Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ০১ ডিসেম্বর ২০২১ ||  অগ্রহায়ণ ১৭ ১৪২৮ ||  ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

মাঙ্কি আইল্যান্ডের বানরও বিয়ার পান করে  

ফেরদৌস জামান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৩২, ১২ নভেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৯:১৮, ১২ নভেম্বর ২০২১
মাঙ্কি আইল্যান্ডের বানরও বিয়ার পান করে  

(বিজন দ্বীপের স্বরলিপি: ১৬তম পর্ব)

এরপর গিয়ে নোঙর হলো মাঙ্কি আইল্যান্ডের নিকটে। নৌকা থেকে আর একটা ছোট নৌকায় সবাইকে সৈকতে নামিয়ে দেয়া হলো। এখানকার মূল আকর্ষণ উন্মুক্ত বানর। দ্বিতীয়টি হলো, দ্বীপের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করা। অধিকন্তু, যাদের ইচ্ছা তারা চাইলে সৈকতের নীল জলে সাঁতার কেটে সময়টা পার করে দিতে পারে। আমার ক্ষেত্রে মূল আকর্ষণের বিষয় শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করা। সর্বসাকুল্যে নয়জন শীর্ষ আরোহণ করার জন্য প্রস্তুত হলাম।

গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের নিচ দিয়ে শুরু হলো আমাদের আরোহণের পথ। মাঝপথে দল থেকে প্রায় অর্ধেক আরোহী হার মেনে একটা জায়গা বেছে নিয়ে সমুদ্রের চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগল। অবশিষ্ট রইলাম আমি, টেটেলিন, একজন মধ্যবয়সী ইটালিয়ান এবং জার্মান জুড়ি। আমরা চললাম শীর্ষের পথে। যতই উপরে উঠতে লাগলাম, মনের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা কাজ করতে শুরু করল। শীর্ষের উচ্চতা খুব বেশি হলে দুই থেকে সোয়া দুইশ মিটার হবে। তবুও মনে হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা অর্জনের আশায় এগিয়ে চলছি। পাহাড় তো নয় যেন আস্ত একটা পাথরের টুকরো।

পথের ধারে ম্যানগ্রভ প্রজাতীর বৃক্ষের শ্বাসমূলের মতো চোখা পাথরের সমারোহ। কখনওবা তার মাঝ দিয়েই পথ উঠে গেছে উপরের দিকে। সামন্য বেসামাল হলে নিচে গড়িয়ে পড়ার আগেই চোখা পাথরে বিদ্ধ হয়ে লটকে থাকতে হবে। শেষের দিকে গিয়ে আর কোনো পথ নেই। যেতে হবে বড় পাথরগুলোর নিচ দিয়ে; উপর দিয়ে বা যে যেভাবে পারে। অনেক চেষ্টার পরও এক পর্যায়ে অদম্য টেটেলিনকে হার মানতে হলো। একেবারে কাছাকাছি যাওয়ার পর অপেক্ষা শুধু একটা পাথর পেরিয়ে পাখির ঠোঁটের মতো ঢালু জায়গাটাতে পা রাখা। ব্যাস, সামিট হয়ে গেল! 

এখানে পৌঁছে সবার মধ্যেই এক ধরনের প্রতিযোগিতা দেখা গেল- কে আগে যাবে। বেশি ভাবনা চিন্তা না করে জার্মান জুড়িকেই সুযোগটা দেওয়া হলো। তাতে করে জ্যানিক সেবেকে এবং রামোনা ক্লা উভয়েই সম্মানিত বোধ করলো। প্রথমে রামোনা তারপর জ্যানিক। তাদের শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করে ফেরার পরপর আমরা বাকি দু’জন গিয়ে পা রাখলাম। সমস্ত মাঙ্কি আইল্যান্ড আমাদের পায়ের নিচে। সমুদ্রের নীল জল দড়ির মতো পেঁচিয়ে এসে আছড়ে পড়ছে সৈকতে। নিচে খেলা করছে বাকি বন্ধুরা। তারা কেউ জানে না আমরা শীর্ষে পৌঁছে গেছি। তাদের সৈকতে ক্ষুদ্র পিঁপড়ার মতো দেখা গেল। 

ইতোমধ্যে সহযাত্রী আরোহী একটা পাথরের কোণ ধরে বসে পড়েছে। মুগ্ধ হয়ে নির্বাক তাকিয়ে পান করছে অপরূপ সৌন্দর্য সুধা। আবেগ জড়ানো কণ্ঠে ছোট্ট করে একটা শব্দ উচ্চারণ করল- কাপুতা। অর্থ না বুঝলেও তার এই অর্জন পরবর্তী আনন্দের মাত্রা কিছুটা হলেও বুঝতে পারলাম। পরবর্তীতে অবশ্য শব্দটার অর্থ জানতে চাইলে বলেছিল, ল্যাটিন অঞ্চলের কোনো ভাষায় এর অর্থ শেষ বা পরিসমাপ্তি।

সৈকতে ফিরে দেখি অন্যরা পানিতে নেমে আরেক দফা লাফালাফিতে মত্ত। এ দিকে বানরের দল খাবারের লোভে পর্যটকদের কাছাকাছি ঘুরঘুর করছে। কেউ বাদাম দিচ্ছে, কেউ ব্যাগ থেকে বিস্কুট বের করে দিচ্ছে। মজার ব্যাপার দ্বীপের বানরেরা বিয়ার পান করে। রৌদ্রস্নানরত একজনের পাশ থেকে বিয়ারের ক্যান নিয়ে দৌড়। দুই হাতে চেপে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঢকঢক করে শেষ করে দিলো। ভদ্রলোক তো কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কাপড় বা ব্যাগ নিয়ে পালাতেও তারা বেশ পটু। এসব রেখে কেউ সাঁতার দিতে নেমেছে অথবা সামান্য বেখেয়াল হয়েছে তো আজীবনের জন্য চালান করে দেবে জঙ্গলের ভেতর। বিরক্ত করলে ক্ষেপে গিয়ে রীতিমত তাড়া করে বসে। বিকিনি পরা এক রমণীকে ক্ষিপ্র গতিতে তাড়া করে বসল। রমণী দিক হারিয়ে সোজা দৌড় সমুদ্রে। তার আর্তচিৎকারে চারদিক প্রকম্পিত হয়ে উঠল।

মাঙ্কি আইল্যান্ডের লম্বা বিরতির পর রওনা হলাম ভাসমান জেলে পল্লীর উদ্দেশ্যে। বিস্কুট আর কফি সহযোগে পরিবেশিত হলো বিকেলের নাস্তা। দিনের শুরুর মতো পরস্পরের মাঝে সেই দূরত্বটা আর নেই। ছোট্ট প্রমোদ তরীজুড়ে বিরাজ করছে এক আন্তরিক ও সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ। কারও কৌতুক, তো কারও গানে মুখোর হয়ে উঠল পরিবেশ। জেলে পল্লীতে অবতরণের পর গাইড সকলকে নিয়ে একটা সংরক্ষণশালা ঘুরে দেখাল। ছিদ্র যুক্ত অলাদা বড় বড় পাত্র অথবা জালের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার জলজ প্রাণী ও মাছ সংরক্ষণ করা আছে। এসবের চেয়ে বরং পল্লী ঘুরে দেখতেই আমার বেশি ভালো লাগল। এক পা দুই পা করে ঢুকে গেলাম ভিতরে। কিছু ট্রলার ধোয়া মোছার কাজ চলছে। দু’একটা গভীর সমুদ্রে যাত্রা করল। দিনের পর দিন তারা পানির উপর বসবাস করে। এ এক অদ্ভুত জীবন! অনেক বড় পল্লী, তবে জনমানুষের সংখ্যা নিতান্তই কম। ঘরবাড়িগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই একেকটা মাছের মোকাম। প্লাস্টিকের ব্যারেলের উপর ভাসমান প্রতিটি ঘর বা মোকাম আলাদা একেকটি স্থাপনা। একটার সাথে আরেকটা দড়ি দিয়ে বেঁধে আটকানো। চাইলে যে কেউ তার ঘরবাড়ি নিয়ে অন্যত্র চলেও যেতে পারে। পাশাপাশি সংযুক্ত হওয়ার কারণে অনায়াসে পল্লী ঘুরে বেড়ানো যায়। 

পড়ন্ত বিকেলের মিষ্টি রোদে সমুদ্রের পানি ঝিলমিল করে উঠল। কমলা রেখার আঁকিবুকি দীর্ঘ হতে হতে চলে এলো পায়ের পাতার কাছে। পাহাড়ে পাহাড়ে সন্ধ্যাকে বরণ করে নেবার আয়োজন। প্রমোদ তরীর ছাদে সমবেত সকলের মনে বিষাদে ছায়া। গানের সুরে তার বেদনার্ত বহিঃপ্রকাশ:
বিদায় নেয়াতে যেমন ভীতি
তেমনি দেয়াতেও নয় গো প্রীতি
বিদায় আমার অপ্রিয়
কাছে থাকো অনুক্ষণ ওগো প্রিয়তম।

সময় হলো সূর্য ডোবার। কাঁপতে কাঁপতে সমুদ্রের সূর্য টুপ করে হারিয়ে গেল পাহাড়ের বুকে। আমাদের তরীও ঘাটে ভিড়ল, সমাপ্ত হলো দিনের কর্মসূচি। দুটি মাইক্রোবাসে সবাইকে উঠিযে যার যার ঠিকানা অনুযায়ী নামিয়ে দেওয়া হলো। এক ঘণ্টার মতো বিশ্রাম করে আবারও বের হওয়া। গলির মুখে যেতেই চোখ আটকে গেল একটা ফুটন্ত হাঁড়ির মধ্যে। ফুটপাতের অস্থায়ী দোকানে চুলার উপর বড় হাঁড়িতে জ্বাল হচ্ছে শাকপাতা মিশ্রিত ঘন সুপ বা তরকারী। তার মধ্যে ভাসছে ধবধবে সাদা খোসাসহ ডিম এবং বড় টুকরোর মুরগির মাংস। আগের রাতে এক দোকানদারকে খুব মজা করে মুরগির মাংসের এই তরকারী খেতে দেখেছিলাম। এতটাই মজা করে খাচ্ছিলেন যে, শেষ পর্যন্ত আমার সাথে কথা বলায় মনোযোগ দিতে পারেননি। সিদ্ধান্ত নিলাম মুরগির মাংস এবং ডিম দুটোই খাব। মাংস শেষ করার পর ডিম চাইলে বিক্রেতা নারী সহাস্য হাত নেড়ে বুঝালো, না না ওটা তোমার জন্য নয় অথবা তুমি খেতে পারবে না। আমার তো কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। জানতে চাইলে মুখের ভাষায় ঠিকমত বুঝাতে না পেরে অঙ্গ ভঙ্গি করে যা দেখাল তাতে বোঝা যায় কোনো শিুশু ঘুমাচ্ছে। অর্থাৎ দুই হাত জোড় করে গালে ঠেকানোর পর মাথা কাত করে এক মুহূর্ত চোখ বুজে রইল।

তিনবার দেখানোর পরও আমি ধরতে পারলাম না। এবার বাধ্য হয়ে হাঁড়ি থেকে একটা ডিম তুলে খোসা ছাড়িয়ে দেখাল। ভ্রুণওয়ালা ডিম। সাদা এবং হলুদ উভয় অংশ আলাদা হয়ে ভিন্নরকম আকৃতি নিতে শুরু করেছে এবং পরস্পরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আছে। কিছু দিন পরই হয়তো বাচ্চা ফুটে বেরোনোর কথা। বিক্রেতার কথাই ঠিক ছিল, আমার পক্ষে তা খাওয়া সম্ভব হলো না।

এরপর প্রধান রাস্তার এক মাথা থেকে আরেক মাথা হেঁটে শেষ করলাম। দুই দিনে এই পথ ধরে কতবার যে হাঁটলাম তার হিসাব নেই। প্রতিবার নতুন কিছু না কিছু আবিষ্কার হচ্ছেই। এই প্রথম সবচেয়ে জমজমাট রেস্টুরেন্টটাতে বসতে ইচ্ছা হলো। একটা পানীয়’র অর্ডার করে বসে পড়লাম। টেবিলের উপর ছাউনি নেই। চারাপাশের অন্যান্য আলোতে যতটুকু আলোকিত হয় তাতেই স্বাচ্ছন্দে খানাপিনা চলছে। আধা ঘণ্টা পর বাতাসের সঙ্গে ভুরভুর করে ভেসে এলো এক ধরনের মিষ্টি সুবাস। এতক্ষণ যা যা খেলাম তাতে পেট যথেষ্ট ভরা আছে। ভাবলাম রাতে মিষ্টি স্বাদের সামান্য কিছু খেলে মন্দ হয় না।

ভ্যানিলার স্বাদ মিশ্রিত সুবাস আমাকে তার উৎসের কাছে টেনে নিয়ে গেল। আলো আঁধারির মধ্যে ভ্রাম্যমান কেক-এর দোকান নিয়ে একাকি দাঁড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধা। ভ্যানের উপর কাচ ঘেরা দোকান। সাজসজ্জা আহামরি নয়, কিছু বাসন কোসন আর একটা চুলা। কিছুক্ষণ পরপর একজন দুইজন ক্রেতা আসছে এবং কেক খেয়ে বিদায় হচ্ছে। তার কাছে দুই ধরনের কেক আছে, আম কেক এবং কলা কেক। প্রস্তুত প্রণালী খুবই সাধারণ, প্যানের মধ্যে দুই চামচ পরিমাণ মিশ্রণ গোলা ঢেলে তার উপর পাকা আম বা কলার পাতলা কয়েকটা টুকরো রেখে দিলেই হয়ে গেল। তারপর উল্টেপাল্টে কয়েকটা ভাঁজ দিয়ে খদ্দেরের হাতে তুলে দেয়া। প্রক্রিয়া সহজ হলেও সময় অনেকটা লেগে যায়। আমি খেতে চাইলাম আম কেক। মূল্য বিশ হাজার ডং। দরদাম করে পাঁচ হাজার ছাড় পেলাম। পূর্ণ প্রস্তুতির পর চুলায় আগুন দিলেন। কেক বানাতে বানাতে তার নিজের ভাষায় কি যে বলতে লাগলেন কিছুই বুঝলাম না। কাগজের মতো পাতলা কেক, খেতে মুচমুচে। এরই মধ্যে চার-পাঁচজন এসে ভিড় জমালো। দাম জানতে চাইলে উত্তর দেওয়ার আগেই আমার দিকে তাকিয়ে কৌশলে একটা চোখ টিপ মেরে বলল- বিশ হাজার।

আমার ফেরা দরকার, মূল্য পরিষোধ করে বিদায় নিতে চাইলে ইশারায় থামতে বললেন। কেক খেয়ে সকলে বিদায় হওয়ার পর এবার আমার বিদায়ের পালা। নোট ভাঙিয়ে নিজেরটা রেখে বাকিটা ফেরৎ দেওয়ার কাজে ইচ্ছা করেই একটু বেশি সময় নিলেন। তার কথা বা গল্পের দ্বিতীয় দফা চলমান। সব শেষে আমাকে জড়িয়ে বুক মেলানোর পর বিদায় দিলেন। বৃদ্ধার শরীরজুড়ে ভ্যানিলার সুবাস। তা থেকে খানিকটা মনে হয় আমার শরীরেও পার হয়ে এলো। সুবাসের আচ্ছন্নতায় বৃদ্ধার কথাগুলো নিজের মতো তর্জমা করতে করতে ফিরে এলাম হোটেল কক্ষে। (চলবে) 

পড়ুন ১৫তম পর্ব: সমুদ্রের বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে অসংখ্য পাহাড়

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়