাথে সাথে বুকটা কেঁপে উঠলো। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল দুঃস্বপ্ন দেখছি। কিন্তু না, সংবাদটা সত্য। ভেতরটা গুমরে কেঁদে উঠলো। আজ তো মেঘের কোনো ছিঁটেফোঁটাও নাই, সকাল সকাল রোদে চিকচিক করছে চারপাশ। পাখিরাও আপন মনে কিচিরমিচির করে দিন শুরু করছে। তবে কেন এমন দুঃসংবাদে আমাদের সকাল শুরু হলো? নিজেকে কোনোভাবেই স্থির করতে পারছিলাম না।

পর্বত কখনো ভুলের ক্ষমা করে না। এমন কি ভুল শুধরানোরও সুযোগ দেয় না। কথাটি পর্বতারোহীরা  জানেন এবং মানেন। তবুও পর্বতারোহীরা পর্বত চূড়া সামিটের নেশায় এই ভুল করেন। পর্বতের আবহাওয়ার চরিত্রই হলো দুপুরের পর থেকে খারাপ হওয়া। তাই বলা হয়ে থাকে দুপুর দু’টার পরে সামিটে না গিয়ে ফিরে আসার কথা। ফার্নান্দোরা সেই ভুলটিই করেছেন বলে আমি মনে করি। আর পর্বতও সেই সুযোগে ছেড়ে কথা বলেনি। 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়