ঢাকা     রোববার   ২৩ জানুয়ারি ২০২২ ||  মাঘ ৯ ১৪২৮ ||  ১৯ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

নীল পানিবেষ্টিত অপরূপ ‘স্যান্ড ব্যাংক আইল্যান্ড’

মেসবাহ য়াযাদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৪৮, ৬ ডিসেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৫:০৪, ৭ ডিসেম্বর ২০২১

আমরা ৮৫ জন সংবাদকর্মী, দাঁড়িয়ে আছি হুলহুমালে ফেরি জেটিতে। ৩ ডিসেম্বর মালদ্বীপে এসেছি ইউএস বাংলা এয়‌ার লাইন্সের আমন্ত্রণে। পর‌দিন ৪ ডিসেম্বর, সকাল ৯টা। আমাদের গন্তব্য মালদ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ স্যান্ড ব্যাংক আইল্যান্ড। তিনটি বোটে করে যাচ্ছি আমরা। আমাদের বোটের গাইড তারিকুল ইসলাম।

তারিক তার লম্বা চুল ঝাঁকিয়ে মোটামুটি শুদ্ধ ইংরেজিতে আমাদের গন্তব্যস্থল সম্পর্কে ব্রিফ করছিলেন। তিনি তার মতো বলে গেলেও সেদিকে আমাদের এই বোটের ২৫ জনের তেমন কারো খেয়াল আছে বলে মনে হলো না। সবাই তাকিয়ে আছে, নীল-আকাশী অথৈ জলরাশির দিকে। চারদিকে অসংখ্য ছোট-বড় ইয়ট বা বোট পর্যটকদের নিয়ে বিভিন্ন দ্বীপের দিকে ছুটছে। অবাক হয়ে সেসব দেখছিলাম আমরা।

ইংরেজি ছেড়ে এবার হিন্দিতে বলা শুরু করলেন তারিক। এরা তিনটে ভাষায় কথা বলে। মালে, ইংরেজি এবং হিন্দি। কিউ কেউ আবার ফ্রেন্স ভাষাও জানে। পেশার কারণে তাদের এসব জানতে হয়। চারদিকে মনোমুগ্ধকর অপূর্ব সব দৃশ্য। বোট ছাড়ে, একটু দূরেই দেখা যায় অসংখ্য নারকেল গাছ বেষ্টিত একটা দ্বীপ। সেখানে ২-৩টি রিসোর্ট। এসব দ্বীপে সাধারণ পর্যটক যেতে পারেন না। আগে বুকিং দেওয়া থাকলেই কেবল যাওয়া যায়। সব রিসোর্টেরই নিজস্ব বোট রয়েছে- তাদের অতিথিদের নেওয়ার জন্য। অনেক রিসোর্টের রয়েছে নিজস্ব সি-প্লেন। সেসব রিসোর্ট মূল ভূখণ্ড খেতে বেশ দূরে।

নীল পানিতে সাদা ফেনা তুলে আমাদের ২৫ জনকে নিয়ে বোট ছুটে চলে। চারদিকে নোঙর করা এবং চলমান অসংখ্য ছোট-বড় বোট, স্পিডবোট ও অত্যাধুনিক ইয়ট। যেসব ইয়টে ঘোরা, থাকা, খাওয়াসহ পর্যটকদের চাহিদা মতো সব সুবিধা রয়েছে বলে জানান আমাদের গাইড তারিক। বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে তারিক। আজ অনেক পর্যটক পেয়েছেন, আমরা ৮৫ জন তার কোম্পানির তিনটি বোটে। তাই আজ বেজায় খুশি সে। গুন গুন করে হিন্দি গান গাইছে। হঠাৎ আমার দিকে চোখ তুলে তাকায়। তার সঙ্গে অজান্তে কখন জানি হিন্দি গান গাওয়া শুরু করেছি আমিও।

আমাদের বোটের ওপর নীল আকাশ। অসংখ্য সি-প্লেন ছুটে চলছে বিভিন্ন রিসোর্টে তার পর্যটকদের নিয়ে। চারপাশে সমানতালে ছুটছে বোট, স্পিড-বোট আর ইয়টগুলো। তাতে নানান দেশের, নানান বর্ণের, নানান পোশাকের পর্যটকরা। চারপাশে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, এ যেনো সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি কোনো ছবি। কিংবা ক্যালেন্ডারের পাতায় টাঙানো ছবি। নীল জল কেটে কেটে স্যান্ড ব্যাংক আইল্যান্ডে পৌঁছাতে আমাদের সময় লাগে ৫০ মিনিটের মতো।

এখানকার সমুদ্রের পানির রঙ দুই রকমের। বেশিরভাগ পানি গাঢ় নীল। কিছু এলাকায় মানে দ্বীপের আশে পাশের পানি আকাশের মতো হালকা নীল! আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইলে গাইড তারিক স্বভাব সুলভ হেসে জানায়, যেখানে পানির গভীরতা অনেক বেশি সেখানে পানি গাঢ় নীলা, আর যেখানে পানি কম সেখানে পানি হালকা নীলা। স্যান্ড আইল্যান্ডে যেতে সমুদ্রের মাঝে ৫-৭টি দ্বীপের দেখা মেলে। কৌতূহল মেটাতে সব কটি দ্বীপের সংক্ষেপ বর্ণনা দেন আমাদের গাইড তারিক। 

ছোট্ট দ্বীপটি ঘিরে আকাশ নীল পানি। দ্বীপজুড়ে সাদা বালুকাময়। এ কারণেই এই দ্বীপের নাম ‘স্যান্ড ব্যাংক আইল্যান্ড’। বোট থেকে মই বেয়ে সামান্য পানিতে নামি আমরা। খানিক সময়ের মধ্যে বাকি দুটো বোটও চলে আসে। শ’খানেক মানুষের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে দ্বীপ। লাইফ জ্যাকেট পরে সবাই পানিতে লাফালাফি শুরু করে। বিভিন্ন পোজ দিয়ে নারী-পুরুষ সবার ছবি তোলা চলছেই। কেউ সঙ্গে করে আনা ফুটবল খেলছে। সবারই চোখে-মুখে বিস্ময়! এত আনন্দের মাঝেও আক্ষেপ ঝরে পড়ে প্রায় সবারই মুখ থেকে। 

সংবাদকর্মী, সতীর্থ নাদিরা কিরন, চকর মালিথা, রাজিব ঘোষ, পলাশ মাহবুব, হাসান জাভেদ, মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল, নিজামুল হক বিপুল, তাপসি রাবেয়া, কাজল আব্দুল্লাহ, তৌহিদুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ তুহিনসহ প্রায় সবাই বলেন- ‘আমাদের কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন বা কুয়াকাটাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুললে দেশেও ঢল নামতো পর্যটকদের। অথচ বিভিন্ন জটিলতা আর আন্তরিকতার অভাবে আমরা আমাদের দেশের সবুজ প্রকৃতি আর বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকত থাকার পরও তেমন করে বিদেশি পর্যটক টানতে পারছি না।’ মালদ্বীপের কাছে পর্যটন নিয়ে আমাদের শেখার অনেক কিছু আছে বলেও মনে করেন তারা।

আক্ষেপের মাঝেও আনন্দে মেতে উঠে সবাই। গাইড কোম্পানি থেকে নদীতে চালানোর জন্য ছোট বোটে চড়ে বসে অনেকে। ওয়াটার মোটরবাইকও ছিল একটা। ১০ ডলারের (৯০০ টাকা) বিনিময়ে মিনিট দশেক তাতে ঘোরার ব্যবস্থা ছিল। বেশ কিছু সময় যাবার পরও ওয়াটার মোটরবাইকে চড়ার মতো খুব বেশি মানুষ পাওয়া যায় না, তারপর চালক আহম্মদ পুরো ৫০ শতাংশ ছাড় ঘোষণা করে। দশ মিনিট গভীর সমুদ্রে ঘোরার জন্য ৫ ডলার। এবার হুমড়ি খেয়ে পড়ে অনেকে।

বল খেলা, ছবি তোলা, সাঁতার কাটা, পানিতে দাপাদাপির পর দুপুরের খাবারের ডাক পড়ে। তারিক তার লোকজনসহ বালুতে লোহার স্ট্যান্ড পুতে টেবিল বানিয়ে বিভিন্ন ধরনের খাবার পরিবেশন করলেন। মিক্সড রাইস, নুডুলস, সালাদ, কলা, জুস, পানিসহ আহারের আয়োজন। খুব বেশি মজা করে খেতে পারেননি অনেকে। এখানকার খাবার আর ‘ভেতো বাঙালি’র খাবার তো এক হবার কথা না! স্বাদের সঙ্গে অনেকে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে নুডুলস আর জুস খেয়েই ক্ষুধাকে সান্ত্বনা দেন তারা। খাবারের পরে অতি অ্যানার্জিটিকদের আরেক দফা পানিতে দাপাদাপি চলতে থাকে। গাইডের ডাকে বাধ্য হয়ে পানি ছেড়ে বোটে উঠে সবাই। এবার ফেরার পালা।

সবাই বোটে উঠার পরও বোট ছাড়ে না। কারণ জানা গেল, তারিকের নেতৃত্বে তার অন্য সহকর্মীরা মিলে, আমরা দিনভর বিভিন্ন খাবার খেয়ে যে উচ্ছিষ্ট ফেলেছি; তারা সেগুলো বড় বড় প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে বালুর দ্বীপকে পরিষ্কার করে- সেই ব্যাগ নিয়ে বোটে আসার পর বোট ছাড়বে। তারপর পাড়ে এসে নির্দিষ্ট স্থানে সেসব ফেলবেন। মনে পড়লো, আমরা দেশের পর্যটন এলাকাগুলোতে যেভাবে বর্জ্য ফেলে পরিবেশ দূষণ করি! সেই আক্ষেপ আর লজ্জায় বিশাল সমুদ্রের সামনে নিজেকে খুবই ক্ষুদ্র আর ছোট মনে হলো। 

ময়লা পলিব্যাগ নিয়ে ওরা ফিরে আসেন। বোট ছেড়ে দেয়। গাইড তারিক জানান, বিভিন্ন দ্বীপে তারা প্রতিদিন পর্যটক নিয়ে যান। সারাদিনের উচ্ছিষ্ট কোনো ময়লা তারা দ্বীপে কখনো এক টুকরোও ফেলে আসেন না। তার কথা শুনে আমরা একজন আরেকজনের দিকে তাকাই। অতি সংবেদনশীল কেউ কেউ নিচের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা খুঁজতে থাকি। জানি না সেটা অনুশোচনা, লজ্জা না আত্ম উপলব্ধি!

/এনএইচ/

সর্বশেষ