ঢাকা     রোববার   ২৩ জানুয়ারি ২০২২ ||  মাঘ ৯ ১৪২৮ ||  ১৯ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

রাতের আঁধারেও জমজমাট হ্যানয়বাসীর ‘স্যাটারডে মার্কেট’

ফেরদৌস জামান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৪০, ১৭ ডিসেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৬:৪৩, ১৭ ডিসেম্বর ২০২১
রাতের আঁধারেও জমজমাট হ্যানয়বাসীর ‘স্যাটারডে মার্কেট’

(বিজন দ্বীপের স্বরলিপি: শেষ পর্ব)

হ্যানয়ের বাস সকাল সাড়ে আটটায়। ব্যাগ গোছানে শেষ। নাস্তা খেয়ে হাং-এর কার্যালয়ে গেলাম, বাস সেখান থেকেই তুলে নেবে। এক পেয়ালা ভেষজ পানীয় পান করতে করতেই বাস এসে হাজির। হাং নিজে ব্যাগটা তুলে দিলেন। অনেক স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে বিদায় হলাম। শহর ঘুরে বেশ কয়েকটা জায়গা থেকে যাত্রী তুলে নিয়ে চূড়ান্ত যাত্রা শুরু হলো আমাদের।

চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম হ্যানয়। নামিয়ে দেওয়া হলো হোয়ান কিয়েম এলাকার। প্রথমে গেলাম লোটাস হোস্টেলে। তারা এতটাই অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে যে ভুল করে আমার থাকার বিলটা পর্যন্ত নেয়নি। অবশ্য এই দায় থেকে নিজেকেও দূরে রাখা যায় না। যাহোক, ভাবলাম বিল পরিশোধ করে তারপর অন্য কোনো হোস্টেলে উঠে পড়ব। মাত্র দুইটা গলিপথ মাড়িয়ে যখন লোটাস হোস্টেলের দরজায় উপস্থিত হলাম তারা অবাক! আগেই নিশ্চিত করলাম চিন্তার কারণ নেই- বিল পরিশোধের জন্যই এসেছি। তাদের কথা- এসেছি বললে হবে না, এখানেই থেকে যেতে হবে। উপরে এসি থেকে শুরু করে বাথরুমের ফিটিংস সব ঠিকঠাক করে তোলা হয়েছে। তাহলে তাই হলো, থেকে গেলাম। মাত্র একটা রাত, পরের দিন সকালেই তো বিদায় হবো।

ঠিক তাই, ঘরটা মাত্র কয়েক দিন আগে যা দেখে গিয়েছিলাম সে অবস্থায় আর নেই। অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে। শুধু একটা জিনিস আগের মতো রয়ে গেছে, সর্বক্ষণ পর্দা টেনে আলো জ্বেলে রাখা বিছানা। কে এলো আর কে গেল সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। অবশ্য ডরমেটরীতে থাকলে ভ্রুক্ষেপ করাটাও অনর্থক।

এবার কিছু খাওয়া দরকার। রাস্তার মোড়েই একটা রেস্টুরেন্টে ঝলসানো হাঁস দেখে বসে পড়লাম। এক বাটি নুডুলস-এর উপর আস্ত হাঁসের ঝলসানো শরীর থেকে কয়েক চাকা মাংস কেটে পরিবেশন করা হলো। দিনটি ছিল শনিবার। অর্থাৎ কয়েক ঘণ্টা টরেই লেকসাইট এলাকা থেকে শরু করে অত্র এলাকার সকল রাস্তায় সাপ্তাহিক রাতের বাজার বসবে। খাবার খেয়েই ওদিকটাতে রওনা হলাম। বিকেল থেকেই এক ধরনের উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। লেকসাইড এলাকায় যেতে রাস্তার ধারের সমস্ত দোকানে বাজার উপলক্ষে অতিরিক্ত প্রস্তুতি চলমান। যে সমস্ত রাস্তায় বাজার বসবে সন্ধ্যার আগ থেকেই তা যানবাহন মুক্ত করা হলো। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে জমে উঠল হ্যানয়বাসীর ‘স্যাটারডে মার্কেট’।

আলোয় আলোয় ভরে উঠল সমস্ত এলাকা। রাস্তার ঠিক মাঝখান দিয়ে পিঠাপিঠি দুই সারি দোকান। অধিকন্তু উভয় পাশের স্থায়ী দোকানগুলোও তাদের পণ্যের পশরা রাস্তা পর্যন্ত নামিয়ে আনল। কুটির শিল্পজাত পণ্য থেকে শুরু করে হালফ্যাশানের কাপড় চোপড় এবং ছোটখাটো ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী সবই পাওয়া যায়, তবে দামে বেশ চড়া। বাজারের সর্বাপেক্ষা আকর্ষণ ভিয়েতনামের ঐতিহ্যবাহী হরেক পদের খাবার। প্রতিটি খাবার দোকানে উপচে পড়া ভিড়। 

বাজারের এক প্রান্তে লেকসাইড। এখানাকার খোলা প্রাঙ্গনের আধুনিক মঞ্চে ডিজিটাল আলোকসজ্জায় শুরু হলো রক ঘারানার অনুষ্ঠান। ঠিক কয়েকশ মিটার দূরে বাজারের অপর প্রান্তে উন্মুক্ত মঞ্চের পরিবেশনা স্থানীয় লোক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একটা ঐতিহাসিক স্মারক ভাস্কর্যের সামনে চারপাশ খোলা মঞ্চ। ঐতিহ্যবাহী সাজ পোশাকে শিল্পীরা নাচ, গান এবং অভিনয় পরিবেশন করে শ্রোতা দর্শকদের মন ভরিয়ে তুললেন। মঞ্চ থেকে পিছনের দিকের চত্বরে খাবারের দোকানের আধিক্য। বহু মানুষের ভিড়ে সমস্ত বাজার জমজমাট থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। চৌরাস্তার মোড় থেকে সোজা এগিয়ে যাওয়া পথটার দুইপাশে প্রচুর কফির দোকান। গুঁড়া করা কফি, আস্ত কফি, এক কেজির প্যাকেট, আধা কেজির প্যাকেট আরও কত কি! কফি গোটা প্রক্রিয়াজাত করে বড় বড় কাঁচের পাত্রে ভরে রাখা। ক্রেতা তার পছন্দ মত কিনে প্রয়োজনে সেখান থেকেই গুঁড়া করে নিতে পারে। হরেক প্রকার কফির মন মাতানো সুবাসে সমস্ত এলাকা মৌ মৌ হয়ে আছে। এত ধরনের স্বাদ আর এত কোম্পানির কফি, কোনটা ছেড়ে কোনটা নেই সে হিসেব কষতে রীতিমত হিমশিম খাওয়ার উপক্রম। আমার এই ভ্রমণে চমক হিসেবে প্রাপ্তির সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। শেষ দিনটাতেও যে এমন একটা চমক অপেক্ষায় ছিল সেটা অন্তত ভাবতে পারিনি। 

ফিরতি ফ্লাইট পরের দিন দুপুর সোয়া বারোটায়। প্রথমে নইবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কুয়ালালামপুর। তারপর মালয়েশিয়া সময় রাত আটটা পাঁচ মিনিটে দ্বিতীয় ফ্লাইটে ঢাকা। বাড়ি ফেরার আনন্দ নাকি বিদায়ের বিষাদ, ঠিক কোন কারণে রাতের ঘুমটা আমার ভালো হলো না বুঝতে পারলাম না। সকালের অপেক্ষা করতে করতে এক সময় সকাল হয়ে গেল। একটু সময় নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। কারণ এ যাত্রায় বিমানবন্দর পর্যন্ত বাসে ফিরব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নির্জন সকালবেলা স্বতেজ হাওয়ায় হেঁটেই বাসস্ট্যান্ড রওনা হলাম। পথে একাকি নাস্তা বিক্রেতার পরিবেশন প্রক্রিয়া দেখে ব্যাগ নামিয়ে বসে পড়লাম। সটি পাতায় পরিবেশিত হচ্ছে খিচুড়ি।

হ্যানয়ের বিদায়বেলা খিচুড়ি মত অতি প্রিয় বাঙালি খাবার দেখে মনটা নেচে উঠল! দাম মাত্র দশ হাজার ডং। ভিয়েতনামে খাওয়া এটাই বোধহয় আমার সবচেয়ে কম মূল্যের খাবার। পাতার মাঝখানে সামান্য পরিমান খিচুড়ির উপর ছিটিয়ে দেয়া হলো বেশ খানিকটা পেঁয়াজ বেরেস্তা। সাথে একটা প্লাস্টিকের চামচ। দেখতে খিচুড়ির মত হলেও প্রকৃতপক্ষে তা খিচুড়ি নয়। ভাতের রং হলুদাভ কিন্তু তাতে কোন ঝাল লবণ বা ডালের অস্তিত্ব নেই। স্বাদে একেবারে বাঙালিয়ানা না হলেও খেতে মন্দ নয়, বেরেস্তার মুচমুচে শব্দে প্রতিটা গ্রাস অমৃত যেন!

বাসস্ট্যান্ডে উপস্থিত হওয়ার দশ মিনিটের মধ্যেই গাড়ি চলে এলো। চমৎকার একটা ভ্রমণ দিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম বিমানবন্দরে। ফ্লাইটের সময় হতে প্রায় চার ঘণ্টা বাকি। এই সময়টাতে আমার বাসের দুই সহযাত্রী পিটার ডগলাস এবং ন্যাটলির সাথে কফি সহযোগে ভালোই জমে উঠল। কুয়ালালামপুর পর্যন্ত আমরা তিনজন একই ফ্লাইটের যাত্রী। তারা ভিয়েতনামের প্রত্যন্ত এলাকায় স্কুল শিশুদের ইংরেজি ভাষা শেখায়। অভিজ্ঞতার কথা শোনার পর বিষয়টা আমার বেশ ভালো লাগল। পরিপ্রেক্ষিতে দুজনেরই পরামর্শ, চাইলে এই কাজের জন্য আমি নিজেও আবেদন করতে পারি। স্বপ্রণোদিত হয়ে আবেদন প্রক্রিয়ার বিস্তারিতটাও জানিয়ে দিলেন তারা। তাদের সাথে কথা বলতে বলতেই দশ থেকে বারো জনের একটা শিশু দলের দেখা পেয়ে গেলাম। শিক্ষিকার সাথে বিমানবন্দর দেখতে এসেছে। এই অফুরন্ত অবসর সময়ের মাঝখান থেকে তাদের সাথে প্রাণবন্ত একঘণ্টা কিভাবে যে কেটে গেল তা বুঝতে পাররাম না।

সময় হলো ইমিগ্রেশন আনুষ্ঠানিকতা করে ভিতরে প্রবেশ করার। বসার জায়গার দৈর্ঘ আধা কিলোমিটার না হলেও তার কাছাকাছি হবে। এত সুন্দর একটা জায়গা পেয়ে আমার বসে থাকতে একদমই ভালো লাগল না। এ মাথা থেকে ও মাথা ঘুরে আসতে অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়। এক পাশে কাঁচের দেয়াল, অপর পাশে শুধু দোকান। মাঝখানে টানা বসার জায়গা এবং চলার পথ। কতগুলো দোকান আছে তা গুনে শেষ করতে পারলাম না। অধিকাংশ দোকানের পণ্যসম্ভার সেই জিনিসগুলো, ভিয়েতনাম ঘুরে কয়দিনে যা দেখলাম। কাঁচের ওপাড়ে উড়োজাহাজ উঠছে আর নামছে। এই সময়টুকুর মধ্যে কত জাহাজ উঠল আর নামল তার ঠিক নেই। বিদায়ের সময় সন্নিকটে। ঘরির কাঁটা বারোটার ঘরে। ঠিক সোয়া রারোটায় জাহাজ ছুটতে শুরু করলো। ছুটতে ছুটতে তার চাকাগুলো আস্তে করে গুটিয়ে নিয়ে উড়াল দিলো অনন্ত আকাশের পানে। (শেষ) 

পড়ুন ১৭তম পর্ব: নীল সমুদ্রের বুকে ছড়িয়ে আছে সবুজ পাহাড়

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ