ঢাকা     বুধবার   ০৬ জুলাই ২০২২ ||  আষাঢ় ২২ ১৪২৯ ||  ০৬ জিলহজ ১৪৪৩

রহস্যময় ঊনকোটির মায়াবী নগরে

সমীর চক্রবর্তী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:১১, ১৬ মে ২০২২   আপডেট: ১৭:১৬, ১৬ মে ২০২২
রহস্যময় ঊনকোটির মায়াবী নগরে

আগরতলা থেকে ভোর সাড়ে ৬টায় ছেড়ে ধর্মনগরগামী ট্রেন ১০৮ কিলোমিটার অতিক্রম করে কুমারঘাট পৌঁছলো সকাল ৯টায়। নামে লোকাল হলেও গতিবেগ আমাদের দেশের আন্তঃনগর ট্রেনের মতো। সেখান থেকে ৩৮ কিলোমিটার দূরে রঘুনন্দন পাহাড়ে অবস্থিত ঊনকোটি  প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপত্য বিস্ময়। অটোরিকশায় যেতে সময় লাগে ঘণ্টাখানেক।

ঊনকোটিতে প্রবেশ করলে আপনি অসার হয়ে যাবেন। পাহাড় খুঁড়ে করা অবিশ্বাস্য বিশালাকার মূর্তির আবয়ব দেখে মনে হবে আপনি বুঝি চলে এসেছেন প্রাচীন কোন সভ্যতার মায়াবি নগরে। ভেবে কূলকিনারা  পাবেন না অষ্টম বা নবম শতাব্দীতে এই দুর্গম পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা হয়েছিল ৯৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯টি মূর্তি! অর্থাৎ এক কম এক কোটি! ফলে এই স্থানের নামকরণ হয় ঊনকোটি।  

মাত্র কদিন আগে যখন আমরা ওই পথ অতিক্রম করছিলাম তখন কুমারঘাট থেকে ঊনকোটির রাস্তা দেখেছি। পাহাড়ের বুক চিরে চার লেনের সড়ক তৈরি হচ্ছে মাত্র। আঁকাবাঁকা রাস্তা আর উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হবে বহু কাঙ্খিত সেই স্থানে। শেষ এক কিলোমিটারের নীরবতা আপনার গা ছমছম করবে। পাহাড়ের উপরের বাড়িগুলোতে আরো ভৌতিক নীরবতা। পথ চলতে চলাতে আনমনে পা আটকাবে আপনার।

গেইটে নাম নিবন্ধন করে ভেতরে প্রবেশ করলেই বিস্ময় শুরু হবে জটাধারী শিবের বিশাল মূর্তি দেখে। তারপরেই বিশাল খাঁদ, খাঁদ পেরিয়ে আবার পাহাড়। পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে মূর্তি আর মূর্তি। রেলিং ধরে এগুলে ৩০ ফুট উঁচু কালভৈরবের মূর্তি ছাড়াও পাবেন গণেশ, দুর্গা, বিষ্ণু, রাম, রাবণ, হনুমান এবং শিবের বাহন নন্দীর মূর্তি। ঊনকোটির একটি প্রধান দ্রষ্টব্য হলো গণেশকুণ্ড। কুণ্ডসংলগ্ন পাথরের দেয়ালে দক্ষ হাতে খোদাই করা আছে তিনটি গণেশ মূর্তি। এদের ডান পাশে রয়েছে চতুর্ভুজ বিষ্ণু মূর্তি। সমতল থেকে প্রায় ৪০০ ফুট উপরে পুরনো বটবৃক্ষের পাদদেশে তীর্থ স্থান। বাঁশ ও টিনের ঘর তুলে সেখানে পূজা দিচ্ছেন পুরোহিত। পাশের একটি পাকা ঘরের ভেতরে বেশ কয়েকটি দেব-দেবীর পাথরের বড় মূর্তি সংরক্ষিত আছে। দু’জন নারী নিরাপত্তারক্ষীকে দেখা গেল ঘরটির ঠিক পাশেই। পুরো পাহাড়টি যেন বিশাল বিশাল আকৃতির পাথরের মূর্তিতে ভরা। সাথে আছে অসংখ্য উপত্যকা ও খাঁদ। পাহাড়, খাঁদ, ঝরনা, জঙ্গল মিলিয়ে সবুজ শান্ত সুন্দর জায়গাটি আপনাকে অপার্থিব সুখ দেবে।

সরকারের পক্ষ থেকে স্থানটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাহাড়রে সবুজ ঢাল বেয়ে অনেক নিচ পর্যন্ত নামা বা অনেক ওপরে ওঠার জন্য সিঁড়ি বানানো হয়েছে। আপনার গায়ে ও পায়ে শক্তি থাকলে যতদূর খুশি ঘুরে আসতে পারেন। রাতকে আলোকিত রাখতে করা হয়েছে আলোর ব্যবস্থা। সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে তাদের পরিচ্ছন্নতা। পুরো পাহাড়ি এলাকার উঁচু-নিচু টিলায় ছোট ছোট ঘরে ত্রিপুরী জনগোষ্ঠীর বসতঘর নজর কাড়ে।

মূর্তির পাশে পূজারত অবস্থায় পাওয়া গেল সম্ভু দেববর্মা নামে বৃদ্ধ একজনকে। ঘুরে ঘুরে মূর্তিগুলোতে ফুল জল দিচ্ছেন তিনি। আলাপে জানালেন দুবছর ধরে পরিবারসহ প্রতিদিন এখানে একাজ করছেন তিনি। তিনি জানান, শিবরাত্রী, মকর সংক্রান্তি এবং অশোকাষ্টমীতে এখানে মেলা বসে। চৈত্র মাসের শুক্লাপক্ষের অষ্টমী তিথিতে এই মেলা অনেক আড়ম্বরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। দূর থেকে ভক্তদের আগমনে পাহাড়ের নীরবতা ভাঙ্গে। রাজধানী আগরতলা থেকে শুরু করে আশপাশের রাজ্য থেকেও ভক্তরা আসে। তারা এই স্থাপত্যকে তীর্থ হিসেবে মানে। মানত করে বটগাছের ডালে লাল সুতা বাঁধে। বাংলাদেশ থেকেও ভক্ত এবং দর্শনার্থীরা আসে প্রতিবছর।  

ঊনকোটির নামকরণ নিয়ে নানা কাহিনী প্রচলিত আছে। হিন্দু পুরাণে আছে, কালু কামার নামে একজন স্থাপত্যকার দেবী পার্বতীর ভক্ত ছিলেন। একবার পার্বতী মহাদেবের সাথে কৈলাসে যাচ্ছিলেন তখন কালু কামার তাদের সাথে যেতে চান। তখন মহাদেব তাঁর উপর শর্ত আরোপ করেন- যেতে হলে এক রাতে এক কোটি দেবদেবীর মূর্তি তৈরি করে দিতে হবে। কিন্তু কালু কামার এক কোটি থেকে একটি কম মানে ঊনকোটি মূর্তি তৈরি করে দিতে সক্ষম হন। এ থেকেই ঊনকোটির নামকরণ।  

আবার এটাও কথিত আছে যে, মহাদেব একবার এক কোটি দেবতার প্লাটুন নিয়ে বারানসী যাচ্ছিলেন। সন্ধ্যে নামার পর রাত্রিবাসের ব্যবস্থা হয় এই রঘুনন্দন পাহাড়ে। মহাদেবের নির্দেশ ছিল সূর্যোদয় হওয়ার আগে এখান থেকে সকলকে রওনা হতে হবে। পথপরিশ্রমে ক্লান্ত দেবতারা গভীর নিদ্রায় চলে গেলেন। পরদিন সূর্যোদয়ের আগে মহাদেব ছাড়া কোনো দেবতার নিদ্রাভঙ্গ হলো না। মহাদেবের অভিশাপে দেবতারা অনন্তকালের জন্য পাথর হয়ে গেলেন।

তবে ঐতিহাসিকদের মতে ঊনকোটির স্থাপত্য রহস্য আজও অজানা। গহীন অরণ্যে কারা তৈরি করলো এই মায়াবি নগর হাজারো বছর ধরে তাঁর খোঁজ করছেন ইতিহাসের ছাত্ররা। হয়তো সেই ভাস্করদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আরো অজানা কোনো অধ্যায়।
 

খরচাপাতি

আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে ২০ টাকায় অটো দিয়ে যেতে পারবেন আগরতলা রেলওয়ে স্টেশনে। সেখান থেকে দিনে একাধিক ট্রেন ধর্মনগরের উদ্দ্যেশে ছেড়ে যায়। কুমারঘাট পর্যন্ত যেতে লাগবে মাত্র ২৫ টাকা। কুমারঘাট রেলওয়ে স্টেশনের সামনে থেকে অটোরিকশা রিজার্ভ করে আপনি ঘুরে আসতে পারেন ঊনকোটি। খরচ পরবে আটশো থেকে হাজার টাকা। ভেঙে গেলে জনপ্রতি খরচ পড়বে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। তবে যাতায়াত ব্যবস্থা খুব একটা ভালো না থাকায় সময় এবং হয়রানি এড়াতে রিজার্ভ যাওয়া ভালো হবে।
 

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়